kalerkantho


সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রোগীবান্ধব সেবা

তৌফিক মারুফ   

১১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রোগীবান্ধব সেবা

মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবেই আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে সব রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার থাকা উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিনা মূল্যে চিকিত্সাসেবা, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন, স্বাস্থ্যবীমা চালু, রোগীবান্ধব পরিবেশ, চিকিত্সক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক, গ্রামপর্যায়ে চিকিত্সকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, বেসরকারি চিকিত্সাসেবায় অতি মুনাফা নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ যৌক্তিকভাবে বাড়ানোসহ বেশ কিছু বিষয়ে তাঁরা আলোকপাত করেছেন।

রোগ প্রতিরোধ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করা; স্বাস্থ্য খাতের সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমের সমান্তরাল বিভাজনের পরিবর্তে প্রয়োজন অনুসারে অগ্রাধিকার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ারও পক্ষে বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে অসংক্রামক রোগ বিস্তার রোধে জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি রোধে আরো কার্যকর ব্যবস্থা চান বিশেষজ্ঞরা। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আওতায় সংক্রামক রোগের ভেতর যক্ষ্মা নির্মূলে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার বাস্তবায়নে জাতীয় অঙ্গীকারের প্রতিও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

জাতীয় স্বাস্থ্য আন্দোলনের সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহাবুব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয়ভাবে স্বাস্থ্যসেবার সার্বিক খাতে কার্যকর অগ্রগতির মূল সোপান হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গীকার। যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক তাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে—মোটা দাগে তা অঙ্গীকার করা হয় নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্যে। তাই আমাদের প্রত্যাশা, সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের অবস্থানকে তুলে ধরতে হবে, যাতে আমরা ইশতেহারের ভেতরে ভোটের পরে সরকারি কাজের বিষয়ে তাদের চিন্তার প্রতিফলন দেখতে পাই।’

জনস্বাস্থ্য খাতের ওই নেতা বলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর ধরে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ যৌক্তিক পর্যায়ে বৃদ্ধির দাবি করে আসছি। কিন্তু এর কার্যকর প্রতিফলন ঘটে না। প্রতিবারই নানা ধরনের জালে আটকে যায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির হার। টাকা বাড়লেও হারে তেমন প্রভাব পড়ে না। তাই বর্তমান বাজেটের তুলনায় পরবর্তী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ন্যূনতম আরো ৩ শতাংশ বরাদ্দ বৃদ্ধি করার

অঙ্গীকার করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে আমরা চাই অপেক্ষাকৃত দরিদ্র জনবান্ধব একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানে যেমন বিনা মূল্যে দরিদ্রদের চিকিত্সাসেবা বাস্তবেই কার্যকর হবে, আবার বেসরকারি খাতে অতিবাণিজ্য ও অতিমুনাফার সুযোগ থাকবে না।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, স্বাস্থ্য খাতের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও সবার জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু, দরিদ্র মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ বিনা মূল্যের চিকিত্সা নিশ্চিত করার বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে রাখা উচিত। তিনি বলেন, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর চিকিত্সাসেবা নিশ্চিতকরণে চিকিত্সক ও সংশ্লিষ্ট জনবল আনুপাতিক হারে আরো বৃদ্ধির সুযোগ তৈরির পাশাপাশি ওই জনবল যাতে গ্রামাঞ্চলে অবস্থান করতে উত্সাহী হয় সে জন্য উপযুক্ত প্রণোদনার ব্যবস্থা করা, বেসরকারি চিকিত্সাসেবা খাতকে সেবা খাতের মূলধারায় নিয়ে এসে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিধান তৈরির বিষয়টিও ইশতেহারে রাখা উচিত।

যক্ষ্মা নির্মূলে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দাবি : এসডিজি অর্জন করতে হলে ২০৩০ সাল নাগাদ যক্ষ্মারোগে মৃত্যুর হার ৯০ শতাংশ এবং নতুনভাবে শনাক্তকৃত যক্ষ্মারোগীর হার ৮০ শতাংশ কমিয়ে আনতে যক্ষ্মারোগ নির্মূলে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে এক গোলটেবিল বৈঠকে ওই দাবি জানানো হয়। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম ও ব্র্যাক যৌথভাবে ওই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. সামিউল ইসলাম বলেন, যক্ষ্মাবিষয়ক কর্মকাণ্ডে আর্থিক সহায়তা কমে গেলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যেহেতু বাংলাদেশ এখনো এই রোগের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ, তাই এটা নিয়ন্ত্রণে সরকার বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। আসন্ন নির্বাচনেও ইশতেহারে এ বিষয়ে আরো গুরুত্ব দেওয়া খুবই জরুরি।

ব্র্যাকের পরিচালক (সংক্রামক রোগ) ড. মো. আকরামুল ইসলাম বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ২০৩০ সাল নাগাদ যক্ষ্মা রোগের মৃত্যু হার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কমিয়ে আনতে হবে। তাই এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা ও নির্বাচনী অঙ্গীকার থাকা উচিত।

গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বাংলাদেশের গ্লোবাল ফান্ড ও এমডিআর-টিবির উপদেষ্টা ডা. মো. আব্দুল হামিদ সেলিম। বক্তব্য দেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশের কমিউনিকেবল ডিজিজেস সার্ভেইল্যান্সের মেডিক্যাল অফিসার ডা. মিয়া সেপাল নাগন, ডেমিয়েন ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. অংকাই জাই মং, ব্র্যাকের কমিউনিকেবল ডিজিজ প্রগ্রামের সহযোগী পরিচালক ডা. মাহফুজা রিফাত, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সহসভাপতি নুরুল ইসলাম হাসিবসহ অন্যরা।

 



মন্তব্য