kalerkantho


নওগাঁ-৫

জলিল-সহানুভূতি জনের ধলুর আশা নীরব বিপ্লব

আরিফুর রহমান ও ফরিদুল করিম, নওগাঁ থেকে    

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



জলিল-সহানুভূতি জনের ধলুর আশা নীরব বিপ্লব

‘ভাশুর গেছে শ্বশুর গেছে দূরে বাণিজ্য করতে/শ্বশুর আইল ভাশুর আইল পতি কোথায় রইল।’—নওগাঁ জেলায় এসব গ্রাম্য গীতি, লোকগান, বিয়ের গীত চলে আসছে শতাব্দী ধরে। নদী-খাল-বিল মোড়ানো জেলাটি যে আবহমানকালের লোকসংস্কৃতির ধারক ও বাহক, এর প্রমাণ মিলল শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া ‘ছোট যমুনা নদীর’ ওপর নির্মিত সেতুতে গিয়ে। প্রতিদিন সকালে সেতুর ওপর দিনমজুররা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে কাজের খোঁজে। শনিবার সকালে তাদের মুখে শোনা গেল নানা গ্রাম্য গীত।

নির্বাচনের পরিবেশ কেমন জানতে চাইলে আবদুর রহিম, ইকবাল হোসেনসহ কয়েকজন শ্রমিক জড়ো হয়ে বললেন একই কথা, নওগাঁ-৫ (সদর) আসন সব সময় শান্ত। নির্বাচন ঘিরে এখানে কখনো সংঘর্ষ-সংঘাত হয় না। সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন হয়। এই সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি করে দিয়ে গেছেন প্রয়াত আব্দুল জলিল।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নওগাঁ-৫ (সদর) আসনে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আব্দুল জলিল। কারণ আওয়ামী লীগ থেকে এই আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তাঁর ছেলে ব্যারিস্টার নিজামউদ্দিন জলিল জনকে। আইন বিষয় নিয়ে বিদেশে পড়াশোনা করা জন রাজনীতির মাঠে নবাগত। ভোটের মাঠে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পড়লেও এলাকার উন্নয়নের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রয়াত বাবার কারণে ভোটারদের কাছে বেশ সহানুভূতি পাচ্ছেন নিজামউদ্দিন জন। বাবার করে যাওয়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তরুণ ও শিক্ষিত হওয়ায় নিজামউদ্দিন জন নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে যেতে পারেন—এমন কথা বলেছেন সাধারণ ভোটার ও সুধীসমাজের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি।

অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী জাহিদুল ইসলাম ধলু নির্বাচনের মাঠে এবারই প্রথম; যিনি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করছেন। এলাকায় দীর্ঘদিন রাজনীতি করায় ভোটের মাঠে বেশ শক্ত অবস্থান আছে ধলুর। এলাকার ভোটাররা বলছে, এবার ভোট হবে তারুণ্যের শক্তির সঙ্গে অভিজ্ঞতার। ধলুর মতে, নওগাঁ সদর আসন বিএনপির দুর্গ। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ধানের শীষ প্রতীক জয়লাভ করবে বলে আশাবাদ তাঁর। নীরব ভোট বিপ্লবের আশাও করছেন তিনি।

নওগাঁ শহরের পাশে তাজ সিনেমা হল। এর উল্টো পাশে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প। তার পাশে বেশ কয়েকটি চায়ের দোকান। সেখানে গিয়ে দেখা গেল বেশ জটলা। কাছে গিয়ে শোনা গেল নির্বাচনী আলোচনা। ব্যবসায়ী ইসমাঈল হোসেন বললেন, ‘এই আসনে কখনো বিএনপি জেতে, কখনো আওয়ামী লীগ জেতে। তবে আসনটি বিএনপির দুর্গ। এবার যেহেতু জলিল সাহেবের ছেলে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন, ভোটের হিসাব-নিকাশ বদলে যেতে পারে। কারণ সদর আসনে রাস্তাঘাট, সেতুসহ যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে, তার স্বপ্নদ্রষ্টা বলা হয় আব্দুল জলিলকে।’

জেলার রক্তাপুর ইউনিয়নের বিস্তৃত ক্ষেতে গিয়ে কথা হলো কৃষক জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘জনকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়ায় আমরা খুশি। তাঁর বাবা আমাদের এলাকার জন্য অনেক উন্নয়ন করেছেন। জিততে পারলে তাঁর ছেলেও উন্নয়ন করবেন।’ একই ইউনিয়নের কৃষক জহির উদ্দিন বলেন, ‘যে দল থেকে যিনিই দাঁড়ান, আমরা ভোট দেব ধানের শীষে।’

সরেজমিনে ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, দুই দলেই আছে কোন্দল। অভ্যন্তরীণ কোন্দল দূর করতে না পারলে দুই দলকেই খেসারত দিতে হতে পারে। আব্দুল জলিলের মৃত্যুর পর সদর আসনে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় আবদুল মালেককে। মালেক এখন আওয়ামী লীগের জেলা সভাপতি, একই সঙ্গে সংসদ সদস্যও। গত  পাঁচ বছরে তাঁর বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যসহ অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করার অভিযোগও রয়েছে। এসব কারণে দল থেকে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। মনোনয়ন না পাওয়ায় ক্ষোভ আছে আবদুল মালেকের। এখন পর্যন্ত দলের জন্য নির্বাচনের মাঠে দেখা যায়নি তাঁকে। গতকাল রবিবার খবর নিয়ে জানা গেল, বাসায় ঘুমিয়ে-বসে সময় কাটছে বর্তমান সংসদ সদস্যের। দলীয় চাপে শেষ পর্যন্ত জনের পক্ষে ভোটে নামলেও ভেতরে ভেতরে নিষ্ক্রিয় থাকার আশঙ্কা করছে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী।

সদর থানা আওয়ামী লীগের সদস্য সিরাজুল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক মেহেদী হাসান, সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক ইলিয়াস তুহিন মনে করেন, দলকে কেউ পেছন থেকে ধরে রাখতে পারবে না। কেউ ক্ষতি করতে পারবে না। শেখ হাসিনা গত দশ বছর দেশের যে উন্নয়ন করেছেন, এর ধারাবাহিকতার জন্য এই সরকারের আবার ক্ষমতায় আসা উচিত।

আওয়ামী লীগ প্রার্থী নিজামউদ্দিন জলিল জন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এলাকায় আমার বাবার যেসব অসম্পূর্ণ কাজ বাকি রয়ে গেছে, নির্বাচিত হলে আমি সেসব কাজে হাত দেব।’ দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আপনি সবই জানেন। আমি এসব নিয়ে মন্তব্য করব না। তবে গোছানোর চেষ্টা করছি। নির্বাচনে দলের সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে, আমি তা আশা করি’।

অন্যদিকে বিএনপিতেও আছে দলীয় কোন্দল। নওগাঁ পৌর মেয়র নাজমুল হক সনি, উপজেলা চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক নান্নু দুজনেই দল থেকে মনোনয়ন চেয়েছেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লে. কর্নেল (অব.) আবদুল লতিফও মনোনয়ন চেয়েছেন এই আসন থেকে। কিন্তু তিনজনই বঞ্চিত হওয়ায় তাঁদের মধ্যেও ক্ষোভ রয়েছে। ভোটের মাঠে এই তিনজনের নিষ্ক্রিয় থাকার আশঙ্কা আছে বিএনপির মধ্যে। তবে দলের মধ্যে কোনো কোন্দল নেই বলে দাবি করেছেন প্রার্থী ধলু। তিনি বলেন, ‘সবাই আমার সঙ্গে নির্বাচনে মাঠে যাচ্ছে। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছে।’ নওগাঁ জেলা বিএনপির সহসভাপতি বদরুল আলম নয়ন ও সাংগঠনিক সম্পাদক মামুনুর রহমান লিপু মনে করেন, সামনের দিনে কোনো কোন্দল থাকবে না। সবাই দলের জন্য মিলেমিশে কাজ করবে।

নওগাঁ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম খান বলেন, জাতীয় নির্বাচনে মানুষ শিক্ষিত প্রার্থী চায়। এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটার একটা বড় ভূমিকা রাখবে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, দুই দলেই দলীয় কোন্দল প্রকট। সেটা কতটা মেটানো সম্ভব তা দেখার বিষয়। 

স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই আসনে বরাবরই লড়াই হয় নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে। ১৯৯১ সালের গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর থেকে ২০০১ পর্যন্ত এই আসনে বিএনপি জয়লাভ করেছে। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল জলিল। আর ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল মালেক। নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় মালেককে না দিয়ে তরুণ জনকে মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। নওগাঁ সদর আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থী দুজনেই এবার প্রথমবারের মতো দল থেকে সংসদ নির্বাচনের টিকিট পেয়েছেন। এই আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ১১ হাজার ৭১৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৫৫ হাজার ৬৪ জন আর নারী ভোটার এক লাখ ৫৬ হাজার ৬৫৪ জন।



মন্তব্য