kalerkantho

মিয়ানমারকে জাতিসংঘের আহ্বান

রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করুন

মেহেদী হাসান   

২১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করুন

ফাইল ছবি

রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রধান মিশেল ব্লাশেলেট। জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৪০তম অধিবেশনে গতকাল বুধবার রাতে উপস্থাপন করা ‘মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে তিনি এই আহ্বান জানিয়েছেন।

মিশেল ব্লাশেলেট বলেন, ২০১২ সাল থেকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ তাদের দেশে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে আটটি তদন্ত কমিটি বা কমিশন গঠন করেছে। ওই আটটি কমিটি বা কমিশনই নিরাপত্তা বাহিনীকে দায়মুক্তি দিয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এই দায়মুক্তি সংস্কৃতির অবসানে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে উদ্যোগ না নিলে দেশটিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ হবে না।

নাগরিকত্ব, জনজীবনে অংশগ্রহণ, মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি—এই পাঁচটি বিষয় মাথায় রেখে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন বলে জানান মিশেল ব্লাশেলেট। তিনি বলেন, মিয়ানমার আনান কমিশনের কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেও সুপারিশের মূল উদ্দেশ্যগুলো কার্যকর করতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তিনি মিয়ানমার সরকারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতা পূরণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নেই। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনেরও পরিবেশ মিয়ানমারে নেই।

‘প্রাথমিক ও বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে’ মিশেল ব্লাশেলেট বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি বড় উদ্বেগের কারণ। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী মিয়ানমারের নেওয়া উদ্যোগগুলো রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও উৎসাহিত করতে যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, মিয়ানমার ইতিবাচক কিছু উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললেও রোহিঙ্গাদের প্রতি তাদের বৈষম্যমূলক নীতি অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে যে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রধান রোহিঙ্গা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে মিয়ানমারের সরকারের জন্য ১২ দফা সুপারিশ করেছেন। সুপারিশগুলোর প্রথমেই রয়েছে রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত সব রোহিঙ্গা এবং মিয়ানমারের অন্যান্য সংখ্যালঘু ধর্মীয় ও নৃগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার অধিকার, সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো চিহ্নিত ও বিচার করা এবং ফল প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে রাখাইনে অবাধ প্রবেশাধিকার দিতেও তিনি আহ্বান জানিয়েছেন।

মিশেল ব্লাশেলেট রোহিঙ্গাদের মৌলিক সেবাগুলো পেতে ‘জাতীয়তা যাচাইকরণ কার্ড’ থাকার আবশ্যিকতা বাতিল করতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করার উদ্যোগ গ্রহণ এবং ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের আহ্বান জানান। এ ছাড়া তিনি রোহিঙ্গাদের জন্য আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা দূর করার আহ্বান জানান। 

আলোচনা পর্বে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পক্ষে পাকিস্তান বলেছে, এটি দুঃখজনক যে চুক্তির পরও একজন রোহিঙ্গা নিজ দেশে ফিরে যায়নি। তবে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, বিশ্বের দৃষ্টি শুধু রাখাইন রাজ্যের ‘নেতিবাচক ঘটনার’ দিকে! রোহিঙ্গাদের নাম না নিয়ে তিনি দাবি করেন, এই সমস্যার পেছনে ঔপনিবেশিক আমলের অভিবাসন, অর্থনীতির মতো বিষয় রয়েছে। রাখাইনের ইতিহাস না জেনে পক্ষপাতদুষ্ট বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। একপেশে অভিযোগের ভিত্তিতে জাতিসংঘের এ ধরনের প্রতিবেদনকে মিয়ানমার স্বাগত জানায় না। প্রতিবেদনে মিয়ানমারের নেওয়া ইতিবাচক উদ্যোগ ও অগ্রগতি প্রতিফলিত হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

‘মিয়ানমারে ফিরতে অধীর অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের’ প্রত্যাবাসন দ্রুত শুরু করতে আগামী মাসে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে বসার পরিকল্পনার কথাও জানান মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম শামীম আহসান বলেন, মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট যে মিয়ানমার অনেক অঙ্গীকার করলেও রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেনি। একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি হয়নি। বরং এখনো রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে তাড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, নাগরিকত্বহীনতাই এই সংকটের মূল কারণ। আবার রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে উৎসাহিত করতে তাদের ওপর নিপীড়নের বিচার হওয়া অপরিহার্য।

মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের প্রতিবেদনকে দলিল হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাঠানোর অনুরোধ জানান তিনি।

 

মন্তব্য