kalerkantho


বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন

তামাকপণ্যে কর ফাঁকি, বছরে ক্ষতি ৮৩৮ কোটি টাকা

ব্যবহারকারী কমছে

আরিফুর রহমান   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



তামাকপণ্যে কর ফাঁকি, বছরে ক্ষতি ৮৩৮ কোটি টাকা

তামাকজাত পণ্যের অবৈধ বাণিজ্যে দেশে প্রতিবছর রাজস্ব ক্ষতি হয় ১০ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৮৩৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা (৮ ফেব্রুয়ারির বিনিময় মূল্য অনুযায়ী)। বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। তবে আশার কথা হচ্ছে দেশে দিন দিন তামাকজাত পণ্যের বিশেষ করে সিগারেট ও বিড়ি ব্যবহারকারী কমছে। অন্যদিকে কর হার বাড়ানোর কারণে সরকারের রাজস্ব বাড়ছে।

সংস্থাটি অবশ্য স্পষ্ট করে বলেছে, তামাকের ওপর কর বাড়ানোর সঙ্গে অবৈধ বাণিজ্য বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তামাকের ওপর করের হার বাড়ানো হলেও তা অবৈধ বাণিজ্যের ওপর খুব কমই প্রভাব ফেলে। বিশ্বব্যাংক এও বলেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর তামাকজাত পণ্যে যতটুকু অবৈধ বাণিজ্য হয়, তা বৈশ্বিক তুলনায় খুবই কম। মাত্র ২ শতাংশ। বৈশ্বিক অবৈধ বাণিজ্য গড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ। সংস্থাটি জানিয়েছে, তামাক খাত থেকে সরকার যে রাজস্ব পায়, তার ৪ শতাংশ অবৈধ বাণিজ্য হয়।

গত ১ ফেব্রুয়ারি ‘কনফ্রন্টিং ইল্লিসিট টোব্যাকো ট্রেড : অ্যা গ্লোবাল রিভিউ অব কান্ট্রি এক্সপেরিয়েন্স’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছে, তামাকজাত পণ্যের সবচেয়ে বেশি অবৈধ বাণিজ্য হয় লাটভিয়ায় ৫০ শতাংশ। এরপরে আছে যথাক্রমে লিথুয়ানিয়ায় ৪৩ শতাংশ, ডোমেনিকান রিপাবলিকে ৪০ শতাংশ। আর পাকিস্তান, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকেও কম অবৈধ বাণিজ্য হয় বাংলাদেশে।

অবৈধ বাণিজ্য হওয়ার পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার গাফিলতি এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণহীনতাকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক।

সংস্থাটির মতে, অবৈধ বাণিজ্যের বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত নেই। কম্পানিগুলো মাঠপর্যায়ে জরিপ করে যে তথ্য নিয়ে আসে, তার ওপর অনেক সময় নির্ভর করতে হয়। অবৈধ বাণিজ্য ঠেকাতে কর প্রশাসনকে শক্তিশালী করার এবং একটি ন্যাশনাল টোব্যাকো কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ বাণিজ্য ঠেকাতে সব সংস্থা তৎপর। স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়। নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার টোব্যাকো কনট্রোল অ্যালায়েন্সের (এসইএটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক ড. উলাইসেস দোরোথেয় বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অত্যন্ত খোঁড়া যুক্তি তোলা হয় যে তামাকজাত পণ্যের ওপর করের হার বাড়ালে অবৈধ বাণিজ্য বেড়ে যায়। এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত যাঁরা, তাঁরা এই যুক্তি দিতে চান।’

অবশ্য বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, ‘যখন আপনি করের হার বাড়াবেন সেটা যেকোনো খাতেই হোক, তখন অবৈধ বাণিজ্য বেড়ে যাবে। তার

মানে এই নয় যে তামাকাজাত পণ্যের ওপর করের হার কমানোর কথা বলছি। করের হার বাড়াতে হবে। তবে অবশ্যই বাংলাদেশের বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে।’ তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের তামাকপণ্যের করের হারের কাঠামোতে সমস্যা রয়েছে। এই কাঠামো সংশোধন করলে তামাকজাত পণ্য থেকে আরো বেশি করে রাজস্ব আদায় সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক দশক আগেও বাংলাদেশে তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার দুটিই বেড়ে গিয়েছিল। ২০০৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ২৭ শতাংশ হারে উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ে। তবে ২০১২ থেকে উৎপাদন ও ব্যবহার দুটিই কমতে থাকে। এখনো তা অব্যাহত আছে। এক দশক আগে যেখানে ১৫৬ বিলিয়ন শলাকা উৎপাদন হতো, এখন সেটা ১২৫ বিলিয়ন শলাকায় নেমে এসেছে। ২০০৯ সালে দেশে প্রাপ্ত বয়স্ক ৪৩.৩ শতাংশ ধূমপান করত। এখন কমে ৩৫.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ৯ বছরে ধূমপায়ীর হার কমেছে ৮ শতাংশ। নারী-পুরুষ দুই ক্ষেত্রেই এ হার কমেছে।

এর কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাংক বলছে, ধূমপানে নিরুৎসাহিত করতে সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ধূমপানবিরোধী আইন কঠোর হয়েছে। শিক্ষামূলক প্রচারণা বেড়েছে। শুল্ক ব্যবস্থাপনা কঠোর হয়েছে। তা ছাড়া মানুষের মাঝেও সচেতনতা তৈরি হয়েছে।

সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত তামাকজাত পণ্যের জন্য আলাদা কোনো আইন করা হয়নি। তামাকজাত পণ্যের ওপর এখন যে করহার নির্ধারণ করা হয়, তা ১৯৯১ সালের মূল্য সংযোজন কর ভ্যাট আইনের মাধ্যমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক অব কনভেনশন অন টোব্যাকো কনট্রোলে (এফসিটিসি) বাংলাদেশ ২০০৩ সালে সই করেছে। একই সঙ্গে তামাকজাত পণ্যের ওপর করের হারও বাড়িয়েছে সরকার।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তামাকজাত পণ্য থেকে রাজস্ব আদায় হতো ১৬০ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। তামাকজাত পণ্য থেকে রাজস্ব আদায়ের হার এখন বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে তামাকজাত পণ্য থেকে প্রতিবছর যে রাজস্ব আসে, তার ৯৭ শতাংশই আসে সিগারেটের শুল্কের মাধ্যমে। বাকি তিন শতাংশ আসে বিড়ি কম্পানি থেকে। বাংলাদেশে প্রতিবছর যে বিড়ির উৎপাদন ও ব্যবহারকারী কমে যাচ্ছে, তা-ও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০০১ সালে দেশে ৭২ শতাংশ বিড়ি উৎপাদন হতো। সেটি এখন কমে ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

 



মন্তব্য