kalerkantho


স্মৃতির ক্ষরণ

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আমি নিজে শহীদ পরিবারের সন্তান। আমার বাবাসহ আরো দুজনকে ১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা কয়েকজন রাজাকারের সহযোগিতায় ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারে। শ্রীমঙ্গল গ্রামে চালানো এই হত্যাযজ্ঞে শহীদ হলেন আমার বাবা নিকুঞ্জ বিহারি সেন, প্রতিবেশী কেতকী সেন ও কৃষ্ণ পোদ্দার। এর দুদিন পর বাড়ি থেকে তিন মাইল দূরে উত্তরসুর গ্রামে আমরা ২০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমার বয়স তখন ১১ বছর। ক্লাস সিক্সে পড়ি। আরেক রাজাকারের সহযোগিতায় তিন পাকিস্তানি সেই বাড়িতে ঢুকে পড়ে এবং নারী ও পুরুষদের আলাদা করে ফেলে। তারা পুরুষদের বাড়ি থেকে বের করে মাঠে নিয়ে উপুড় করে শুইয়ে রাখে। সব মহিলাকে এক কক্ষে আটকে রাখে। বয়স্ক ও অল্প বয়সীদের আলাদা করে। আমি আমার মায়ের সঙ্গে বের হয়ে আসার সুযোগ পাই।

এক পাকিস্তানি আমাদের খড়ের গাদার পাশে শুয়ে থাকতে বাধ্য করে। কিছুক্ষণ পর এক পাকিস্তানি একপর্যায়ে এসে আমাদের কাছে জানতে চেয়েছিল সুঁই আছে কি না। আমি বলি নেই। কিছুক্ষণ পর আরেক পাঞ্জাবি এসে বলে, অন্দর মে হাঁটো। আমি ভাবলাম, গুলি করবে। তবে এই কথা বলেই তারা চলে গিয়েছিল। সেদিন ঘরের ভেতর দুজন নারীকে আটকে রেখে তারা নির্যাতন করেছিল। পরে একজনকে ঘরে ও আরেকজনকে বাঁশ ঝাড়ের নিচে ভয়াবহ অবস্থায় পাওয়া যায়। এই দুই নারীর একজন আজও বেঁচে আছেন।

এই নির্যাতনের সূচনা পাকিস্তানিরা করেছিল ২৫ মার্চ রাতে। তাই আন্তর্জাতিকভাবে ২৫ মার্চ দিনটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। পাকিস্তানিরা সেদিন যে নিমর্ম হত্যাযজ্ঞের সূচনা করেছিল তা বিরল। এখানে আরো কিছু কথা আমি বলতে চাই। বঙ্গবন্ধু আমার মায়ের নামে দুই হাজার টাকার একটি চেক পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন সার্কেল অফিসারের হাত দিয়ে। আমি ও মা গিয়ে সেই চেক নিয়ে আসি। বঙ্গবন্ধু আমার মাকে সেই সঙ্গে একটি চিঠিও দিয়েছিলেন। তবে আজকাল আর কেউ শহীদ পরিবারের সদস্যদের ডাকে না। বরং একাত্তরের দালালরা দলীয় কমিটিতে স্থান পাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যাতে সত্যিকার অর্থেই প্রতিষ্ঠিত হয়, শহীদ পরিবারগুলো যোগ্য মর্যাদা পায়, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে।

 

অলক কান্তি সেন

শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার।


মন্তব্য