kalerkantho

নকল ফ্রিজ-এসিতে আগুনের ঝুঁকি

মাসুদ রুমী   

৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নকল ফ্রিজ-এসিতে আগুনের ঝুঁকি

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসি-ফ্রিজ বিস্ফোরণে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। নকল ও নিম্নমানের এসি-ফ্রিজ ব্যবহারে কম্প্রেসর বিস্ফোরণের ঝুঁকি বেশি। এ ছাড়া বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, এসির আউটডোর ইউনিট ও ভবনের ছাদে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা না থাকা এবং ত্রুটিপূর্ণ ইনস্টলেশনকেও এসি বিস্ফোরণের জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ জন্য ত্রুটিমুক্ত ইনস্টলেশন, সঠিকভাবে নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের তদারকির মধ্যে নিয়ে আসা, সার্টিফিকেশন/রেটিংয়ের ব্যবস্থা করাসহ দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফ্রিজ-এসির মেয়াদ দেখার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম থেকে ১০ কোটি টাকার এক হাজার ১০০টি নকল এয়ারকন্ডিশনার আটক করে। সেগুলোয় নামি ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। বিদেশ থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এসির যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়। মূলত এসব নিম্নমানের, নকল এসিতেই বিস্ফোরণ হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইলেকট্রনিক পণ্যে কেমিক্যাল ব্যবহারের নীতিমালা থাকা উচিত। এ ছাড়া সরকারি একটি সংস্থার মাধ্যমে সার্টিফিকেশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ১০ বছরে বাংলাদেশে ফ্রিজ, এসিসহ ইলেকট্রনিক পণ্য ব্যবহার ব্যাপক হারে শুরু হয়েছে। আমাদের এসব বিকাশমান শিল্প দেখভাল করার কোনো সুনির্দিষ্ট সংস্থা নেই। উন্নয়ন হলেই ঝুঁকিও বাড়বে। তাই ঝুঁকি কমানো ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও থাকতে হবে।’

ওয়ালটন সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের অতিরিক্ত পরিচালক এবং হেড অব সার্ভিস মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক সময় কম্প্রেসরের ভেতরে জ্যাম লেগে থাকে, গ্যাস লিক হয়ে যায়। সময়মতো সার্ভিসিং না করালে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এ ছাড়া ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না করার কারণেও এসি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বৈদ্যুতিক হাই ভোল্টেজের কারণেও এসব ঘটনা ঘটে। হাই ভোল্টেজের কারণে ইলেকট্রিক মেশিনের ওপর চাপ সৃষ্টি হলেই সেখানে সমস্যা হয়।’ এজন্য প্রতিটি ভবনে সার্কিট ব্রেকার, ভালো মানের আর্থিং লাইন নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন তিনি।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডিজিটাল ডিভাইসের মান নিয়ন্ত্রণে আমরা বাধ্যতামূলকভাবে দেখছি প্রত্যেকের টেস্টিং ল্যাব আছে কি না। টেস্টিং ল্যাব না থাকলে আমরা  লাইসেন্সই দিচ্ছি না। দেশে আসা সব ডিভাইসের যাতে নিবন্ধন করা যায় এবং অবৈধ উপায়ে মানহীন কিংবা নকল পণ্য যাতে না আসতে পারে সে ক্ষেত্রে আমরা বিশেষ নজর দিচ্ছি।’

এসি ব্যবহারে সতর্কতা : এসির প্রেসার বেড়ে গেলে কম্প্রেসর বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। অনেক সময় বার্নেবল গ্যাসের কারণেও ঘটতে পারে এসি বিস্ফোরণের ঘটনা। নিয়ম করে ভালো মানের টেকনিশিয়ান দিয়ে এসির সার্ভিসিং করানো প্রয়োজন। রক্ষণাবেক্ষণ না করলে অনেক সময় সংযোগস্থলে ধুলাবালি জমে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, এসি একনাগাড়ে আট ঘণ্টার বেশি চালানো উচিত নয়। চালালে কম্প্রেসরে চাপ পড়ে। তাই নিয়মিত বিরতিতে এসি চালানো উচিত। আউটডোর ইউনিট ও আউটডোর বিল্ডিংয়ের মধ্যে যথেষ্ট ফাঁকা স্থান রাখা উচিত, যেন কম্প্রেসরে বাধাহীনভাবে বাতাস চলাচল করতে পারে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে বছরে অন্তত দুইবার সার্ভিসিং করানো উচিত। বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াও এসি বিস্ফোরণের একটি কারণ। ভবনগুলোর ছাদে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা রাখলে এ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। ভালো ব্র্যান্ডের এসির আউটডোর ইউনিটে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা থাকে বলে জানান তিনি।

মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, বৈদ্যুতিক হাই ভোল্টেজের কারণেও অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। এসির প্রেসার বেড়ে গেলেও কম্প্রেসর বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। বিদেশ থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এসির মানহীন যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়। এসব মানহীন যন্ত্রাংশই শহরের বিভিন্ন অনুমোদনহীন কারখানায় দামি ব্র্যান্ডের নাম লাগিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই এসব বিষয়ে গ্রাহকদের আরো সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

ফ্রিজ ব্যবহারে সতর্কতা : ভোল্টেজ ওঠানামা করলে রেফ্রিজারেটর নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ফ্রিজের নিরাপত্তায় স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার করা উচিত বলে মনে করেন মুজাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, বারবার রেফ্রিজারেটরের দরজা খোলা উচিত নয়। তা ছাড়া বেশি সময়ের জন্য দরজা খুলে রাখলেও ক্ষতি হতে পারে। বাসা পরিবর্তনের সময় রেফ্রিজারেটর ওপর-নিচে ওঠানো-নামানো করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ফ্রিজ নাড়াচাড়া করার তিন থেকে চার ঘণ্টা আগে বন্ধ করতে হবে। কারণ রেফ্রিজারেটর নাড়াচাড়া করলে কম্প্রেসরের গ্যাস ওপরে উঠে যায়।

বেস্ট ইলেকট্রনিকসের পরিচালক ও দ্রুত সার্ভিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ তাহমিদ জামান বলেন, ‘রেফ্রিজারেটরের কম্প্রেসরের মধ্যে রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস থাকে। এখন বাংলাদেশে প্রায় সবাই শুল্ক সুবিধার কারণে কম্প্রেসর ভ্যাকুয়াম করে এনে দেশে গ্যাস চার্জ করছে। গ্যাস চার্জ করার সময় যদি কম্প্রেসরের মধ্যে ছোট একটি ময়লাও থাকে তাহলে তা ঝুঁকি তৈরি করে। এই ভ্যাকুয়াম যদি ঠিক না হয় তাহলে বিস্ফোরণের ঝুঁকি থাকে। নিখুঁত ভ্যাকুয়ামের জন্য বিদেশি হাই কোয়ালিটির মেশিন প্রয়োজন, যেটা অনেকেই ব্যবহার না করে দেশীয় কায়দায় তা ভ্যাকুয়াম করে। এ ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের স্ট্যান্ডার্ড থাকা উচিত, যাতে তারা বিভিন্ন টেস্টিং মেশিনে নিশ্চিত করবে সব ঠিক আছে কি না।’

আহত, নিহত বাড়ছে : ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিট সূত্র মতে, গত দেড় বছরে এসি বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে আসা রোগীর সংখ্যা ২৫ থেকে ২৭ জনের মতো। এর ভেতরে মারা গেছে ৯ জন। হবিগঞ্জ শহরের পুরান মুন্সেফি এলাকায় প্রাইম ফুডের এসির কম্প্রেসর বিস্ফোরিত হয়ে ভবনের পেছনের দেয়াল ধসে গত ৭ জানুয়ারি ঝন্টু দাস (৩০) নামের এক কর্মচারী আহত হন। মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায় ফ্রিজের গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় মা ও মেয়ের মৃত্যু হয়েছে।

মন্তব্য