kalerkantho


বিশেষ সাক্ষাৎকার : আজমালুল হোসেন কিউসি

বিচারব্যবস্থার উন্নয়নে সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০



বিচারব্যবস্থার উন্নয়নে সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন সফল আইনজীবী ও সালিসকারী (আরবিট্রেটর) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্যারিস ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অ্যান্ড কমার্সের আরবিট্রেশন কমিশনের সদস্য, কুয়ালালামপুর রিজিওনাল সেন্টার ফর আরবিট্রেশনের প্যানেল সদস্য, সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারের প্যানেল সদস্য, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের কোড অব কনডাক্ট কমিশনের সদস্য ও লন্ডন সোসাইটি ফর অ্যাডভানসড লিগ্যাল স্টাডিজের ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। ১৯৯৫ থেকে

২০০৫ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস এমপ্লয়মেন্ট ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অনেক আইনি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনেরও অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে খোলামেলা আলাপ করেছেন কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রেজাউল করিম

 

কালের কণ্ঠ : আপনি বাংলাদেশের একমাত্র আইনজীবী, যিনি কিউসি (কুইন্স কাউন্সেল) পদধারী। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন সফল আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

আজমালুল হোসেন কিউসি : কিউসি (কুইন্স কাউন্সেল) পদটি হলো ব্রিটিশ রাজপরিবার থেকে আইনজীবীদের জন্য একটি স্বীকৃতি। বিলাতে ব্যারিস্টারদের জন্য দুই রকমের পদ রয়েছে। একটি হলো, ব্যারিস্টার অ্যাট ল আর ওপরের শ্রেণিটা হলো কিউসি। কিউসি পদ পাওয়ার জন্য ব্রিটেনে আইন পেশায় ১৫-১৬ বছর কাজ করার পর আবেদন করতে হয়। ওই আবেদনের ওপর প্রায় ৩০০ বিচারক ও আইনজীবীর মতামতের ভিত্তিতে ইংল্যান্ডের লর্ড চ্যান্সেলর (আইনমন্ত্রী) রানি এলিজাবেথের পক্ষে জানান যে ‘আপনি কিউসি পদ লাভ করেছেন।’ যাঁরা খুবই মেধাবী ও আইন পেশায় সুনাম রয়েছে, তাঁরাই সাধারণত এই পদ লাভ করতে পারেন। রানি এলিজাবেথের পক্ষ থেকে এই পদ সেখানে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করে। এ ছাড়া সেখানে কিউসিদের মধ্য থেকেই হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়। বিলাতে কেনেথ জুকার নামের একজন বিখ্যাত আইনজীবীর অধীনে আইন পেশা শুরু করি। তিনি ছিলেন ইহুদি। তিনিও কিউসি পদধারী এবং বিলাতের একজন স্বনামখ্যাত আইনজীবী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিচারক হয়েছেন। তাঁর অধীনে কাজ করা আমরা আটজন ব্যারিস্টার কিউসি পদ লাভ করতে সক্ষম হয়েছি।

 

কালের কণ্ঠ : আজ আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে, এই অবস্থানে পৌঁছতে কী পরিমাণ মেধা ও শ্রম দিতে হয়েছে?

আজমালুল হোসেন কিউসি : আমার বাবা আসরারুল হোসেন ব্যারিস্টার ছিলেন। আমরা তিন পুরুষ লিংকনস ইনের ব্যারিস্টার। আমার মরহুম বাবা, আমি ও আমার দুই ছেলে। আমার বাবা ১৯৪৭ সালে লিংকনস ইনের ব্যারিস্টার হন। বাবা ব্যারিস্টার হওয়ার পর কলকাতায় কিছুদিন কাজ করেন। এরপর দেশে আইন পেশায় নিয়োজিত হন। একটি জিনিস তিনি বলতেন, ‘ওকালতি করতে গেলে এই পেশার ওপরের দিকে থাকতে হবে। কারণ নিচের দিকে অনেক আইনজীবী রয়েছেন, আর ওপরের দিকে অনেক জায়গা খালি রয়েছে।’ এই কথা আমাদের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাও বলেন যে ‘ওপরের দিকে সব সময় স্পেস থাকে, নিচের দিকে স্পেস কম।’ আমার বাবা একবার আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আইনের বইয়ে কার নাম থাকে? আমি বলেছিলাম, যিনি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তাঁর নাম। সঠিক উত্তর ছিল, যিনি আইনের বিষয়ে নতুন কোনো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তাঁর নাম থাকে আইনের বইয়ে। অন্যরা সেটি অনুসরণ করেন। আমার প্রতি বাবার কথা ছিল, এ রকম নতুন যুক্তি উপস্থাপনের যোগ্যতাসম্পন্ন আইনজীবী হতে হবে। বাবার কথাগুলো সব সময় আমার মাথায় কাজ করে। সেই থেকেই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। আমি ১৯৭৬ সালে বিলাতে বার অ্যাট ল ও ১৯৭৭ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করে কেনেথ জুকারের চেম্বারে কাজ শুরু করি। ওই চেম্বারে অনেক জুনিয়র কাজ করতেন। ওই চেম্বারে কাজ করাকালে পড়াশোনার জন্য বেশ পরিশ্রম করেছি। অযথা সময় নষ্ট করিনি। ওখানে একটি সংস্কৃতি ছিল, সন্ধ্যা ৬টা হলেই চেম্বারে কর্মরত জুনিয়র ও অন্য আইনজীবীরা কাজ শেষ করে বিয়ার পান করতে পাবে যেতেন। কিন্তু আমি কখনো সেটি করিনি। সবাই যখন সন্ধ্যা ৬টায় চেম্বার থেকে বের হয়ে যেতেন, আমি তখন চেম্বারে নিরিবিলি পরিবেশে কাজ করতাম, স্টাডি করতাম, শুনানির জন্য মামলা প্রস্তুত করতাম। এর ফলও ভালো পেয়েছি। পরদিন আদালতে ভালোভাবে শুনানি করতে পেরেছি। মামলার রায়ও আমার পক্ষে এসেছে। এভাবে এই পেশায় ভালো পরিচিতি লাভ করি। এ ছাড়া অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আইন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হতে হয়েছে। আমি সিভিল প্র্যাকটিসের মাধ্যমে বিলাতে কাজ শুরু করি। ওই সময় বাংলাদেশ তথা সাউথ এশিয়ার হাতেগোনা কয়েকজন ব্যারিস্টার সেখানে প্র্যাকটিস করতেন। তাঁরা সাধারণত ক্রিমিনাল অথবা ইমিগ্রেশন নিয়ে কাজ করতেন। আমি শুরুর দিকে যখন আদালতে শুনানি করতে যাই, তখন বিচারকদের কাছে বৈষম্যের শিকার হই। কারণ ওখানে বিলাতি ব্যারিস্টারদের প্রাধান্য। কিন্তু শুনানি শুরু করার পর আর কোনো সমস্যা হতো না। বিচারক ও আইনজীবীরা মনোযোগ দিয়ে আমার শুনানি গ্রহণ করতেন। মামলার রায় পক্ষে আসত। এভাবে বিলাতে পরিচিতি লাভ করি এবং জুটে যায় বিলাতি ও অন্য দেশি অনেক মক্কেল।

 

কালের কণ্ঠ : আপনি যখন ব্রিটেনে পড়াশোনা করেছেন, তখন সেখানে এ দেশের হাতেগোনা শিক্ষার্থী পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছে। এখন এই পরিমাণ অনেক বেশি। আইনজীবীদের পেশাগত দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য আপনার পরামর্শ?

আজমালুল হোসেন কিউসি : ঠিকই বলেছেন, আমি যখন বিলাতে পড়াশোনা করি, তখন সেখানে হাতেগোনা কয়েকজন বাঙালি তথা সাউথ এশিয়ান পড়াশোনা করেছেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক আমার জুনিয়র ব্যাচের। আবার সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক আমার ইমিডিয়েট আগের ব্যাচে পাস করেছেন। তাঁরা দেশে ফিরে এসেছেন। আর আমি সেখানেই কাজ শুরু করি। সেখানে কাজ করাটাও বেশ কঠিন ছিল। আদালতে সলিসিটর ও ব্যারিস্টার কাজ করেন। কোনো মক্কেলকে সাধারণত সলিসিটরদের কাছে যেতে হয় মামলা করতে। তাই আমার জন্য মামলা পাওয়া বেশ কঠিন ছিল। আমি আগেই বলেছি, কেনেথ জুকারের চেম্বারের সবাই যখন পাবে যেতেন বিয়ার খেতে, তখন আমি চেম্বারে কাজ করেছি। প্রতিদিন চেম্বারে দু-তিন ঘণ্টা বেশি কাজ করেছি অন্যদের চেয়ে। আর পড়াশোনা কন্টিনিউ। বিলাতে প্রথম দিকে প্র্যাকটিস করার সময় একটি দুশ্চিন্তা ছিল মাথায়। সেটি হলো আমার কোনো মক্কেল যদি মামলায় হেরে যান, তাহলে আমাকে নিয়ে কটূক্তি করবেন বিলাতি ব্যারিস্টাররা। কারণ ওখানে একটি সাধারণ মনোভাব রয়েছে, ‘ব্যারিস্টার হবেন বিলাতি।’ সে জন্যই মামলার শুনানির জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েই আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতাম। এ ছাড়া আমার সিনিয়র কেনেথ জুকার আমার পরিশ্রম ও আন্তরিকতা দেখে বেশ সহযোগিতা করেছেন। আমি ব্যাংকিং ও এ-সংক্রান্ত আইন হাতেনাতে শিখতে ছয় মাস বিলাতে বাংলাদেশ সোনালী ব্যাংক শাখায় কাজ করেছি। এতে ব্যাংকিং নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা বেশ ভালো হয়েছে। এখনো আমার বেশির ভাগ মামলা ব্যাংকিং-সংশ্লিষ্ট। নবীন আইনজীবীদের বলব, একজন মক্কেল আইনজীবীর কাছে আসেন একটি সমস্যা সমাধানের জন্য। সেই সমস্যা শুধু মামলা করেই সমাধান করতে হবে—এটি বাধ্যতামূলক কোনো বিষয় নয়। এমনও সমস্যা রয়েছে, একজন আইনজীবী কারো কাছে একটি চিঠি লিখে মক্কেলের সমস্যা সমাধান করতে পারেন বা কারো সঙ্গে কোনো বিরোধ থাকলে দুই পক্ষকে নিয়ে বসে তা সমাধান করতে পারেন। অথবা একটি টেলিফোনে ওই সমস্যা সমাধান করতে পারেন। এ বিষয়গুলোও খেয়াল রাখতে হবে।

 

কালের কণ্ঠ : আপনার পড়াশোনা আর আইন পেশায় আসাটা কিভাবে?

আজমালুল হোসেন কিউসি : ঢাকাতেই আমার পড়াশোনা শুরু। ১৯৬৭ সালে সেন্ট গ্রেগরিজ থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৬৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করি। দুটিই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে। ছাত্র হিসেবে বেশ ভালোই ছিলাম। ম্যাট্রিক ও ইন্টারে স্টার মার্কসসহ ফার্স্ট ডিভিশন ছিল, অনেক বিষয়ে লেটার মার্কসও ছিল। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হই। ১৯৭১ সালের অক্টোবরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ না করেই বিলাতে পাড়ি জমাই। সেখানে কিংস কলেজে এলএলবিতে (সম্মান) ভর্তি হই। ১৯৭৬ সালে এলএলবি সম্পন্ন করে ব্যারিস্টার অ্যাট ল ডিগ্রি লাভ করি। ১৯৭৭ সালে কিংস কলেজ থেকেই এলএলএম সম্পন্ন করি। আসলে আমার মনে আগে থেকেই ব্যারিস্টার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। এর কারণ ছিল, তখনকার ব্যারিস্টারদের মধ্যে একটি গ্ল্যামার ছিল, তাঁরা বেশ স্টাইলিশ ছিলেন। আমার বাবা ব্যারিস্টার হওয়ার করণে আমি এই গ্ল্যামার আর স্টাইলের সঙ্গে বেশ পরিচিত হই। আবার আমাদের সমাজে জজ-ব্যারিস্টার শব্দ যুগল বেশ আকর্ষিত ছিল। সেখান থেকেই ব্যারিস্টার হওয়ার আগ্রহটা। আর বাবার ইচ্ছাটাও ছিল বেশ প্রবল।

 

কালের কণ্ঠ : আপনি দীর্ঘদিন ব্রিটেনে সফলভাবে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, এখনো কাজ করেন। বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে আপনি নিয়মিত মামলা পরিচালনার কাজ করছেন। কেমন দেখছেন আমাদের বিচারব্যবস্থা?

আজমালুল হোসেন কিউসি : আমি দীর্ঘদিন বিলাতে কাজ করেছি। ওখানে কাজ করার সময় আমার বাবা বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টেও ওকালতি করতেন। আর আমি বিলাতে প্র্যাকটিস শুরুর পরপরই বাবা এ দেশের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে আমাকে তালিকাভুক্ত করান। তারপর মাঝেমধ্যে দেশে বেড়াতে এসে বাবার সঙ্গে হাইকোর্টে যেতাম। মাঝেমধ্যে আদালতে সাবমিশনও করতাম। এভাবেই যাওয়া-আসাটা ছিল। ১৯৯১ সালের আগে এরশাদের শাসনামলে অ্যাড হক আইন কমিশন করা হয়। আমার বাবা ব্যারিস্টার আসরারুল হোসেনকে সেই কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়। ওই সময় বাবার কয়েকটি মামলা করার জন্য আমি দেশে এসেছিলাম। ওই সময়ই আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করি এবং অনুমোদন লাভ করি। কিন্তু ১৯৯৫ সালের আগে আপিল বিভাগে কোনো মামলা করা হয়নি। ১৯৯৫ সালে বাবা অসুস্থ হলে তাঁকে দেখতে আসি। তাঁর একটি বড় মামলা ছিল। মামলার এক পক্ষ সোনালী ব্যাংক, অন্য পক্ষ বেঙ্গল লাইনার নামের একটি জাহাজ কম্পানি। মামলাটি বেশ আলোচিত ছিল। বাবা আমাকে বললেন, তুমি এই মামলা আপিল বিভাগে শুনানির প্রস্তুতি গ্রহণ করো। আমি তাঁর কথামতো প্রস্তুতি নিয়ে আপিল শুনানি করি। কিন্তু মামলার রায়ের সময় আমি বিলাতে ছিলাম। রায় আমার পক্ষে আসে। তখন থেকেই দেশের সুপ্রিম কোর্টে আমার বেশ পরিচিতি আসে। এরপর ১৯৯৭-৯৮ সালে আমি বাংলাদেশে নিয়মিত মামলা করা শুরু করি। আমাদের দেশে বেশির ভাগ আইনজীবীর মধ্যে একটি প্রবণতা দেখি, সেটি হলো—প্রস্তুতি ছাড়াই মামলার শুনানি করতে আদালতে আসেন। প্রস্তুতি থাকলে আদালতে কথা বলতে আইনজীবীর জন্য কোনো সমস্যা থাকবে না। তাহলে আদালত দ্রুত শুনানি করে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেন। কিন্তু প্রস্তুতি না থাকলে আইনজীবীরা আদালতে অনেক অপ্রয়োজনীয় কথা বলে সময় নষ্ট করেন। আবার আটকে গেলে সময় নেন। বিলাতের আদালতে কোনো মামলার শুনানি শুরু হলে সেটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অন্য মামলা শোনেন না আদালত। প্রতিটি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তাগিদও রয়েছে। তারা সেটিতেই অভ্যস্ত। কিন্তু আমাদের দেশের আদালতের চিত্র উল্টো।

 

কালের কণ্ঠ : আপনার কাছে কি মনে হয় আমাদের বিচারব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি বা কোনো ধরনের অন্তরায় রয়েছে?

আজমালুল হোসেন কিউসি : বিলাতের বিচারক ও আইনজীবীরা মাঝেমধ্যেই আমার কাছে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে জানতে চান। আমাদের সব কিছু উন্নয়নশীল। অনেক আগে থেকেই আমাদের বিচারব্যবস্থা চালু রয়েছে। কিন্তু সিস্টেমটা হলো পুরনো। পুরনো হলেও সমস্যা ছিল না, যদি আইনগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হতো। এখানে একটি জিনিস হচ্ছে, একটি মামলার বিচারকাজ চলে দীর্ঘদিন ধরে। কারণ হলো, আইনজীবীরা মামলার শুনানিতে প্রস্তুত থাকেন না বা এক দিনে অনেক মামলার শুনানি করতে চান। এ রকম কোনো সিস্টেম বিলাতে কখনো পাইনি। মামলার শুনানির জন্য সময় চেয়ে মামলার কার্যক্রম মুলতবি করার প্রবণতা আমাদের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি অভিশাপ। আমাদের আদালতে অপর পক্ষের আইনজীবীর অনুপস্থিতিতে সময় নিয়ে আদালত ত্যাগ করার প্রবণতা রয়েছে আইনজীবীদের মধ্যে। আবার বিচারকরা সময় দিয়ে দেন অনায়াসে, যা খুব ক্ষতিকর। বিলাতে যখন প্র্যাকটিস শুরু করি সে সময়, একজন সিনিয়র আইনজীবী চার-পাঁচটি মামলা নেওয়ায় অন্য মামলা শুনানি করার কারণে সময় নিতেন। সেখানে ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে এই সিস্টেম বন্ধ করা শুরু হলো। সেখানকার প্রধান বিচারপতি প্র্যাকটিস ডিরেকশন দিয়ে বলে দিলেন, অন্য মামলার আইনজীবীর ব্যস্ততার কারণে কোনো মামলার কাজ মুলতবি হবে না। কোনো জুনিয়র ব্যারিস্টার সিনিয়র ব্যারিস্টারের পক্ষে আদালতে সময় চাইলে আদালত বলে দিতেন, বিলাতে পাঁচ হাজার ব্যারিস্টার রয়েছেন। আপনার সিনিয়রকে বাদ দিয়ে ওই পাঁচ হাজারের মধ্য থেকে একজনকে নিয়ে আসুন। যিনি অন্য মামলায় ব্যস্ত রয়েছেন, তাঁকে এই মামলা ছেড়ে দিতে বলুন। এভাবে পরিবর্তন হওয়া শুরু হয়েছে বিলাতে। এখন যদি বিলাতের আদালতে কোনো আইনজীবী অন্য মামলায় ব্যস্ত থাকার কথা বলে সময় চান, তাহলে সবাই হাসাহাসি করবে। আমাদের সুপ্রিম কোর্টে কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী রয়েছেন, এক দিনে ১২ থেকে ১৪টি মামলা করতে চান। আসলে একজন আইনজীবীর পক্ষে এক দিনে এত মামলা ভালোভাবে শুনানি করা সম্ভব নয়। এটি আমাদের আদালতের একটি মারাত্মক সমস্যা।

(বাকি অংশ আগামীকাল)

 


মন্তব্য