kalerkantho


চকবাজার ট্র্যাজেডি

আগুনে মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিচার হয় না

আশরাফ-উল-আলম   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



আগুনে মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিচার হয় না

পুরান ঢাকার চকবাজারে আগুনে নিহত ইয়াসিনের কফিনের ওপর কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর বড় বোন। ছবিটি গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে তোলা। ছবি : লুৎফর রহমান

আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর। ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে ১১৯ জন শ্রমিক পুড়ে মারা যায়। ওই ঘটনার পর আশুলিয়া থানা পুলিশ শ্রমিক নিহত হওয়ার জন্য দায়িত্বে অবহেলাকে দায়ী করে থানায় তাজরীন ফ্যাশনসের মালিকসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়। এরপর ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলাটি বিচারের জন্য স্থানান্তর হয়। ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। গত প্রায় তিন বছরে ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। এই মামলা কবে শেষ হবে তা অনিশ্চিত।

১১৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলা পরিচালনা বা এই মামলার বিচার শেষ করতে রাষ্ট্রপক্ষের আন্তরিকতা কতটুকু তা বিচারের অগ্রগতি দেখেই অনুমান করা যায়। শুধু তাজরীন ফ্যাশনস নয়, মর্মান্তিক এমন ঘটনার নজির দেশে অনেক। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত হওয়ার কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি।

২০১০ সালের ৩ জুন ঢাকার নবাব কাটারার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয় ১২৪ জন। ওই ঘটনায় কাউকে দোষী করা যায়নি। হয়তো শনাক্তই করা যায়নি ওই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির জন্য দায়ী কারা। ফলে গত ৯ বছরে কোনো নিয়মিত মামলা রুজু হয়নি। দায়ীদের বিচারেরও প্রশ্ন আসে না।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতদের পরিসংখ্যান খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তবে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গত দুই দশকে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এদের মৃত্যুর দায় আজ পর্যন্ত কারো ওপর বর্তায়নি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য মতে, গত দুই দশকে বাংলাদেশে শিল্প-কারখানায় দুর্ঘটনা ঘটেছে কমপক্ষে ২৬টি। এতে প্রাণ হারিয়েছে দুই হাজারের মতো শ্রমিক ও সাধারণ নাগরিক। শিল্প-কারখানা নির্মাণে উদ্যোক্তারা যতটা মনোযোগী, ততটাই উদাসীন এর নিরাপত্তা নিশ্চিতে। স্বল্প পুঁজিতে বেশি মুনাফা অর্জন করার প্রবণতা, আইনের তোয়াক্কা না করা, আবার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদারকির অভাব এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ।

অগ্নি নিরাপত্তাজনিত কারণেই অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। ১৯৯০ সালের ১৭ ডিসেম্বর মিরপুরের সারেকা গার্মেন্টে আগুনে পুড়ে মারা যায় ২৭ জন। ১৯৯৫ সালে রাজধানীর ইব্রাহিমপুরের লুসাকা অ্যাপারেলসে নিহত হয় ১০ গার্মেন্টকর্মী। ১৯৯৬ সালে ঢাকার তাহিদুল ফ্যাশনে ১৪ জন এবং সানটেক্স লিমিটেডের কারখানায় ১৪ জন আগুনে পুড়ে মারা যায়। ১৯৯৭ সালে ঢাকার মিরপুরের তামান্না গার্মেন্টে ২৭ জন ও মিরপুর মাজার রোডের রহমান অ্যান্ড রহমান অ্যাপারেলস কারখানায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হয় ২২ জন সেলাই শ্রমিক। ২০০০ সালের ২৫ নভেম্বর নরসিংদীর চৌধুরী নিটওয়্যার লিমিটেডে আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় ৫৩ শ্রমিক। একই বছর রাজধানীর বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ীতে গ্লোব নিটিং ফ্যাশন লিমিটেডে আগুন লেগে মারা যায় ১২ জন শ্রমিক। ২০০১ সালের ৮ আগস্ট ঢাকার মিরপুরের মিকো সোয়েটার লিমিটেডে আগুন ধরার গুজবে ভিড়ে পায়ের নিচে চাপা পড়ে নিহত হয় ২৪ গার্মেন্ট শ্রমিক। তারও এক সপ্তাহ আগে মিরপুরের কাফরুলে অগ্নিকাণ্ডে আরো ২৬ শ্রমিক প্রাণ হারায়। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে নরসিংদীর শিবপুরে গার্মেন্ট কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ৪৮ শ্রমিক নিহত হয়। ওই বছরের ৩ মে মিসকো সুপারমার্কেট কমপ্লেক্সের এক

গার্মেন্টে আগুন লাগলে মারা যায় ৯ শ্রমিক। ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল সান নিটিং নামে একটি গার্মেন্ট কারখানায় আগুনে ২০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ২০০৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের কেটিএস অ্যাপারেলস মিলে আগুন লেগে ৬৫ জন শ্রমিক পুড়ে মারা যায়।

২০১০ সালে গার্মেন্টে দুটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে গাজীপুর সদরের গরিব অ্যান্ড গরিব সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ডে মারা যায় ২১ জন শ্রমিক। একই বছরের ১৪ ডিসেম্বর আশুলিয়ায় হামীম গ্রুপের গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে আগুনে পুড়ে ৩০ শ্রমিক মারা যায়।

২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ঘটে আরো একটি বড় শিল্প দুর্ঘটনা। এটিও ঘটে টঙ্গীর ট্যাম্পাকো ফয়েলস নামে একটি প্যাকেজিং কারখানায়। বয়লার বিস্ফোরণের পর সৃষ্ট আগুনে ৪০ বছরের পুরনো ভবনটি ধসে পড়ে। এতে নিহত হয় ৩৫ জন।

ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পিপি আনোয়ারুল কবীর বাবুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। শিল্প-কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃত্যুর জন্য দায়িত্বে অবহেলাই প্রধান কারণ। কারখানা আইন, শ্রম আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইন মেনে কারখানা পরিচালনা করলে মৃত্যুহার কমানো যায়। কিন্তু তা মানে না মালিকসহ সংশ্লিষ্টরা। তাদের আইন মানতে যারা বাধ্য করবে তারা নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য দায়িত্ব পালন করে না। এ কারণে বেশি প্রাণহানি হয়। দুই-চারটি বিচার হলে সবাই সতর্ক হতো। আদালতে মামলা গড়ালেও সাক্ষী হাজির হয় না। হাজির হলে সাক্ষীদের প্রভাবিত করা হয়। এ কারণে বিচার হয় না।’

বেলার নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিমতলীর দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়েছিল। টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। তারা যে প্রতিবেদন দিয়েছিল, তাতে ওই দুর্ঘটনার জন্য কারা দায়ী, তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। ফলে সরকার বা সংশ্লিষ্টরা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি।’

 



মন্তব্য