kalerkantho


ঈদ যাত্রায় বিড়ম্বনা লাঘবের পন্থা

১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ঈদ যাত্রায় বিড়ম্বনা লাঘবের পন্থা

বাঙালি বরাবরই উৎসবমুখী। প্রাচীনকাল থেকেই আমরা এ প্রবণতা ধরে রেখেছি। সে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান—যে ধর্মেরই হোক না কেন, কিছু উৎসব বা পালা-পার্বণ সর্বজনীন বাঙালির। কিছু ধর্মভিত্তিক। অখণ্ড ভারতে পাঁচ বছর বাদে ১৯৪৭ সালে আগস্ট পর্যন্ত কলকাতা ছিল সমগ্র ভারত ও পরে (১৯১১ সালের পরে) অখণ্ড বাংলার রাজধানী। তখন ঈদে, দুর্গাপূজা ও বড়দিনে বাঙালিরা বিপুলসংখ্যায় কলকাতা থেকে নিজ গ্রামে এসে গ্রামগুলোকে আলোকিত ও মুখরিত করে রাখত ছুটির দিনগুলোতে। গোপালগঞ্জ শহরের কাছে একটি অতি ধনী হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রাম ছিল। সেখানে ৩০০-এর অধিক এক থেকে তিনতলা পাকা বাড়ি ছিল, যা এখনো আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। সে বাড়িগুলো ছিল হিন্দু জমিদার, উকিল, জজ, ব্যবসায়ীদের দুর্গাপূজায় তাঁরা কলকাতা থেকে স্টিমার রিজার্ভ করে আসতেন। ডে-লাইট জ্বালিয়ে যাত্রা, পালাগান, নাটক ইত্যাদি করে জীবন্ত করে রাখতেন গ্রামটিকে। স্থানীয় সব সম্প্রদায়ের লোক সে পূজা বা উৎসবে যোগ দিত। ১৯৪৭ সালের পর কলকাতার বাবুরা আর আসেন না।

এখন আসেন ঢাকা ও অন্য শহরের সাহেব ও মেমরা এবং সব শ্রেণি ও বয়সের নারী-পুরুষ। প্রবাসীরাও আসেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। তখন ঢাকা নগর হয়ে পড়ে প্রায় মানবশূন্য। সবাই ছোটে নাড়ির টানে, শিকড়ের টানে এবং সহস্র-লাখো ঝুঁকি ও কষ্ট এমনকি জীবনের বিনিময়েও। পবিত্র ঈদুল ফিতর আসন্ন গৃহমুখী মানুষের মনে শুরু হয়েছে উত্তেজনা। আনন্দ ও ভীতির গৃহযাত্রা কেমন হবে? সপরিবারে যারা যাবে তাদের আতঙ্ক সীমাহীন। ভাগ্যবান যারা ট্রেন, বাস, বিমান ও জলযানের টিকিট পেয়েছে, তাঁদেরও আতঙ্ক ভিড়ে ও জামে ট্রেন ও জলযানে সময়মতো উঠতে পারবে কি না। প্রারম্ভিক স্টেশন ছাড়া যারা বিমানবন্দর বা মাঝপথে উঠবে ট্রেনে, তাদের কথা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে। আর সড়কগুলোর অবস্থা ভাবলে আর কিছু বলতে ইচ্ছা করছে না। একবার সড়ক উন্নয়ন শুরু হলে শেষ হতে চায় না। খরচ রি-শিডিউল হয় সংশ্লিষ্টদের ‘বারো মাসের’ ঈদের ব্যবস্থা এটা; অন্যদিকে নাগরিকদের প্রাণ যায়।

প্রতিবছর ঈদে ঘরমুখো মানুষের মধ্যে ৫০-৬০ জন পথিমধ্যে লাশে রূপান্তরিত হয়, যার অধিকাংশই দরিদ্র শ্রেণির। তার পরও মানুষ বাড়ি যায় এক অলৌকিক আনন্দের আশায়। মানুষ যাবে, অবর্ণনীয় কষ্ট হলেও সেই কষ্ট কিছুটা লাঘবের চেষ্টা করা যায়। (১) সংস্কারাধীন সব সড়ক/পুল খুলে দিতে হবে, (২) নির্মাণাধীন সড়কগুলো জরুরিভাবে চলাচলের উপযুক্ত করতে হবে, (৩) ত্রুটিযুক্ত বা প্রকৃত ফিটনেসহীন যান মহাসড়কে চলতে দেওয়া যাবে না, (৪) হঠাৎ অচল যানের জরুরি মেরামতের জন্য ভ্রাম্যমাণ কারখানা চালু করতে হবে, (৫) সর্বাধিকসংখ্যক ‘রিকভারি ভ্যান’ বিভিন্ন স্থানে; বিশেষ করে পুলের মুখে রাখতে হবে, (৬) সেনা-রিকভারি ভ্যান ও নিয়োগ বাড়াতে হবে হঠাৎ অচল হওয়া যান সরানোর জন্য, (৭) মাঝপথে আটকা পড়া যানের যাত্রীদের চিকিৎসা ও পানীয় ইত্যাদি সরবরাহের ব্যবস্থা রাখতে হবে, (৮) পথে অবহেলার কারণে অচল যানের মালিককে বড় অঙ্কের জরিমানা করতে হবে, (৯) সদরঘাটে বড় লঞ্চে ওঠা যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য জেলা প্রশাসন, সেনা, নৌ-ইউনিট তাদের ছোট জলযান দিয়ে সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে, (১০) অধিক জ্যাম আশঙ্কিত এলাকায় হাইওয়ে পুলিশকে সহায়তার জন্য সেনা মোতায়েনের ব্যবস্থা করতে হবে, (১১) সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের অর্ধেকেরও অধিক ঈদের ছুটিতে আসা-যাওয়া করে। অনেকে সপরিবারে সে সংখ্যা আনুমানিক লক্ষাধিক; এরাও পাবলিক পরিবহনে যায়। এ সংখ্যা বেসামরিক সংখ্যার সঙ্গে যোগ হয়। এর একটা অংশকে বিকল্প ব্যবস্থা করা গেলে বেসামরিক যাত্রীদের চাপ কিছুটা লাঘব হয়। এটা এভাবে করা যেতে পারে। (ক) গ্যারিসন ওয়ারি ছুটিতে গমেচ্ছুকে সামরিক যানে পরিবহনের ব্যবস্থা করা, (খ) একক সৈনিকদের সামরিক স্ট্রোকে পরিবার থাকলে সামরিক বাস বা কোস্টার, (গ) অফিসারদের সামরিক বাস, মাইক্রোবাস কোস্টার পরিবহন করা যায়, (ঘ) কনভয় করে যানগুলো চলবে, (ঙ) পথে গ্যারিসনগুলো সহায়তা দেবে, (চ) পরিবহন ব্যয় ও যানের ক্ষয়ক্ষতির জন্য কস্টপ্রাইজ ভাড়া আদায় করা যেতে পারে। এতে ৫০ হাজার যাত্রীও পরিবহন করা গেলে সবারই মঙ্গল হবে। সেনা সদরের ডিএমও একটি সমন্বয় করতে পারে।ঘরমুখো যাত্রীদের নিরাপদ ভ্রমণ একটি জাতীয় জরুরি দায়িত্ব। হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ, সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন, ফায়ার সার্ভিস—সবাইকে সমন্বিতভাবে এ দায়িত্বে নিয়োজিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে এটি একটি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি।

মো. নুরুল আনোয়ার

ঢাকা।



মন্তব্য