kalerkantho


মহাখালী বাস টার্মিনাল

‘চাঁদা দেই, এটা যাত্রীদের ওপর থেকে তুলে নেই’

লায়েকুজ্জামান   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



‘চাঁদা দেই, এটা যাত্রীদের ওপর থেকে তুলে নেই’

নেত্রকোনাগামী একটি বাস মহাখালী বাস টার্মিনালের ভেতর থেকে ছেড়ে মূল সড়কে ওঠার আগেই বাসের দরজার পাদানিতে উঠে দাঁড়ালেন একজন। গত ৭ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই বাসের একজন কর্মীর কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে তিনি বিদায় হলেন। মিনিটখানেক ব্যবধানে আরেকজন একই কায়দায় ওই কর্মীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। কথা বলে জানা গেল তাঁর নাম সালাম। কত টাকা কিসের জন্য নিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০০ টাকা, ইউনিয়নের জন্য।’ আগেরজন কিসের জন্য কত টাকা নিলেন জানতে চাইলে সালাম বলেন, ‘সেও ২০০ টাকাই নিয়েছে মালিক সমিতির জন্য।’

ওই টার্মিনালে মহাখালী থেকে রাজশাহীগামী একটি পরিবহন কম্পানিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন সালাউদ্দিন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাস থেকে শ্রমিকদের নামে টাকা তোলা হয় এটা ঠিক, তবে আমরা তো কোনো সহযোগিতা পাই না। অসুস্থ হলেও চিকিৎসার জন্য পর্যন্ত টাকা পাওয়া যায় না। টাকা যে কোথায় যায় তাই তো বুঝি না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাসমালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মালিক সংগঠনের নামে চাঁদা তোলা হয়, তবে আমরা কখনো ওই টাকার হিসাব নিতে যাই না। কখনো গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লে নেতারা এগিয়ে আসেন, সহযোগিতা করেন। আমাদের জন্য এটাই যথেষ্ট। আমরা ধরেই নিয়েছি, ব্যবসা করতে হলে গচ্চা তো কিছু যাবেই।’ হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘চাঁদা দেই, এটা আমরা যাত্রীদের ওপর থেকে তুলে নেই। গড়ে তো লোকসান নাই।’

মহাখালীতে চাঁদা আদায় করা হয় মহাখালী বাস টার্মিনাল সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি এবং ঢাকা জেলা বাস-মিনিবাস সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নামে। মালিকদের ওই সমিতির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক। শ্রমিকদের ইউনিয়নের সভাপতি সাদেকুর রহমান হিরু আর সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ সদু।

প্রতিদিন আদায় ১১ লাখ টাকা : ওই টার্মিনালে কয়েকজন বাসমালিক ও শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখান থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার দূরপাল্লার বাস দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করে। ওই সব বাস থেকে দুই সংগঠনের নামে চাঁদা তোলা হয় দিনে আট লাখ টাকা। টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি বাস থেকে দুই সংগঠনের নামে নেওয়া হয় ৪০০ টাকা। সে হিসাবে দুই হাজার বাস থেকে চাঁদা আদায় হয় দৈনিক আট লাখ টাকা। এ ছাড়া ঢাকা মহানগরের অভ্যন্তরীণ রুটে এবং বিভিন্ন জেলা থেকে আরো প্রায় তিন হাজার বাস যাতায়াত করে মহাখালী হয়ে। ওই সব বাস থেকেও মহাখালী বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে দিনে ১০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। ওই খাত থেকে চাঁদা আসে তিন লাখ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতিদিন ১১ লাখ টাকা চাঁদা ওঠে।

‘চাঁদা নেই তবে ২০০ টাকা নয়’ : চাঁদা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা জেলা বাস-মিনিবাস সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ সদু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাঁদা আমরা নেই না তা বলব না। চাঁদা নেই, সংগঠনের নামেই নেই। তবে পরিমাণ দিনে ২০০ টাকা না, নেই মাত্র ৩০ টাকা করে। ওই টাকা শ্রমিকদের কল্যাণেই ব্যয় করা হয়, যেমন অসুস্থ শ্রমিককে সহযোগিতা করি, যেসব শ্রমিক মারা গেছে তাদের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ দেই।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মালিক সমিতি কত টাকা আদায় করে আমি তা জানি না।’ চাঁদার টাকা কোনো ব্যাংক হিসাবে রাখা হয় কি না এবং রসিদ দিয়ে আদায় করা হয় কি না জানতে চাইলে শহীদুল্লাহ সদু বলেন, ‘না, পরিমাণ অল্প বলে টাকা ব্যাংকে থাকে না, খরচ হয়ে যায়। রসিদ দিয়েও আদায় হয় না।’

মহাখালী বাস টার্মিনাল সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা মালিক সমিতির পক্ষে চাঁদা আদায় করি, তবে তার পরিমাণ ২০০ টাকা নয়, আমরা মালিকদের কাছ থেকে বাসপ্রতি দিনে নেই ৪০ টাকা। এই টাকা নেওয়া হয় মালিক সমিতির কার্যালয়ের ব্যয় নির্বাহ করতে।’ চাঁদার টাকা রসিদ দিয়ে আদায় করা হয় কি না জানতে চাইলে তিনি ‘না’ সূচক জবাব দেন।



মন্তব্য