kalerkantho


মানবাধিকার পরিষদে ইইউয়ের ২৭ দফা খসড়া প্রস্তাব

রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিচারে দ্রুত কাজ শুরুর তাগিদ

মেহেদী হাসান   

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০



রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিচারে দ্রুত কাজ শুরুর তাগিদ

রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের জন্য দায়ীদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক কাঠামো যত দ্রুত সম্ভব কার্যকর করার আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করেছে ইউরোপের ২৮টি দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। খসড়া প্রস্তাবে এ দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘকে মিয়ানমার সরকারের সহযোগিতা করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ইইউয়ের পক্ষে রুমানিয়া গত বৃহস্পতিবার প্রস্তাবের খসড়াটি মানবাধিকার কমিশনের সদস্য দেশগুলোকে অবহিত করেছে। আগামী শুক্রবার মানবাধিকার কমিশনের চলতি অধিবেশন শেষ হওয়ার আগেই প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন এবং এ বিষয়ে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, অতীতের মতো এবারও মিয়ানমার ও তার বন্ধু হিসেবে পরিচিত কিছু দেশ প্রস্তাবটির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মানবাধিকার পরিষদে কারো ‘ভেটো’ ক্ষমতা না থাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এটি মিয়ানমারের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে।

জানা গেছে, মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে ইইউয়ের ২৭ দফা প্রস্তাবের শুরুতেই রাখাইন, কাচিন ও শান রাজ্যসহ পুরো দেশেই যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, শিশুদের অধিকার লঙ্ঘনসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অব্যাহত খবরে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এসব সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর লঙ্ঘনে মিয়ানমারের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করে অবিলম্বে তা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। উদ্বেগ জানানো হয়েছে রাখাইনে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আরাকান আর্মির লড়াই নিয়েও।

খসড়া প্রস্তাবে মিয়ানমার সরকারকে তাদের দেশের সবার মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান স্থান পেয়েছে। প্রস্তাবটির চতুর্থ দফায় ভবিষ্যতে কোনো জাতীয়, আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক আদালতে কিংবা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর ‘গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ বিচারের জন্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণে গঠিত কাঠামোর কাজ দ্রুত শুরু করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমার সরকারকে সত্যানুসন্ধানী কমিশন, স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার এবং জাতিসংঘ কাঠামোকে পূর্ণ প্রবেশাধিকার ও সহযোগিতা দেওয়ার আহ্বান রয়েছে খসড়া প্রস্তাবে।

জানা গেছে, মিয়ানমারের রাখাইনসহ বিভিন্ন রাজ্যে মানবিক সহায়তা দেওয়া সংস্থাগুলোর ওপর বর্ধিত বিধিনিষেধের ব্যাপারে উদ্বেগ জানানো হয়েছে খসড়া

প্রস্তাবে। এ ছাড়া সেখানে কূটনৈতিক কোর, স্বাধীন পর্যবেক্ষক এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোকে পূর্ণ প্রবেশাধিকার দিতেও মিয়ানমার সরকারকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, সম্মানজনক, টেকসই ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হওয়ার ওপর জোর দিয়ে ওই প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারকেও যুক্ত করার আহ্বান খসড়া প্রস্তাবে স্থান পেয়েছে।

মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের তথ্যদাতাদের সুরক্ষা দিতেও আহ্বান স্থান পেয়েছে। রয়টার্সের দুই সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতেও খসড়া প্রস্তাবে আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমারে বসবাসরত সব লোকের মানবাধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করতেও মিয়ানমার সরকারকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

মিয়ানমারে সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা মোকাবেলায় জাতিসংঘের সঙ্গে যৌথ ইশতেহারকে স্বাগত জানানো হয়েছে। রাখাইন রাজ্যে সংকটের মূল কারণগুলো বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে সমাধানে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান খসড়া প্রস্তাবে স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া ‘রোহিঙ্গা শরণার্থী’ ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

খসড়া প্রস্তাবে মিয়ানমার সরকারকে তাদের দেশের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া আনান কমিশনের সুপারিশগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়নেরও তাগিদ রয়েছে প্রস্তাবে। রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইন নিয়েও খসড়া প্রস্তাবটিতে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।

 



মন্তব্য