kalerkantho


স্বাধীনতা এবং একজন কাঙ্গালিনী সুফিয়া

এ কে এম শাহনাওয়াজ   

২৭ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০



স্বাধীনতা এবং একজন কাঙ্গালিনী সুফিয়া

১৭ আগস্ট সন্ধ্যা। বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী বলে দিনটি বাঙালি জাতির জন্য 'বিশেষ' দিন ছিল। এই সন্ধ্যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে একটি মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক সংগঠন 'আনন্দনে'র বার্ষিক উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল এদিন। সংগঠনের কর্মীরা এবার গুণীজন সম্মাননা দেবে লোকসংগীতশিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়াকে। এই বাউল শিল্পী সাভারেরই বাসিন্দা। সাভারের পৌর এলাকা জামসিংয়ে সামান্য এক টুকরো জমিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই রয়েছে তাঁর।

প্রায় আশি ছুঁই ছুঁই ক্ষীণাঙ্গী এই বাউল শিল্পী। বছর দুই আগে পত্রিকা আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে জেনেছিলাম কাঙ্গালিনী সুফিয়ার করুণ অবস্থা। কঠিন অসুখে হাসপাতালে ভর্তি। ফলাও করে প্রচার পেয়েছিল তাঁর আর্থিক দুরবস্থার কথা। চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন চলাফেরা করার মতো সুস্থ আছেন। তাই এই গুণী বাউলশিল্পী সম্মাননা গ্রহণ করতে আসতে পেরেছেন ক্যাম্পাসে। এ জন্য ভীষণ আনন্দিত আনন্দনের ছেলেমেয়েরা। মুক্তমঞ্চের দর্শক গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল। এই বয়সে অসুস্থতা ও দারিদ্র্যের ধকল সামলে কাঙ্গালিনী সুফিয়া তাঁর কণ্ঠের বলিষ্ঠতা ও সহজাত বাউল নাচের মোহনীয় ভঙ্গিতে মঞ্চ মাতালেন।

কিন্তু এই বাউলশিল্পী মঞ্চ মাতালেও এক নিদারুণ কষ্ট যে তাঁকে জড়িয়ে রেখেছে। এ সত্যটি কেমন করে যেন আমার ছাত্রছাত্রীদের মন ছুঁয়ে গেল। এ প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি।

আনন্দনের যে ছেলেমেয়েরা এই শিল্পীকে নিমন্ত্রণ করতে গিয়েছিল এবং পরম মমতায় ও ভালোবাসায় ক্যাম্পাসে নিয়ে এসেছে, ওরা শোনাল তাঁর করুণ কষ্টের কথা। যে লোকসংগীতশিল্পী তাঁর সাধনায় বাংলার বাউলসংগীতের ধারাকে পরিপুষ্ট করতে সারা জীবন শ্রম ও নিষ্ঠা দিয়ে নিবেদিত থেকেছেন, বাংলার বাইরেও নিজের গায়কী ঢংয়ে বাউলসংগীতকে ছড়িয়ে দিয়েছেন- সমাজ তাঁকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে রেখে সংস্কৃতির মোরগ মোসল্লাম খাচ্ছে।

ছোট্ট এক চিলতে জমিতে টিনশেড ঘরে দারিদ্র্যের চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। সবচেয়ে বড় লজ্জার হচ্ছে ভাঙাচোড়া রাস্তা দিয়ে তাঁর বাড়ির কাছাকাছি যাওয়া যায় বটে, তার পরই হোঁচট খেতে হয় শিল্পীর অবরুদ্ধ দশা দেখে। প্রতিবেশী শক্তিমানরা দেয়াল দিয়ে অবরুদ্ধ করে রেখেছে কাঙ্গালিনী সুফিয়ার বাড়িতে প্রবেশের পথ। সুফিয়া ও তাঁর পরিবারকে দেয়াল ডিঙিয়ে প্রতিদিন আসা-যাওয়া করতে হয়। বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ল শহীদুল্লাহ নামের তরুণ ছাত্রটি। কাঙ্গালিনী সুফিয়ার কাছ থেকেই শোনা গেল এলাকার মাতব্বররা দেয়াল সরিয়ে চলাচলের পথ অবমুক্ত করে দেবেন বলে অঙ্গীকার করেছেন। তবে 'ক্ষতিপূরণ' বাবদ দুই লাখ টাকা দিতে হবে। কাঙ্গালিনী সুফিয়া তো অর্থবিত্ত বিচারে সত্যিই কাঙ্গালিনী। যাঁর ঠিকমতো খাবার জোটে না। চিকিৎসা খরচ মেটানো দায়- তিনি দুই লাখ টাকার সংস্থান করবেন কিভাবে! তাই তো এই গুণী শিল্পী অশ্রুসজল চোখে ছাত্রছাত্রীদের কাছে প্রার্থনা করেন। বলেন, এখন গান গাইতে কষ্ট হয়, তবুও তিনি গাইবেন। হলে হলে যেন ওরা গানের জলসার আয়োজন করে। এভাবে তিনি দুই লাখ টাকা জোগাড় করতে চান। ছাত্রছাত্রীরা অশ্রুসজল হয়ে পড়ল, যখন একজন নিরুপায় অসুস্থ বাউলশিল্পী বেঁচে থাকার দায়কে বড় মেনে দ্বিধাগ্রস্ত কাঁপা কণ্ঠে দর্শকদের কাছে আবেদন করলেন- 'বাবারা-মায়েরা! তোমরা সামান্য হাতঝাড়া দিলে আমার কোঁচড় ভরে যায়।' তখন আর কেউ নীরব থাকতে পারল না। আয়োজকরা মাইকে মানবিক আবেদন জানাল আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এলো দর্শক ছাত্রছাত্রীরা। ওদের সাধ্যই বা কত! তবুও দশ টাকা, বিশ টাকা, পঞ্চাশ টাকা আর এক শ টাকার নোট জমা হতে লাগল। এভাবে সংগ্রহ হয়ে গেল প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। আনন্দনের ছেলেমেয়েরা ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, অফিসার ও কর্মচারীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সেখান থেকে শিল্পীর হাতে সম্মাননা স্মারকের সঙ্গে তুলে দেওয়ার জন্য পাঁচ হাজার টাকা রেখেছিল। এই দুই সংগ্রহে দশ হাজার টাকা তুলে দিয়ে শিল্পীর প্রতি সামান্য ঋণ স্বীকারের চেষ্টা করল।

আর আমি স্বাধীনতার মাসে মানসিকভাবে ভীষণ আহত হলাম। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা আমরা হরহামেশা বলি। স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে একটু বেশি করেই বলি। অনেক সময় এই চেতনা বলতে কী বুঝি তা স্পষ্ট হয় না। হতাশ হয়ে ভাবতে হয়, এই যে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হলো। লাখো মানুষের রক্তমূল্যে কেনা হলো স্বাধীনতা। প্রত্যাশা ছিল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা স্বাধীন দেশে আমাদের চৈতন্যোদয় ঘটাবে। বন্দিত্বমুক্তি ঘটাবে পরিবেশ ও মানসিকতার। আমরা পাব জনকল্যাণমুখী রাজনীতি। অন্যায়-অনাচার আর দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ করে দেশপ্রেমের শক্তিতে উজ্জীবিত হব। সমাজ-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সুবাতাস বইবে। নিজ সত্তাকে খুঁজে নিতে বাঙালি অনেক বেশি যত্নবান হবে।

কিন্তু স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও দেশ, মাটি ও মানুষের সুর কণ্ঠে ধারণ করে যে কাঙ্গালিনী সুফিয়ারা বাঙালি সংস্কৃতিকে অনেক মমতায় লালন করছেন, তাঁদেরই জীবন বিধ্বস্ত করে দিচ্ছে দারিদ্র্য। যাঁদের সামনে দেখে নতুন প্রজন্ম প্রণোদিত হবে, তাঁদের লাঞ্ছিত করছে সমাজ। কাঙ্গালিনী সুফিয়া তো এই মাটি থেকে বেড়ে উঠেছেন। তাঁকে তৈরি করতে রাষ্ট্রের কোনো প্রত্যক্ষ খরচ হয়নি। অথচ তিনি কয়েক যুগ ধরে আমাদের লোকসংগীতের ভুবনকে পরিপুষ্ট করেছেন। জাতিকে মর্যাদাবান করতে নীরবে ভূমিকা রেখে গেছেন।

আমরা কি এর মূল্য দিতে পেরেছি? আমাদের রাজনীতিবিদ, সংস্কৃতি অঞ্চলের নেতা-নেত্রীরা, বিত্তশালী মানুষ, সুশীল সমাজের পোশাকি সদস্য- সবাই পোশাক সাফসুতরো করে রেখেছি। প্রকৃতির নিয়মে এই আশি বছর ছোঁয়া কাঙ্গালিনী সুফিয়া মৃত্যুবরণ করলে কতটা গাম্ভীর্যপূর্ণ ও আবেগ মাখানো শব্দাবলিতে মঞ্চ কাঁপানো যায় বা টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো যায়, সেই মহড়া দিচ্ছি। কিন্তু বেঁচে থাকতে এই মানুষটির পাশে দাঁড়িয়ে একটু সহানুভূতির হাত বাড়াইনি। এ ক্ষেত্রে সংস্কৃতি অঙ্গনের নেতৃত্বে যাঁরা আছেন, তাঁদের একটু বেশি স্পর্শকাতর হওয়ার কথা। কিন্তু সে জায়গাটিও এখন নানা দল ও রং পরিচয়ে বিভক্ত হয়ে গেছে। ফলে একজন কাঙ্গালিনীর কথা মনে রাখার সুযোগ কোথায়! কাঙ্গালিনী সুফিয়া একা নন; সমাজের ভ্রুকুটি আর কশাঘাতে এমন অনেক শিল্পী নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছেন। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে আনার জন্য হলেও গভীর মমতা ও ভালোবাসা নিয়ে এসব আর্ত আত্মজ-আত্মজাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। এই দায়বোধ কি কারো মধ্যে কাজ করছে?

স্বাধীনতার মাসে আমরা এই লজ্জা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। হাজার কোটি টাকা লোপাট এখন ওপেন সিক্রেট। হলমার্করা গিলে খাচ্ছে সব। শেয়ারবাজার থেকে টাকা সরিয়ে নিচ্ছে তস্কররা, অক্টোপাসের হাত দিয়ে ঘুষ-দুর্নীতির মচ্ছব হচ্ছে। রাষ্ট্র এর প্রতিবিধান না করে কখনো পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠছে। এসব অন্ধকারের পরও আমরা আলো দেখতে চাই। সমাজের বিত্তশালী ও সংবেদনশীল মানুষদের আমি আহ্বান জানাই কাঙ্গালিনী সুফিয়ার পাশে এসে দাঁড়ান। সাভার অঞ্চলের জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব নয়- কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে জামসিংয়ে অবরুদ্ধ কাঙ্গালিনী সুফিয়ার মাথায় নির্ভরতার হাত রাখা। আমরা দেখতে চাই এই নির্বাচনী অঞ্চলের মাননীয় এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র মহোদয় এবং স্থানীয় প্রশাসন যত দ্রুত সম্ভব অবরোধ দেয়াল ভেঙে শিল্পীর স্বাভাবিক চলাচলের পথ তৈরি করে দেবেন। শেষ জীবনটি আর্থিক টানাপড়েন থেকে রক্ষা পেয়ে যেন সুস্থ জীবন যাপন করতে পারেন, সে জন্য সামর্থ্যবান মানুষদের সামান্য সহানুভূতিই যথেষ্ট। এ ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে সর্বস্তরের মানুষের এগিয়ে আসার প্রত্যাশা করছি। আমরা এই স্বাধীনতার মাসেই বলতে চাই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমরা হারিয়ে ফেলিনি। এ মাসেই সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে আমরা আরেকটি অনুষ্ঠানে কাঙ্গালিনী সুফিয়াকে সসম্মানে নিয়ে আসতে চাই। প্রত্যাশা করব, সেখানে উপস্থিত থাকবেন অনেক আলোকিত মানুষ। যাঁরা সহযোগিতার হাত বাড়াবেন এই গুণী শিল্পীর প্রতি। এতে জাতি হিসেবে আমাদের পাপ নিশ্চয়ই স্খলিত হবে।

একজন কাঙ্গালিনী সুফিয়া নন- এমন অনেক বিপন্ন শিল্পী, মুক্তিযোদ্ধা অবহেলার শিকার হয়ে অনেক কষ্টে জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন। সমাজের দায়িত্বশীলদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ও সহযোগিতা যদি তাঁদের নির্ভরতার জায়গা হতে পারে, তাহলে আমাদের স্বাধীনতা অর্থবহ হয়ে উঠবে। কালের কণ্ঠ গত বছর ১৯ আগস্ট আমার একটি কলাম ছেপেছিল। শিরোনাম ছিল- 'সাদিয়াদের জন্য অপেক্ষা করছে বাংলাদেশ'। সেখানে আমার এক ছাত্রীর আকুতি ও আবেগ উপস্থাপিত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এই মেয়েটি কষ্ট পেয়েছিল পত্রিকায় পঙ্গু ও দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের কথা পড়ে। তাঁদের কেউ বিনা চিকিৎসায় ধুঁকছেন, কেউ বয়সের ধার না ধেরে জীবনের প্রয়োজনে রিকশা চালাচ্ছেন, মুট বইছেন। আরেক দল ঠাণ্ডা ঘরে বসে স্বাধীনতার সুখ ভোগ করছেন। সাদিয়া ক্ষমতাবানদের কাছে প্রার্থনা জানায়নি। সে আহ্বান জানিয়েছে ১৬ কোটি মানুষের কাছে। ওর হিসাব- প্রত্যেক মানুষ যদি মাসে একটি করে টাকা দেয়, তবে বিশাল অর্থভাণ্ডার গড়ে তোলা যাবে। আর এর সুষম বণ্টন করতে পারলে আমাদের সূর্যসন্তান দরিদ্র ও পীড়িত মুক্তিযোদ্ধাদের আলোকিত জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। মনে পড়ে সেই লেখাটি প্রকাশের পর অনেকেই সহমত পোষণ করে মেইল করেছিলেন। অনেকে বিস্মিত হয়ে বলেছেন, অতটুকুন মেয়ে যেভাবে ভাবতে পেরেছে আমরা কেন তা পারছি না।

আজ সাদিয়ার মতো করেই ভাবতে চাইছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। ওদের পক্ষ থেকে এই লেখায় আমি যে আবেদন জানিয়েছি, ওরা এর ইতিবাচক ফলাফল দেখতে চায়। না হলে অগত্যা দেশবাসীর কাছেই আবেদন নিয়ে উপস্থিত হতে হবে। তারুণ্য বিশ্বাস করে, যে জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশ স্বাধীন করতে পারে, তারা কাঙ্গালিনী সুফিয়াদের পাশেও দাঁড়াতে পারবে।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



মন্তব্য