kalerkantho


বিজ্ঞান ও কল্পকাহিনির বেশ কাটতি

নওশাদ জামিল   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



বিজ্ঞান ও কল্পকাহিনির বেশ কাটতি

কখনো সাগরতলে, কখনো মহাকাশে চষে বেড়ায় কল্পনার চরিত্ররা। কখনো বা রোমাঞ্চকর অভিযানে নেমে পড়ে রোবট। ভিনগ্রহ থেকে আসে এলিয়েন। কল্পবিজ্ঞানে চরিত্রের যেমন শেষ নেই, শেষ নেই কল্পনার সীমা-পরিসীমারও। বিজ্ঞান আর কল্পনা মিলিয়ে বাংলাভাষী পাঠকের কাছে সায়েন্স ফিকশন কিংবা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির আধিপত্য একটা সময় পর্যন্ত ছিল না বললেই চলে। সেই অপূর্ণতা এখন আর নেই। অনুবাদ যুগ পেরিয়ে হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ বেশ কয়েকজন লেখকের হাত ধরে বর্তমানে সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য শাখায় পরিণত হয়েছে সায়েন্স ফিকশন। এবারের একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মজার বই। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সায়েন্স ফিকশনের পাঠক আগের চেয়ে বেড়েছে। গ্রন্থমেলায় এ ধরনের বইয়ের কাটতিও বেশ।

শুধু সায়েন্স ফিকশন নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক নানা বইয়ের প্রকাশনা যেমন বেড়েছে, পাঠকও বেড়েছে। এই চাহিদার কথা মাথায় রেখে লেখকরা বিজ্ঞানধর্মী বই লেখায় আলাদা গতি এনেছেন। বিজ্ঞানভিত্তিক রচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন আব্দুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন। পরে হুমায়ূন আহমেদ নতুন ধারার সায়েন্স ফিকশন লিখে পাঠকের আগ্রহ বাড়িয়েছেন। মুহম্মদ জাফর ইকবালও বিজ্ঞানবিষয়ক লেখায় আলাদা মাত্রা যোগ করেছেন।

হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল ছাড়াও সায়েন্স ফিকশন ও বিজ্ঞানভিত্তিক বই লেখায় এগিয়ে এসেছেন আরো অনেক লেখক। তাঁদের অনেকে পাঠকপ্রিয়তাও পেয়েছেন।

অনুপম প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী মিলন কান্তি নাথ বলেন, ‘আমাদের শিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক খাতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যুবসমাজ তাদের প্রয়োজনেই বিজ্ঞান, গণিতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। লেখকরা সে প্রয়োজন মেটাতে এগিয়ে আসছেন। গণিত, পদার্থবিদ্যা, জীববিজ্ঞানসহ নানা বিষয়ে অলিম্পিয়াড হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এতে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তরুণ নয়, নানা বয়সের মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে।’

পাঠকদের মধ্যে সায়েন্স ফিকশন বইয়ের আগ্রহ বাড়াতে কাজ করছে বাংলাদেশ সায়েন্স ফিকশন সোসাইটি (বিএসএফএস)। নিয়মিত তারা আয়োজন করছে সায়েন্স ফিকশন বইমেলা। এ ছাড়া পাঁচ বছর ধরে গ্রন্থমেলায় তারা একসঙ্গে মোড়ক উন্মোচন করছে সায়েন্স ফিকশন বইয়ের।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে গ্রন্থমেলায় সায়েন্স ফিকশন লেখকরা একত্রে শোভাযাত্রা ও তাঁদের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। শোভাযাত্রায় অংশ নেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল, মোস্তফা কামাল, মোশতাক আহমেদ, দীপু মাহমুদ প্রমুখ। শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া লেখকরা পরেছিলেন একই রঙের পোশাক। ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে তাঁরা যখন গ্রন্থমেলা প্রদক্ষিণ করছিলেন তখন বিপুলসংখ্যক পাঠক ও ক্রেতা তাঁদের সঙ্গে অংশ নেয়। শোভাযাত্রাটি গ্রন্থমেলা ঘুরে শিশু চত্বরের সামনে গিয়ে থামে। পরে সেখানেই তাঁরা বেশ কিছু সায়েন্স ফিকশন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন।

মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সায়েন্স ফিকশন লিখছি। প্রথম দিকে এ ধারার পাঠক কম ছিল। প্রকাশকেরও আগ্রহ কম ছিল। তখন অনেকে সায়েন্স ফিকশনকে সাহিত্যই মনে করত না। কিন্তু সেই সময় আর নেই। সায়েন্স ফিকশন বর্তমানে সাহিত্যের জনপ্রিয় একটি ধারা। কল্পবিজ্ঞানের নানা বই পাঠকদের চিন্তা ও কল্পনার রাজ্য খুলে দিচ্ছে, বিজ্ঞানমনস্ক করছে মানুষকে।’

গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত চারটি সায়েন্স ফিকশন গ্রন্থের তথ্য-পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

পলাতক তুফান : জগত্খ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর লেখা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি। বহু আগে যে বাংলা ভাষায় মৌলিক সায়েন্স ফিকশন লেখা হয়েছে, বইটি তার প্রমাণ। অনেকে তাই এ বইকে বলছে বাংলা ভাষার প্রথম সায়েন্স ফিকশন। প্রথমবারের মতো বইটি প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশনস। দাম ১০০ টাকা।

নিয়ান : মুহম্মদ জাফর ইকবালের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির বই। বইটিতে বিজ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে মনিকা ও নিয়ান নামের দুই তরুণের দুঃসাহসিক অভিযান। প্রকাশক তাম্রলিপি। দাম ২৭০ টাকা।

অপার্থিব : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মোস্তফা কামালের সায়েন্স ফিকশন গ্রন্থ। একজন মৃত মানুষ, তার মৃত্যুর ৩০ বছর পর যদি বলে, আমি আবার পৃথিবীতে আসছি এবং কয়েক ঘণ্টা থেকে চলে যাব অন্য গ্রহে, তাহলে কেমন হয়? কল্পনা ও বিজ্ঞানের অনুপম মিশেলে লেখক বইটিতে তুলে ধরেছেন মানুষের অপার্থিব এক আখ্যান। প্রকাশক পাঞ্জেরী পাবলিকেশনস। দাম ১৫০ টাকা।

গামা : কথাসাহিত্যিক মোশতাক আহমেদের সায়েন্স ফিকশন গ্রন্থ।  লেখক বইটিতে তুলে ধরেছেন গ্রিলি দ্বীপের ভয়ংকর ও দুঃসাহসিক নানা অভিযানের আখ্যান। কল্পনার আলোয় এতে উঠে এসেছে মানুষ, রোবট ও ভিনগ্রহের প্রাণীদের রোমাঞ্চকর ঘটনা। প্রকাশক অনিন্দ্য প্রকাশ। দাম ২০০ টাকা।  

গ্রন্থমেলায় শিশুদের নিয়ে নানা আয়োজন : গতকাল সকালে ছিল শিশু প্রহর। এ সময় বিপুলসংখ্যক শিশু-কিশোরের উপস্থিতি ছিল প্রাঙ্গণজুড়ে। সকালে অমর একুশের উদ্যাপনের অংশ হিসেবে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, সংগীত প্রতিযোগিতা, সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশু-কিশোরদের পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ।

শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় ‘ক’ শাখায় আনায়া জাকির হোসেন প্রথম, এস এম নাহিয়ান দ্বিতীয় এবং তাহেরুননেসা রিচি তৃতীয়; ‘খ’ শাখায় আল মুমিনুর প্রথম, অর্নিলা ভৌমিক দ্বিতীয় এবং মেহেনাজ আক্তার নাদিয়া তৃতীয়; ‘গ’ শাখায় আফরিদা ফারহানা খান প্রথম, নবনীতা হালদার দ্বিতীয় এবং নাফিসা তাবাসসুম অথৈ তৃতীয় স্থান লাভ করে।

শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতায় ‘ক’ শাখায় সুব্রানা আলী সোহা ও তানজিম বিন তাজ প্রত্যয় প্রথম, সহিষ্ণু আইচ ও সিদরাতুল মুনতাহার দ্বিতীয়, আফরা আদিলা রিমঝিম ও জাহিন জারা তাবাসসুম তৃতীয়; ‘খ’ শাখায় গার্গী ঘোষ ও তানিশা জাহান নরিকা প্রথম, মো. রেজওয়ানুল করিম তানভীর ও অধরা সরকার দ্বিতীয়, উম্মে তাসনিয়া বুশার ও মৈত্রেয়ী ঘোষ তৃতীয় স্থান লাভ করে।

শিশু-কিশোর উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় নিসার বিন সাইফুল্লাহ জাহিন প্রথম, কাশফিয়া কাওসার চৌধুরী দ্বিতীয় এবং শাঁওলী সামরিজা তৃতীয় স্থান লাভ করে।

সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতায় মুনতাজিম রহমান সায়মন প্রথম, নুসাইবা নাজমী খান ও তাইয়্যেবা দ্বিতীয় এবং শাহারিয়ার আহম্মেদ তৃতীয় স্থান লাভ করে।

মূল মঞ্চের আয়োজন : গতকাল বিকেলে মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার শতবর্ষ : ফিরে দেখা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. মাহবুবুল হক। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সাইফুদ্দীন চৌধুরী, আলী হোসেন চৌধুরী ও এম আবদুল আলীম। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী।  পরে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি কুমার চক্রবর্তী, জাহানারা পারভীন, মুস্তাফিজ শফি, মাহবুব আজীজ, তুষার কান্তি দাশ, প্রত্যয় জসীম ও আয়শা ঝর্ণা।

আজকের আয়োজন : আজ শনিবার সকালে থাকছে শিশু প্রহর।  বিকেলে গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলাদেশের প্রকাশনা : অতীত ও বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।

 

 



মন্তব্য