১০৩. আল্লাহ 'বাহিরা', 'সায়েবা', 'ওয়াসিলা' ও 'হাম'কে শরিয়তসিদ্ধ করেননি। কিন্তু যারা কাফির, তারা আল্লাহর ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে। আর তাদের অধিকাংশেরই বিবেকবুদ্ধি নেই। (সুরা আল মায়েদা : ১০৩) তাফসির : আলোচ্য আয়াতে জাহেলি যুগের কিছু ভ্রান্তপ্রথা ও কুসংস্কারের বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। 'বাহিরা', 'সায়েবা', 'ওয়াসিলা' ও 'হাম' প্রভৃতি জাহেলি যুগের কুপ্রথার নাম। সুপ্রসিদ্ধ হাদিসগ্রন্থ সহিহ বুখারি শরিফে সায়িদ ইবনে মুসাইয়্যেব থেকে বর্ণিত হয়েছে যে 'বাহিরা' সেই গৃহপালিত জন্তুকে বলা হয়, যাকে দেবতার নামে উৎসর্গ করে দুধ দোহন বন্ধ করে দেওয়া হয়। কেউই তার দুধ পান করে না। 'সায়েবা' ওই জন্তু, যাকে প্রতিমার নামে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর এর পিঠে মালামাল বহন করা হয় না। 'ওয়াসিলা' বলা হয় সেই উষ্ট্রীকে, যে উষ্ট্রী প্রথমবার একটি নর বাচ্চা প্রসব করে পর পর দুবার মাদি বাচ্চা প্রসব করে। এ এরূপ উটনিকেও দেবতার নামে ছেড়ে দেওয়া হতো। 'হাম' সেই উটকে বলা হয়, যার দ্বারা বিশেষসংখ্যক প্রজননের কাজ নেওয়া হয়েছে। তাকেও প্রতিমার নামে ছেড়ে দেওয়া হতো। কাফিররা স্বেচ্ছায় নিজেদের জন্য উল্লিখিত জন্তুগুলো নিষিদ্ধ করে নিয়েছিল। কুসংস্কার : আরব্য জাহেলিয়াত থেকে নব্য জাহেলি যুগে কুসংস্কার বলা হয় যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাসকে। সেটি হতে পারে ধর্মের নামে, সামাজিকতার নামে, মতবাদ ও শাস্ত্রের নামে। দীর্ঘদিন ঐশী বার্তার জ্ঞান ও নবী-রাসুলদের সংস্পর্শ-বঞ্চিত আরব জাতি অজ্ঞতা, বর্বরতা ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল। সমাজের রন্ধে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছিল অন্ধকার। ভ্রান্ত বিশ্বাস, কুপ্রথা ও কুসংস্কারে ছেয়ে গিয়েছিল গোটা সমাজ। রাসুল (সা.) জাহেলি যুগের সব কুপ্রথার মূলে কুঠারাঘাত করেছেন। বিদায় হজের ভাষণে তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, 'জাহেলি যুগের সব কুপ্রথা আমার পায়ের নিচে নিক্ষেপ করা হলো।' কিন্তু হাজার বছর পার হয়ে গেল, সভ্যতাও অনেক দূর এগিয়ে এলো, তা সত্ত্বেও মানবসমাজ থেকে পুরোপুরিভাবে কুসংস্কার নির্মূল করা সম্ভব হয়নি; বরং যুগের পরিবর্তনে নতুন রূপ ও অবয়বে নতুন নতুন কুসংস্কারের উদ্ভব ঘটেছে। মানুষ নতুন নতুন বেদি ও দেবতার আবিষ্কার করেছে। নীরবতা প্রদর্শন, মোমবাতি প্রজ্বালন, হস্তরেখা, ভাগ্য পরীক্ষা ও রাশিফলের মতো যুক্তিহীন বিষয়ে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। পশুর গলায় মালা পরানো, বাবার নামে, মাজারের নামে পশু ছেড়ে দেওয়ার মতো ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। এসব তো শহরাঞ্চলের অবস্থা। গ্রামে-গঞ্জে জীবনের পরতে পরতে কুসংস্কার ছেয়ে গেছে, 'পরীক্ষায় যাওয়ার আগে ডিম খাওয়া যাবে না', 'দোকানের প্রথম কাস্টমার ফেরত দিতে নেই', 'জোড়া কলা খেলে জোড়া সন্তান হবে', 'কোরআন পড়ে গেলে আড়াই কেজি চাল দিতে হয়', 'নতুন কাপড় পরিধান করলে আগুনে সেক দিতে হয়', 'কাক ডাকলে বিপদ আসে', 'পেঁচা অশুভ'- আরো কত কী! সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো, যখন কোনো কোনো কুসংস্কারকে ধর্মের কর্ম বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। যেমন- আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে, 'কাফিররা আল্লাহর ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে।' আশ্চর্য হলো, বর্তমানেও বহু বিষয়কে 'জায়েজ' করার জন্য ধর্মের নাম ব্যবহার করা হয়। অথচ ধর্ম এসবকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয় না, সমর্থনও করে না। কুসংস্কার নির্মূলে ইসলাম কুসংস্কারের প্রধান কারণ হলো অজ্ঞতা। ইসলামের প্রথম কথাই হলো 'ইকরা' বা তুমি পড়ো। অজ্ঞতাকে জয় করা গেলে কুসংস্কার নির্মূল করা সম্ভব। ইসলামে অশুভ বলতে কিছু নেই। সৃষ্টির কোনো কিছুই অশুভ নয়। কোরআনের ভাষায়, 'হে আমার রব, তুমি এসব নিরর্থক সৃষ্টি করোনি।' (সুরা আলে ইমরান : ১৯১)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'হে মুমিনগণ, মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্যনির্ধারক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো।' (সুরা মায়েদা : ৯০)। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'কোনো কিছুকে অশুভ, অপয়া মনে করা শিরক।' (আল আদাবুল মুফরাদ)। আলোচ্য আয়াতেও বলা হয়েছে, "আল্লাহ 'বাহিরা', 'সায়েবা'...কে শরিয়তসিদ্ধ করেননি।" কাজেই সামাজিক কোনো কুসংস্কারের দায়ভারও শরিয়ত বহন করবে না। (তাফসিরে মা'আরেফুল কোরআন ও ইবনে কাছির অবলম্বনে)