kalerkantho


ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা

সমন্বয়হীনতায় ভেস্তে যায় সব উদ্যোগ

পার্থ সারথি দাস   

২২ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



সমন্বয়হীনতায় ভেস্তে যায় সব উদ্যোগ

ফাইল ছবি

ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল গত আগস্টে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিআরটিএ ও পুলিশ দফায় দফায় অভিযানে নেমেছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মামলা, জরিমানা, কারাদণ্ড দেওয়া হলেও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরেনি। শুধু মোটরসাইকেলে হেলমেট ব্যবহারে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। তবে ১৭ নির্দেশনার মধ্যে ১৬টিই অগ্রগতিহীন।

নির্দেশনা জারির পর গত পাঁচ মাসের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় না থাকায় সব উদ্যোগ ব্যর্থ হচ্ছে। জানা গেছে, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বিত কর্মসূচির জন্য ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) রয়েছে। সংস্থাটি সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বৈঠক করেছে, বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে; কিন্তু ফল হয়নি। কারণ এ সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে বারবার বদল হচ্ছে। ফলে কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যাচ্ছে না। ১৯৯৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত সংস্থায় নির্বাহী পরিচালক পরিবর্তন হয়েছেন ২৩ জন।

গত বছরের জুলাই ও আগস্টে খুদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে টানা ৯ দিন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৭টি নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পুরো বিষয়টি সমন্বয়ের জন্য ডিটিসিএকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে সড়কে শৃঙ্খলার জন্য ট্রাফিক পুলিশ বা বিআরটিএ গণমাধ্যম কিংবা সরকারের চাপে পড়ে দায় এড়াতে অভিযানে নামলেও একপর্যায়ে নেতিয়ে পড়ে। বর্তমানে ঘোষণা দিয়ে ঢাকা মহানগরীতে ট্রাফিক পুলিশের শৃঙ্খলা পক্ষ চলছে। এ ছাড়া বিআরটিএও অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে সমন্বয় নেই। বিআরটিএ চলে নিজেদের মতো করে। ট্রাফিক পুলিশও চলে নিজেদের মতো করে।

ডিটিসিএর সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম সালেহ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, সিটি করপোরেশন এলাকায় সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ও অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে ১৯৯৮ সালে আরবান ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা মহানগর এলাকার জন্য প্রথমে ‘ঢাকা ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানিং অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন’ এবং পরে এর নাম পরিবর্তন করে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ড (ডিটিসিবি) রাখা হয়। সর্বশেষ সংস্থাটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।

এ সংস্থার কার্যালয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ভবনে। এটির মূল কাজ হলো ঢাকা মহানগরে সড়ক পরিবহন অবকাঠামো ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা ও সমন্বিত পরিবহন নীতি তৈরি, বাস্তবায়ন ও সড়ক পরিবহন সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা। এ ছাড়া গণপরিবহনে যাত্রীর চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ

করতে একটি নিরাপদ, দক্ষ ও আধুনিক বাস রুট নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করা। সংস্থাটি পরিচালিত হয় নির্বাহী পরিচালক দ্বারা। ঢাকা মহানগরীর পরিবহনসংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন পরিকল্পনা গ্রহণের দায়িত্ব ডিটিসিএর। এটি বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন, সওজ অধিদপ্তর, এলজিইডি ও ডিএমপির কর্মকাণ্ডের মধ্যে সমন্বয় করা ছাড়াও ঢাকা মহানগরীতে নিজস্ব প্রকল্প গ্রহণ করে।

ঢাকার পরিবহন খাতকে উন্নত করতে প্রথমে ২০০৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) নিয়েছিল সংস্থাটি। পরে তা ২০১৫ থেকে ২০৩৫ সালে বাস্তবায়নের জন্য সংশোধিত কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়।

২০০৪ সালে কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নকালে ডিটিসিবির অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন এস এম সালেহ উদ্দিন। ২০১১ সালের শেষ দিকে তিনি প্রধান নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। সালেহ উদ্দিন বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসা থেকে শুরু করে সড়কের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জরুরি হয়ে পড়েছে। আমি ২০০৪ সালে সংস্থায় এসে বিভিন্ন সমীক্ষা ও প্রকল্প হচ্ছে দেখতে পাই। তখন ৫০ জনের বেশি জনবল ছিল। কিন্তু প্রকল্প কমে গেলে ২০০৬ সালে আমি ছাড়া আর কোনো কর্মকর্তা সংস্থায় কর্মরত ছিলেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ও পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে সংস্থাটি উজ্জীবিত হয়। ২০১০ সাল থেকে সংস্থাটিকে কর্তৃপক্ষ হিসেবে গঠনের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়।’

সড়কে শৃঙ্খলা আনতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। নৈরাজ্য বন্ধে ঢাকায় কম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় দুই বছর পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল কমিটি ও উপকমিটি করে পুরো বিষয়টি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ডিটিসিএ দ্রুত কর্মসূচি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারত। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গাড়ি নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণেও ডিটিসিএ উদ্যোগ নিচ্ছে না।

ঢাকার রাস্তায় এখনো রেষারেষি করে বাস চালানো হচ্ছে। যাত্রী ওঠানামার জন্য ১২১টি স্থান চিহ্নিত করার পরও ওই সব স্থানে বাস থামানো হচ্ছে না। দরজা বন্ধ রেখে বাস চালানো হয় শুধু অভিযান চলাকালে। বাসের ভেতরে প্রদর্শন করা হচ্ছে না চালকের লাইসেন্সের কপি। অথচ এগুলো ছিল সরকারি নির্দেশনা। 

সব পরিবহনে (বিশেষত দূরপাল্লার বাসে) চালক ও যাত্রীর সিটবেল্ট ব্যবহারের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। ঢাকার যেসব স্থানে ফুট ওভারব্রিজ কিংবা আন্ডারপাস আছে, সেগুলোর উভয় পাশে ১০০ মিটারের মধ্যে রাস্তা পারাপার সম্পূর্ণ বন্ধ করার নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি। বাস্তবায়িত হয়নি আন্ডারপাসে লাইট, সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ আন্ডারপাস ব্যবহার করতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার নির্দেশনা। সব সড়কে জেব্রাক্রসিং, রোড সাইন দৃশ্যমান, ফুটপাত হকারমুক্ত, অবৈধ পার্কিং ও স্থাপনা উচ্ছেদসহ সড়কের নামফলক দৃশ্যমান করা হয়নি। দৃশ্যমান হচ্ছে না অবৈধ পার্কিং ও স্থাপনা উচ্ছেদ।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘ঢাকায় সড়কে শৃঙ্খলা না আসার বড় কারণ সমন্বয়ের অভাব। এ শহরে কত গাড়ি চলবে তার কোনো সমীক্ষাই হয়নি।’

ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রাকিবুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সমন্বয়ে জোর দেব। চলতি মাসের শেষ দিকে সভা করব। নির্বাচন নিয়ে এক মাস সবাই ব্যস্ত ছিল। সংস্থাটি আগে মেট্রো রেল, বিআরটি, কেইসসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এবার সংস্থায় নতুন ১৩ জন কর্মকর্তা যোগ দিয়েছেন। আমরা এবার কিছু করতে পারব। আগে তো আমাদের দক্ষ জনবলই ছিল না। আমরা সড়কে নিরাপত্তার জন্য বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটকে নিয়ে কাজ করব।’ তিনি আরো বলেন, ‘কোন রুটে কত গাড়ি চলবে তার জন্য সমীক্ষা করা হবে। প্রকল্পের জট থেকে এবার শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দেওয়া যাবে।’

 



মন্তব্য