kalerkantho


ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন

বারবার ঝুঁকির মুখে কোটি কোটি শিশু

তৌফিক মারুফ   

১৯ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



বারবার ঝুঁকির মুখে কোটি কোটি শিশু

ঘুরেফিরে বারবারই ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের নামে ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে দেশের কোটি কোটি শিশুকে। বিষয়টি নিয়ে একদিকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকছেন অভিভাবকরা, অন্যদিকে জাতীয় কর্মসূচির আওতায় সরকারের এই উদ্যোগও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে। উল্টোদিকে পরিস্থিতি তৈরির নেপথ্যে থাকা চক্রটি বারবারই থেকে যাচ্ছে আড়ালে, ধরাছোঁয়ার বাইরে। যতবারই ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, ততবারই সরকারের তরফ থেকে তা কৌশলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বরং বাণিজ্যের নামে দেশি-বিদেশি চক্রটি হাতিয়ে নিচ্ছে বিদেশি সাহায্যের সরকারি খাতের কোটি কোটি টাকা।

পেছনের ধারাবাহিকতায় এবারও নিম্নমানের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের মান নিয়ে অভিযোগের মুখে কর্তৃপক্ষ আজ শনিবার দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। এর আগেও একই ধরনের অভিযোগের মুখে এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনার প্রেক্ষাপটে দুই দফা এই কর্মসূচি বন্ধ থেকেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, আজ যে ক্যাপসুল খাওয়ানোর কথা ছিল তা কেনার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল ২০১৬ সালে। ওই আদেশের আওতায় দুই কোটি ৭০ লাখ পিস ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল নিয়ে প্রায় তিন বছর ধরে চলে নানা টালবাহানা। এমনকি আদালতেও ঘুরপাক হায় এ সংক্রান্ত মামলা। একপর্যায়ে কয়েক মাস  আগে পুরনো সেই ওষুধই সরবরাহ নেয় কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. মুরাদ হাসান গতকাল শুক্রবার কিশোরগঞ্জে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে বলেন, ‘ভারতীয় কম্পানির সরবরাহ করা লাল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলগুলো নষ্ট থাকায় সারা দেশে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন স্থগিত করা হয়েছে। শিগগিরই ভালো ক্যাপসুল সংগ্রহ করা হবে এবং নতুন তারিখ ঘোষণা করে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে।’

এ সময় প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘ভারতের মুম্বাইয়ের সফটিসোল নামের একটি কম্পানি লাল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলগুলো সরবরাহ করেছিল। ওই কম্পানির ভাবমূর্তি ভালো না থাকায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ওই কম্পানিকে এ কাজটি দিতে চাইছিল না। কিন্তু তারা মামলা করায় মন্ত্রণালয় তাদের এই কাজ দিতে বাধ্য হয়। এখন ক্যাপসুলের নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ক্যাপসুলের মান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। এ নিয়ে তদন্ত শেষে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা শুরুতেই ভারতীয় ওই প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ আদেশ দিতে আপত্তি জানিয়েছিলাম। ভারতীয় ওই কম্পানিটির রেজিস্ট্রেশনও ছিল না। স্থানীয় একটি এজেন্ট কম্পানি এখানে লিয়াজোঁ করত। রেজিস্ট্রেশন না থাকায় আমরা তখন ওই ওষুধের মানও দেখতে পারিনি। তবু পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশে আমরা অনাপত্তিপত্র দিতে বাধ্য হয়েছিলাম।’

মাঠপর্যায়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় পুষ্টিসেবা কার্যক্রমের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুরনো কার্যাদেশের লট থেকেই এ দফার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সারা দেশে সরবরাহ করা হয়েছিল। ২০১৬ সালে ওই লটের ওষুধের কার্যাদেশ দেওয়া হলেও নানা জটিলতা কাটিয়ে ওই ওষুধ আমাদের হাতে আসে মাত্র কয়েক মাস আগে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় পুষ্টিসেবা কার্যক্রমের আরেক সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কেনা নিয়ে জটিলতা চলার মাঝে আরো দুদফা একই ওষুধ সংগ্রহ করে তা দিয়ে এই সময়ের মধ্যকার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে। এমনকি এখনো নতুন আরো ওষুধ মজুদ রাখা আছে পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য। আর সেগুলো ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে।

একই সূত্র জানায়, এর আগে ২০১২ সালে টেন্ডার প্রক্রিয়ার সময়মতো প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ না করা সত্ত্বেও ভারতীয় অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ায় বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ওই আদালত সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন), সিএমএসডির পরিচালক ও ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শাতে বলে। এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে জটিলতার মুখে পর পর দুদফা ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি কমানো এবং অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকে দেশের দুই কোটির বেশি শিশুকে বছরে দুবার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। বিশ্বব্যাংকের টাকায় সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সংগ্রহের ব্যবস্থা করে থাকে। ৭০ দশক থেকে সরকার প্রথমে ইউনিসেফের মাধ্যমে বিনা মূল্যে ওই ওষুধ পায়। পরবর্তী সময়ে একপর্যায়ে সরকার নিজ উদ্যোগেই দেশের বাইরে এবং ভেতরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এই ওষুধ সংগ্রহ করে। আর এই কেনাকাটা নিয়ে মাঝেমধ্যে নানা অনিয়ম ও ঝামেলাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের সর্বশেষ কার্যকর আদেশ অনুসারে দেশের স্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণ তৈরি করলে ওই ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি না করার নির্দেশনা রয়েছে।

এদিকে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এবার সারা দেশে সরবরাহকৃত যে ওষুধে আজ ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন পালনের কথা ছিল, তা সংগ্রহের আগেই তারা আপত্তি জানিয়েছিল। বিশেষ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় পুষ্টিসেবা কার্যক্রমের আওতায় সরকারিভাবে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কেনার ক্ষেত্রে বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ওষুধ সংগ্রহ করা যাবে না বলে ২০১৬ সালের ২৭ জুন এক চিঠির মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম পরিচালক, কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক, জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে  বিষয়টি জানিয়েছিলেন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আদেশের বরাত দিয়ে ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘আবেদীত ওষুধ (ভিটামিন এ ক্যাপসুল) স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণে উত্পাদিত হয় বিধায় ওষুধটি আমদানির নিমিত্তে এনওসি দেওয়া গেল না।’ চিঠিতে দেশের সাতটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়, যারা স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন নামে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল উত্পাদন করে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের আপত্তিপত্র ইস্যুর ঠিক তিন দিনের মাথায় ওই বছরের ৩০ জুন ওই আপত্তি উপেক্ষা করেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন সিএমএসডি ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে চার কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার টাকায় দুই কোটি ৭০ লাখ পিস ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহের কার্যাদেশ দেয়। বিষয়টি জানাজানি হলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ওই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কয়েক দিন ধরে চাপা অসন্তোষ চলে। একপর্যায়ে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।

এদিকে আমাদের কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি শফিক আদনান জানান, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. মুরাদ হাসান গতকাল দুপুরে কিশোরগঞ্জ সার্কিট হাউসে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিষয়ক জটিলতা নিয়ে এক মতবিনিময়সভায় অংশ নেন। এ সময় সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান নষ্ট হয়ে যাওয়া লাল রঙের ক্যাপসুলের নমুনা প্রতিমন্ত্রীকে দেখান।

প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের তারিখ পরিবর্তনের কারণে শিশুদের কোনো সমস্যা হবে না। লাল রঙের ক্যাপসুলগুলো ভারতীয় কম্পানি সরবরাহ করেছে। আর নীলগুলো দিয়েছে বাংলাদেশের একটি কম্পানি।’

এ সময় সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান জানান, ভারতীয় একটি কম্পানির সরবরাহ করা ক্যাপসুলগুলোর একটির সঙ্গে আরেকটি গায়ে গায়ে লেপ্টে আছে। একটা থেকে আরেকটা ক্যাপসুল আলাদা করা যাচ্ছে না। অথচ এগুলো ঝরঝরে থাকার কথা। তিনি জানান, কিশোরগঞ্জে চার লাখ ৯৯ হাজার শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কথা ছিল। ক্যাপসুলগুলো উপজেলাগুলোতে পাঠিয়েও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এগুলো খুলে দেখার পর বিষয়টি সবার নজরে আসে। এরপরই তিনি বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন মহলে যোগাযোগ করেন।

 

 



মন্তব্য