kalerkantho

হিমালয় অঞ্চলে অপরিকল্পিত নগরায়ণ

তীব্র পানি সংকটের আশঙ্কা বাংলাদেশে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তীব্র পানি সংকটের আশঙ্কা বাংলাদেশে

হিমালয়ের পাদদেশে গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। ছবি : সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে ক্রমেই বাড়ছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। আর এর ফলে এই অঞ্চলে তীব্র পানি সংকটের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। হিমালয়কেন্দ্রিক যে আটটি দেশের ওপর অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রভাব পড়বে, বাংলাদেশ তার অন্যতম। ওই প্রতিবেদনে এই সংকট নিরসনে পার্বত্য এলাকায় নগরায়ণের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুপারিশও করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে হিমালয়ের নগরায়ণ বৃদ্ধির নেপথ্য কারণ হিসেবে পর্যটন ও তীর্থযাত্রাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ বেড়ে যাওয়ায় ঝরনা ও নদীনির্ভর পানি ব্যবস্থাপনার প্রতি নির্ভরতাও বেড়েছে। কিন্তু এই দুই উৎস চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহে সক্ষম নয়। ফলে ভূগর্ভস্থ উেসর ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা তীব্র পানি সংকটের কারণ হতে পারে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর অঞ্চল হিমালয়ের এই দ্রুততর অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কোটি কোটি মানুষ গভীর পানি সংকটে পড়বে।

পুরো হিমালয় অঞ্চল ছড়িয়ে আছে ৪২ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে, যা আটটি দেশের মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশগুলো  হলো, আফগানিস্তান, ভুটান, চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও পাকিস্তান। পর্বত অঞ্চলে সংস্থান হয় প্রায় ২৪ কোটি মানুষের জীবিকা। অঞ্চলটিতে রয়েছে ১০টি বড় নদীর উৎপত্তিস্থল এবং বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃত ৩৬টি প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ স্থান। ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্ট’ তাদের এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি জানায়, হিমালয় পর্বত অঞ্চল প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকায় ভূমিকা রাখে। এই অঞ্চল থেকে পাওয়া পানি ব্যবহৃত হয় খাদ্য ও বিদ্যুৎ উত্পাদনে। নিশ্চিত হয় বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য।

‘আরবানাইজেশন অ্যান্ড ওয়াটার ইনসিকিউরিটি ইন দ্য হিন্দু কুশ হিমালয়া : ইনসাইটস ফ্রম বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, নেপাল অ্যান্ড পাকিস্তান’ শিরোনামে ‘ওয়াটার পলিসি’ সাময়িকীর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, অপরিকল্পিত নগরায়ণ বেড়ে যাওয়ায় ওই অঞ্চলে মারাত্মকভাবে

বেড়েছে জনসংখ্যা। এ কারণে সেখানকার পানির উৎসগুলোর অতিব্যবহার ঘটছে, যা বাসিন্দাদের ক্রমেই ঠেলে দিচ্ছে এক হতাশাজনক পরিস্থিতির দিকে। গবেষক শ্রেয়সী সিং (নেপাল), এস এম তানভীর হাসান (বাংলাদেশ), মাসুমা হাসান (পাকিস্তান) ও নেহা ভারতীর (ভারত) তাঁদের যৌথ গবেষণায় বলেছেন, ‘ভঙ্গুর ভূ-প্রকৃতির পার্বত্য অঞ্চলে এলোমেলোভাবে গড়ে ওঠায় নগর কেন্দ্রগুলো পানির সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।’ হিমালয় পর্বত অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পার্বত্য নগর কেন্দ্রগুলো ‘তাদের পৌর এলাকায় অবস্থিত পানির উৎসগুলো থেকে চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।’ প্রতিবেদনটিতে সংকট প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, পর্বতে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ভূ-গর্ভে থাকা পানির ওপর নির্ভরতা ক্রমাগত বাড়ছে। এরই মধ্যে সেখানে দূরবর্তী উৎসগুলো থেকে পানি সংগ্রহের বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ নিকটবর্তী পানির উৎসগুলো বাড়তে থাকা চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পানি সরবরাহ করতে পারছে না।

বাংলাদেশের বান্দরবান, ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর, সিমলা, হরিদুয়ার, হৃষিকেশ, দার্জিলিং ও দেশটির উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের রাজ্যগুলো, নেপালের বেশির ভাগ অঞ্চল এবং পাকিস্তানের হিমালয় পর্বত অঞ্চল হিমালয়কেন্দ্রিক বড় পর্যটন  কেন্দ্রগুলোর অন্যতম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝরনা কিংবা গভীর বা অগভীর কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করাটাই এখন পর্যন্ত পানির চাহিদা পূরণের উপায় হিসেবে গণ্য হচ্ছে। যদি যথাযথ পরিমাণে ও যথাযথভাবে পরিকল্পিত পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা তৈরি করা না যায় তাহলে ভূ-গর্ভের পানির ওপর এই অত্যধিক নির্ভরতা ভবিষ্যতে আরো খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করবে।

ওই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশের গবেষক তানভীর হাসান। তিনি পরিবেশ-প্রতিবেশসংক্রান্ত ওয়েবসাইট মোঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে বলেছেন, ‘কেবল জলবায়ু পরিবর্তন হিমালয় অঞ্চলের পানি সংকটের কারণ নয়, অনিয়ন্ত্রিত এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণও এর জন্য দায়ী। এর কারণে পার্বত্য অঞ্চলে পানির সংকটের পাশাপাশি দূষণ ও মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।’ তিনি সংকট সমাধানে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত কৌশল প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘তা না হলে পুরো অঞ্চলটি এবং এখানে বসবাস করা কোটি কোটি মানুষ চরম সংকটে পড়বে।’

ওই প্রতিবেদনে পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তুসংস্থান ও বনাঞ্চলে ঘেরা ওপরের দিককার পানি সরবরাহকারী অঞ্চলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পার্বত্য নগর কেন্দ্রগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশি গবেষক তানভীর হাসানও মোঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে বলেছেন, ‘উন্নত পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য আগে বাংলাদেশ, ভারত  ও পাকিস্তানে পর্বতের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নগর কেন্দ্রের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যা নেপাল করেছে।’ সূত্র : মোঙ্গাবে।

মন্তব্য