kalerkantho


অ্যালুমিনিয়ামশিল্প রক্ষায় এগিয়ে আসুন

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



অ্যালুমিনিয়ামশিল্প রক্ষায় এগিয়ে আসুন

একসময় পূর্ববঙ্গে কোনো অ্যালুমিনিয়াম কারখানা ছিল না। ব্রিটিশ মালিকানাধীন কলকাতার ‘ক্রাউন অ্যালুমিনিয়াম কারখানা সম্ভবত পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গে প্রথম অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র তৈরির কারখানা বা শিল্প। ব্রিটিশরাই এ দেশের মানুষকে প্রথম অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র উপহার দেয়। এর আগে কুমারদের দ্বারা প্রস্তুত মাটির বাসনপত্রই দেশের সাধারণ মানুষ ব্যবহার করত। জমিদার শ্রেণি, ধনী পরিবারগুলো ব্যবহার করত তামা-কাঁসার হাঁড়ি ও বাসনপত্র। চীন দেশ থেকে আসত কিছু চীনা মাটির বাসনপত্র, বর্তমানে আমরা যাকে বলি ‘সিরামিকস’। ধনু বাবু বা ধনু আগরওয়াল নামে এক মাড়োয়ারির মালিকানায় চল্লিশের দশকে ব্রিটিশ-ভারতের পূর্ববঙ্গের ঢাকার টিকাটুলীতে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় হরদেও গ্লাস অ্যালুমিনিয়াম অ্যান্ড সিনিকেট ওয়ার্কস। হরদেওকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গে ও ১৯৪৭ সালের পূর্ব পাকিস্তানে অ্যালুমিনিয়ামশিল্প গড়ে ওঠার ভিত্তি। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র আমদানি হতো। নব্য স্বাধীন দেশে পশ্চিম পাকিস্তানি অবাঙালিরা এ দেশে ব্যাপকভাবে অ্যালুমিনিয়াম কারখানা স্থাপন করল। ১৯৫৫ সালের আগে কোনো বাঙালি এ দেশে অ্যালুমিনিয়াম কারখানার মালিক ছিল না।

১৯৫৫ সালের দিকে উদীয়মান উদ্যোক্তা খায়ের উল্যাহ ভূইয়াসহ কিছু বাঙালির প্রচেষ্টায় এ দেশে অ্যালুমিনিয়াম কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করে। পাকিস্তান আমলে বাঙালি দ্বারা অ্যালুমিনিয়ামশিল্প গড়ে ওঠা কঠিন ছিল। শিল্পের সঙ্গে আমদানি লাইসেন্স, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কারিগর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর প্রায় সব কিছুই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে নিয়ন্ত্রিত। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে পরিত্যক্ত শিল্প আইনে বৃহৎ অ্যালুমিনিয়ামশিল্প রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে চলে আসে। নব্য স্বাধীন দেশে নানা অবকাঠামোগত, ব্যবস্থাপনা ও শিল্পের কাঁচামাল সংকট এবং সমস্যার কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত ও ধীরগতির জন্য বাজারে শিল্পপণ্যে সংকট দেখা দেয়। এই সুযোগে দেশে ব্যাপক অ্যালুমিনিয়ামশিল্প গড়ে ওঠে। তখন দেশে অ্যালুমিনিয়ামশিল্পের সংখ্যা ছিল প্রায় চার হাজার, যাতে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ছিল। আশির দশক অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের স্বর্ণযুগ। আশির দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির বদৌলতে দেশে ব্যাপক কিচেন ও ডাইনিং টেবিলওয়্যার আমদানি শুরু হয়। পাশাপাশি স্টেইনলেস স্টিল, মেলামাইন, প্লাস্টিক ও সিরামিকস শিল্পের বিকাশ ঘটে। এই বিকাশ ও আমদানির ফলে দেশীয় অ্যালুমিনিয়ামশিল্পে উৎপাদনে ভাটা পড়ে। একে একে কারখানা বন্ধ ও উৎপাদন সংকুচিত হয়। ফলে এই শিল্পের লাখ লাখ কর্মজীবী বেকার হয়ে পড়ে। অনেক মালিক পুঁজি হারিয়ে দিশাহারা। এই শিল্পের কারিগর ও শ্রমিকরা জীবিকার জন্য অন্য পেশা বেছে নিচ্ছে। কেউ কেউ মানবেতর জীবন যাপন করছে।

বাংলাদেশে তিলে তিলে গড়ে ওঠা ফসল এই অ্যালুমিনিয়ামশিল্প। এ শিল্পের সব যন্ত্রপাতি বাংলাদেশেই তৈরি হয়। বাঙালিরাই এখন এ শিল্পের দক্ষ ব্যবসায়ী, কারিগর ও প্রকৌশলী। গ্রামগঞ্জের মানুষ এ শিল্পপণ্যের ওপর নির্ভরশীল। তাই দেশের এই মৌলিক শিল্প বাঁচিয়ে রাখা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। গ্রামগঞ্জের ব্যবহার্য অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র রক্ষা, এ শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবিকা বাঁচাতে, শিল্প রক্ষা করে শিল্পের মালিকদের বাঁচানো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অ্যালুমিনিয়াম শিল্প এলাকা বা জোন গড়ে সুলভ মূল্যে লিজে জমি প্রদান, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ, রপ্তানির লক্ষ্যে আমদানি করা কাঁচামালে কর রেয়াতসহ নানাভাবে সহায়তা করে এ শিল্পের মালিক-শ্রমিকদের বাঁচাতে পারে সরকার। আমাদনি করা ইনগটে ভ্যাট ও ট্যাক্স রেয়াত, ব্যাংকঋণে সুদ কমানো, অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র রপ্তানিতে প্রণোদনার ব্যবস্থা এবং বিদেশি কিচেনওয়্যার, ডাইনিং টেবিলওয়্যার আমদানিতে করারোপের মাধ্যমে দেশি এ শিল্প সংরক্ষণ নীতির মাধ্যমে মৃতপ্রায় অ্যালুমিনিয়ামশিল্পকে রক্ষা করে মালিক-শ্রমিককে বাঁচানোর দাবি জানাচ্ছি সরকারের কাছে।

আলী আজম ভূইয়া

মুরাদপুর, পাঁচলাইশ, চট্টগ্রাম।



মন্তব্য