kalerkantho


ইজি বাইকে মাসে চাঁদাবাজি এক কোটি ৩০ লাখ টাকা

লায়েকুজ্জামান   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



ইজি বাইকে মাসে চাঁদাবাজি এক কোটি ৩০ লাখ টাকা

রাস্তায় চলতে হলে মাসের শুরুতে অগ্রিম টাকা দিয়ে টোকেন নিতে হয়, না হলে চলাচল বন্ধ, এমনকি ইজি বাইকটাও ছিনিয়ে নেয়; আবার শারীরিক নির্যাতনেরও শিকার হতে হয়। মিরপুর এলাকায় ইজি বাইকে চাঁদাবাজি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান একজন ইজি বাইকচালক। আবুল কালাম নামের এই চালক মিরপুর থেকে দিয়াবাড়ী পর্যন্ত এলাকায় ইজি বাইক চালাচ্ছেন বছর দেড়েক ধরে।

অন্য একজন ইজি বাইকচালক এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সময়ে চাঁদার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে ৩০০ টাকা। আগে মাসে দিতাম এক হাজার টাকা। এখন দিতে হয় এক হাজার ৩০০ টাকা। মাসের শুরুতেই অগ্রিম টাকা দিয়ে টোকেন নিতে হয়। প্রতি ওয়ার্ডে টোকেন দেওয়ার লোক আছে। তাদের কাছে টাকা জমা দিলে টোকেন দেয়।’

মিরপুর এলাকার আদি ১০ নম্বর থেকে শুরু কালশী, পল্লবী, রূপনগর আবাসিক এলাকা, ইস্টার্ন হাউজিং, মিরপুর ১১, ১২ নম্বর সেকশন, চিড়িয়াখানা, বেড়িবাঁধ, উত্তরে দিয়াবাড়ী হয়ে উত্তরা পর্যন্ত অবাধে চলাচল করে সড়কে চলাচলের অনুমতিহীন অবৈধ এসব ইজি বাইক। ব্যাটারিচালিত এসব যানবাহনের স্থানীয় নাম ‘অটো’। অবৈধ যানবাহন হওয়ার কারণে সরকার বা কোনো সংস্থার কাছে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই।

এলাকাবাসী, ইজি বাইকের চালক ও মালিক এবং ইজি বাইকের চাঁদা সংগ্রহ করে এমন লোকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিরপুরের এসব এলাকায় প্রায় ১০ হাজার ইজি বাইক চলাচল করে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব ইজি বাইক থেকে চাঁদা তোলা হয় মাসিক ভিত্তিতে। প্রতি মাসে নেওয়া হয় এক হাজার ৩০০ টাকা। এই হিসাবে মাসে চাঁদাবাজি হয় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

চাঁদা আদায় করা হয় প্রি-পেইড পদ্ধতিতে। মাসের শুরুতেই ইজি বাইকের চালক বা মালিক প্রতি ওয়ার্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত চাঁদাবাজের কাছে এক হাজার ৩০০ টাকা জমা দিয়ে টোকেন নেয়। টোকেনে টাকার অঙ্ক উল্লেখ থাকে না। একটি সাংকেতিক নাম থাকে। বিভিন্ন সময়ে টোকেনের সাংকেতিক নাম বদল করা হয়। ভাষা আন্দোলনের মাস বলে চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে টোকেনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অমর একুশে’। একাধিক চালক জানিয়েছেন, গত ডিসেম্বর মাসে টোকেনের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বিজয়ের মাস’। গত বছরের মার্চ মাসে টোকেনের গায়ে লেখা ছিল ‘মহান স্বাধীনতা’। চলতি বছর জানুয়ারি মাসের টোকেনের নাম ছিল ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’।

সোহেল নামের একজন চালক কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতি মাসের ১ থেকে ৩ তারিখের মধ্যে টাকা দিয়ে টোকেন সংগ্রহ করতে হয়। ৫ তারিখ থেকে চেক শুরু হয়। টোকেন দেখাতে না পারলে গাড়ি আটকে রেখে মারধর করা হয়। টাকা জমা দেওয়ার পর গাড়ি ছাড়া হয়।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইজি বাইকের চাঁদার নিয়ন্ত্রক পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি তাজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি। তাঁর হয়ে সংগ্রহ করা টাকার ভাগ-বাটোয়ারা করেন খোকন নামের একজন। খোকন একসময় ছিলেন জাসাসের মিরপুর থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। তবে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এসব টাকার ভাগ-বাটোয়ারা বা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নই।’

একাধিক সূত্রে জানা যায়, মিরপুর এলাকায় ইজি বাইকের টোকেন দেওয়া ও চাঁদা সংগ্রহের দায়িত্বে আছেন ইকবাল, সোহেল ও আড্ডু। এঁরা তিনজনই স্থানীয় যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে তাদের দাবি। তবে তাঁদের কারো দলীয় পদ-পদবি নেই। পূরবী এলাকায় বসে টোকেন দেন ও চাঁদা সংগ্রহ করেন ইকবাল। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ ঠিক নয়। আমরা যুবলীগের রাজনীতি করি, চাঁদাবাজি করি না।’ তবে পূরবী এলাকায় চলাচলকারী একজন ইজি বাইক চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা প্রতি মাসে ইকবাল ভাইকে চাঁদা দিয়ে টোকেন নিয়ে আসি।’

মিল্ক ভিটা এলাকার একাধিক ইজি বাইক চালক বলেছেন, তাঁরা সোহেলের কাছ থেকে টাকা দিয়ে টোকেন নিয়েছেন। জানতে চাইলে সোহেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি চাঁদাবাজি করি না। রাজনীতি করি। সামনাসামনি কেউ আমার নাম বলতে পারবে না।’ মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনে চাঁদা সংগ্রহ করেন আড্ডু। তিনি কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ইজি বাইক থেকে সংগ্রহ করা অর্থের একটি বড় অংশের ভাগ যায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক অসাধু কর্মকর্তার কাছে। ভাগ নেন স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাও।

ইজি বাইকে চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি তাজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কোনো চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নই। আমার ব্যবসা ভিন্ন, আমার একটি ইটভাটা আছে, একটি গার্মেন্ট আছে। বরং আমি বলতে পারি, কিছু দিন আগে ইজি বাইকের বেশ কিছু চালক আমার অফিসে এসেছিলেন, তাঁরা আমাকে চাঁদাবাজির ঘটনার সমাধান করে দিতে অনুরোধ করেন। আমি তাঁদের বলেছি, আমি এসবের কী করব, আমি তো চাঁদাবাজি করি না। ব্যবসা করে খাই।’



মন্তব্য