kalerkantho

আইন আদেশ মেয়র আনিছের জন্য নয়!

আশরাফ-উল-আলম   

২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আইন আদেশ মেয়র আনিছের জন্য নয়!

অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা চারটি মামলায়ই গাজীপুর জেলার শ্রীপুর পৌরসভার মেয়র আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়ে আছে। আবার তাঁর পরিবর্তে অন্য একজন আদালতে আত্মসমর্পণ করায় দায়ের করা প্রতারণা মামলায়ও মেয়র আনিছ আসামি। পাঁচটি মামলায় আসামি হয়েও তিনি বহাল তবিয়তে আছেন। শ্রীপুর পৌরসভার মেয়র হিসেবে নিয়মিত অফিসও করছেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার আইনেরও কোনো প্রয়োগ নেই, যেখানে বলা হয়েছে, কোনো মেয়র বা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র গৃহীত হলে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারবে। বর্তমান সরকারের আমলে অনেক জনপ্রতিনিধিকে এ কারণে সাময়িক বরখাস্ত করার নজির থাকলেও মেয়র আনিছ রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

২০১০ সালের বিভিন্ন সময়ে শ্রীপুর পৌরসভার বিভিন্ন হাট-বাজার ইজারা দেওয়া ৬০ লাখেরও বেশি টাকা পরস্পর যোগসাজশে মেয়র আনিছুর রহমান ও পৌরসভার সাবেক হিসাবরক্ষক আবদুল মান্নান আত্মসাৎ করেন অভিযোগে ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে দুদক ওই চারটি মামলা করে। দুদকের উপসহকারী পরিচালক ফখরুল ইসলামের করা এসব মামলায় চার্জশিট হওয়ার পর মামলাগুলো ২০১৭ সালে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। এই আদালতে আনিছুরের বিরুদ্ধে অভিযোগও গঠিত হয়।

এর আগে আদালতে হাজির না হওয়ায় আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন তিনি পলাতক থাকেন মামলাগুলোয়। গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর মেয়র আনিছ ইন্দোনেশিয়া যান। অন্যদিকে ৯ সেপ্টেম্বর তাঁর পরিবর্তে মো. নুরে আলম নামের একজন ঢাকার এই আদালতে আত্মসমর্পণ করেন চারটি মামলায়। আদালত একটি মামলায় জামিন দেন। তবে তিনটি মামলায় তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

‘মেয়র আনিছ কারাগারে’—এ খবর গণমাধ্যমে এলে জানাজানি হয় বাস্তবে তিনি বিদেশে গেছেন। তাঁর পরিবর্তে অন্য কেউ আত্মসমর্পণ করেছেন। পরদিন এই চার মামলার একটি ধার্য তারিখ ছিল। ভুয়া মেয়রকে আদালতে হাজির করা হলে ওই আদালতের বিশেষ পিপি রুহুল ইসলাম খান আদালতে একটি দরখাস্ত দাখিল করে বলেন, ‘কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ব্যক্তি মেয়র আনিছুর রহমান নন। তিনি অন্য ব্যক্তি। তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’ বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক মিজানুর রহমান খানের প্রশ্নের জবাবে আসামি বলেন, তাঁর নাম মো. নুরে আলম। তিনি শ্রীপুর উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের তফিল উদ্দিনের ছেলে। তিনি শ্রীপুর পৌরসভার মেয়র আনিছ নন। এ মামলার আসামিও নন।

নুরে আলম আরো বলেন, ‘আমি মেয়র আনিছ পরিচয় ধারণ করে চারটি মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন চেয়েছিলাম। আমি ভুল স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।’

আদালত আদেশে বলেন, মেয়র আনিছুর রহমানের পরিচয়ে নুরে আলমের আদালতে আত্মসমর্পণ করা প্রতারণার শামিল। তাঁর এই প্রতারণা ক্ষমার অযোগ্য। আদালত নুরে আলম ও আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কোতোয়ালি থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।

কোতোয়ালি থানা ওই নির্দেশ পাওয়ার পর এসআই অখিল চন্দ্র সরকার গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর দুজনের বিরুদ্ধে মামলা (নম্বর ৫৮) রুজু করেন। তদন্ত কর্মকর্তা ওই দিনই মেয়র নুরে আলমকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখান। মামলার ধারা জামিনযোগ্য বিধায় গত বছরের ১৫ অক্টোবর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জামিন পান নুরে আলম। তবে মেয়র আনিছকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। তিনি আদালতে আত্মসমর্পণও করেননি।

দুর্নীতির চার মামলায় মেয়র আনিছের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়ে থাকার বিষয়টি গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপারকেও জানান ঢাকার আদালত। শ্রীপুর থানার ওসিকেও বিষয়টি জানানো হয়। ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের দুর্নীতি মামলার নথি থেকে দেখা যায়, নুরে আলমের প্রতারণা ও মামলায় মেয়র আনিছের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকার বিষয়টি সম্পর্কে আদালতের আদেশের কপি গত ১২ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের পুলিশ সুপার ও শ্রীপুর মডেল থানার ওসিকে দেওয়া হয়েছে (পত্রের স্মারক নম্বর ৯৮২(৪)৩ তারিখ : ১২-০৯-১৮)।

বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) রুহুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে জানান, মেয়র আনিছের বিরুদ্ধে মামলার বিচার চলছে। তাঁর পরিবর্তে অন্য একজন আত্মসমর্পণ করলে বিষয়টি নিয়ে একটি প্রতারণার মামলাও হয়েছে। এর পরও দুর্নীতির চার মামলায় মেয়র আনিছ আত্মসমর্পণ করেননি।

ওই আদালতের বেঞ্চ সহকারী রফিকুল ইসলাম বলেন, মেয়র আনিছ এখনো আত্মসমর্পণ করেননি। আদালতের সঙ্গে প্রতারণার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার ও শ্রীপুর থানার ওসিকে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

ঢাকার আদালতে ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী সিনিয়র আইনজীবী সৈয়দ আহমেদ গাজী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠাবে—এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। যাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে তাঁকে গ্রেপ্তার না করার অর্থই হচ্ছে পুলিশ কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘পুলিশের সুনজরে থাকলে অনেক সময় পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার হয় না। আনিছুর রহমান যেহেতু মেয়র, তাঁর প্রতি সুনজর থাকতেই পারে।’

মেয়র আনিছকে কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না জানতে চাইলে গাজীপুরের পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি কালের কণ্ঠকে বলেন, মেয়র আনিছের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে কি না, তা তিনি জানেন না। তবে আদালত থেকে চিঠি দিয়ে মেয়র আনিছের প্রতারণা সম্পর্কে জানানো হয়েছে, চিঠির স্মারক নম্বরও জানানো হয়েছে। পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার এরপর শ্রীপুর থানার ওসির বরাত দিয়ে বলেন, ‘ওসি সাহেব জানিয়েছেন, মেয়র আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে যেসব মামলা আছে, সেসব মামলায় তিনি জামিনে আছেন।’

পুলিশ সুপারের ওই বক্তব্যের পর দিন সোমবার ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে মেয়র আনিছ চারটি মামলার একটিতেও জামিন নেননি। তাঁর অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ চলছে। আদালতের বেঞ্চ সহকারী রফিকুল ইসলাম নিশ্চিত করে বলেন, ‘প্রকৃত আসামি মেয়র আনিছুর রহমান মামলাগুলোয় পলাতক রয়েছেন। তিনি জামিন নেননি।’

আইনে আছে চার্জশিট হলেই সাময়িক বরখাস্ত : ২০০৯ সালের স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের ১২(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়র বা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় চার্জশিট বা অভিযোগপত্র গৃহীত হলে সরকার লিখিত আদেশের মাধ্যমে ওই মেয়র বা কাউন্সিলরকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারবে। স্থানীয় সরকারের অন্যান্য স্তর; যেমন—ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভার ক্ষেত্রেও আইনে একই রকম বিধান রাখা হয়েছে। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইনের ৩৪(১) ধারা, স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) আইনের ১৩খ(১) ধারা এবং স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইনের ৩১(১) ধারায়ও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় আদালতে চার্জশিট গৃহীত হলে বা আদালত কোনো ফৌজদারি অপরাধ আমলে নিলে সরকার লিখিত আদেশের মাধ্যমে ওই জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারবে।

বর্তমান সরকারের আমলে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত অনেক জনপ্রতিনিধি বিভিন্ন মামলায় চার্জশিটভুক্ত হওয়ায় তাঁদের একের পর এক সাময়িক বরখাস্ত করার নজির রয়েছে। কিন্তু মেয়র আনিছের ক্ষেত্রে এই আইনের প্রয়োগ নেই।

 

মন্তব্য