kalerkantho


ও প্রজাপতি-প্রজাপতি পাখনা মেলো

বিপ্রদাশ বড়ুয়া

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



জগৎজুড়ে একটিমাত্র পাখাসমৃদ্ধ বিচিত্র ফুল আছে যে উড়তে পারে, তার নাম প্রজাপতি। কবি নজরুল মুগ্ধ মনে গান বেঁধেছেন, ‘প্রজাপতি প্রজাপতি, কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা’। আর এই শেষ শীত ও বসন্ত ঋতু প্রজাপতিদের মধুমাস। পরিবেশবিদরাও বলছেন, বিচিত্র রঙের ডানাগর্বিত প্রজাপতি শুধু আশ্চর্য সুন্দর পতঙ্গ বা পাখি নয়, মানুষের খুব বড় বন্ধু। আর জগতের শ্রেষ্ঠ হিংস্র প্রাণী মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে মানুষ হত্যার জন্য অস্ত্র বানায়। মানুষের অত্যাচারে পৃথিবীর জলবায়ু অতিষ্ঠ হয়ে বদলাতে শুরু করায় বা পরিবেশ দূষণ হতে শুরু হওয়ায় প্রজাপতিদের জীবনচক্রে বিপর্যয় শুরু হতে থাকে। প্রজাপতি বা কেঁচো তো শুধুই কীটপতঙ্গ নয়। পৃথিবীর প্রাণের প্রবাহে অপরিহার্য ও গর্বিত অংশীদার। মানুষ মন ও মননের লালন করে জগতের সব প্রাণী ও প্রকৃতির সঙ্গে। মানুষও প্রকৃতির অংশ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বুনোপ্রায় কাননে প্রজাপতিদের উপযোগী ছোট একটি আবাস গড়া হয়েছে। ওদের উপযোগী খাবার ও বাসস্থান করা হয়েছে। বিশ্ব জলবায়ু, আমাদের লাগামহীন পরিবেশদূষণ, বৃষ্টির চিরাচরিত ধারায় বদল হচ্ছে বলে লেখালেখিও শুরু হয়েছে। আবহাওয়া ও বৃষ্টির চরিত্র দেশের মানুষের মতো বা আবহাওয়ার মতো মানুষেরাও বদলে যেতে শুরু করেছে। বিশ্বের পরিবেশবিদরাও এর ফলে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি মানছেন। আর ছোট্ট প্রজাপতিরা মানুষের চেয়ে বেশি এবং আগেভাগে এসব অনুভব করা শুরু করেছে। কারণ তারা প্রকৃতির সব কিছু সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারে মানুষের মতো কৃত্রিম হয়ে ওঠেনি বলে। এবং তারা প্রকৃতির ক্ষতি করতে জানে না বলে। অথবা কৃত্রিম হয়ে ওঠেনি বলে। এখন মানুষের টনক নড়েছে এবং নিজে বাঁচার জন্য গবেষণা শুরু করেছে। পাঠ্য পুস্তকেও তা অন্তর্ভুক্ত করছে। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ও আন্দোলন হয়েছে শুরু। ঋতুচক্রে শীতের গাছের পাতা ঝরা, মৌসুমি ফুল ফোটা, বসন্তে প্রায় সব গাছ ও ফুলের জীবনে উদ্ভিন্ন যৌবন জোয়ার শুরু। প্রজাপতির জীবনেও। নাগরিক মানুষেরা অর্থাৎ প্রণয়িনী বা

প্রণয়ীরা ভ্যালেন্টাইন দিবসে প্রণয়পত্র বা ফুল উপহার বিনিময় করে। আর দূষণ বিশ্বের সেরা সমৃদ্ধ ঢাকা শহরে আপনার আমার কষ্ট যেমন, প্রজাপতিরা শ্বাস নিতে না পেরে শহর ছেড়েই যাচ্ছে। ঋতুচক্রের সঙ্গে ওদের সম্পর্ক সরাসরি মানুষের চেয়ে গভীর। মানুষ ফসল ফলায়, কীটনাশক ব্যবহার করে। মানুষের খাদ্যেও মানুষ ভেজাল দিয়ে পয়মাল করে। কিন্তু অন্য সব প্রাণী ঋতুনির্ভর। মানুষের পোষা প্রাণীরা তেমনই কৃত্রিম। আর পোষা প্রাণীরাও শকুন ও শেয়ালের খাদ্য হওয়ার সুযোগ এখন পায় না। মানুষ কী করে তা আপনারা জানেন, জানেন না? বাজারে মানুষের খাদ্য হিসেবে বিক্রি হয়। শকুন ও শেয়ালও তাদের খাদ্যের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের ছেলেবেলায় ওদের সঙ্গে সখ্য ছিল, শত্রুতাও। এখন ওরা হারিয়ে যাওয়ার শেষ প্রান্তে। গত বছর গ্রামে রাতে দুটির ডাক শুনেছি, মধুর বিস্ময়ে উপভোগ করেছি। ছেলেবেলায় গ্রামের বাড়িতে শেয়ালের সঙ্গে লড়াই করে কুকুর ছানাদের বাঁচাতাম। আমাদের শহরে এখন প্রজাপতি আছে পার্কে। গ্রামে গেলে ওদের সঙ্গে কথা হয়। পরাগসঙ্গম ঘটিয়ে গাছকে বাঁচায় ওরা। টিকটিকি, গিরগিটি, পাখিদের খাদ্য প্রজাপতি। ব্যাঙ-পাখি-আরশোলা-সাপ কী না খায় মানুষ। তবে প্রজাপতি বাংলা গান ও কবিতার প্রেমের অনুষঙ্গ, সৌন্দর্যের অবকাশ সঙ্গী, স্বপ্নের মাধুর্য। পশ্চিমবঙ্গের বন দপ্তর এবং একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান রাজাভাত খাওয়া অঞ্চলে ৭.৫০ হেক্টর জমিতে গড়ে তুলেছে প্রজাপতির অভয় উদ্যান। সেখানে প্রজাপতিদের খাদ্য উপযোগী গাছ রোয়া হয়েছে। পার্শ্ববর্তী বক্স ও লাগোয়া অঞ্চলে ৫০০ প্রজাতির প্রজাপতি রয়েছে। শুধু সৌন্দর্যের নয়, মঙ্গল প্রদীপও ওরা জ্বেলে চলেছে জীবনভর।

 



মন্তব্য