kalerkantho


কাঁপে মেঘনা সেতু, ভয়ে কাঁপে চালক-যাত্রীরাও

পার্থ সারথি দাস, সোনারগাঁ থেকে ফিরে   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



কাঁপে মেঘনা সেতু, ভয়ে কাঁপে চালক-যাত্রীরাও

ভবেরচর ও বিভিন্ন স্থানে থেমে থেমে যাত্রী তুলে মোগড়াপাড়ার দিকে চলছিল গজারিয়া পরিবহনের বাসটি। যাত্রীবোঝাই বাসটি মেঘনা সেতুর ওপর উঠতেই বোঝা গেল সেতুটি দুলে উঠছে। সেতুর মধ্যস্থলে মূল লেনের পাশে আধাঘণ্টা দাঁড়িয়ে দেখা গেল, মিনিটে গড়ে কমপক্ষে ২০টি ভারী যান চলাচল করছে। উভয় দিক থেকে বাস, ট্রাক, ট্রলি, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহন দ্রুতবেগে সেতুতে উঠে আসছে। কম্পনও তীব্র হচ্ছে। আর লম্বা ট্রলি সেতুটি অতিক্রম করতে গেলে দীর্ঘ সময় ধরে কম্পন চলতে থাকে।

রবিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে সেতুর এমন বেহাল দেখা যায়। গাড়িচালক, যাত্রী ও স্থানীয় লোকজন জানায়, সেতুতে গাড়ি ওঠার পর এটি এমনভাবে কেঁপে ওঠে যে অতিক্রম করার আগ পর্যন্ত ভয়ে বুক দুরুদুরু করতে থাকে।  

সেতুর ওপারে পাহারায় ছিলেন মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশের দুই সদস্য। ছিলেন মেঘনা সিকিউরিটি কম্পানির কর্মী জয়ন্ত রায়। জয়ন্ত বললেন, এটা (মধ্যস্থল) সেতুর ডেঞ্জারাস জোন। তবে সেতু সচল রাখতে নিয়মিত মেরামতকাজ চলছে।

মেঘনা সেতু পার হয়ে জামালদীতে অটোরিকশার স্ট্যান্ডে যাওয়ার পর দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকের চালক আরিফ মিয়া বললেন, ‘এই কাঁপাকাঁপি দেখে আগে ভয় লাগত। এখন অবশ্য গা-সওয়া হয়ে গেছে।’

গজারিয়া পরিবহনের বাসের চালকের সহকারী স্বপন মিয়া মহাসড়কের জামালদী অংশ থেকে যাত্রীদের ডেকে ডেকে তুলছিলেন। সেতুর অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে বললেন, ‘ওপরে উঠলেই বিরিজ (সেতু) কাঁপে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলে, নিচ দিয়ে বয়ে চলা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলা, নদীর স্রোত, নৌযানের গতি, সেতুর ওপরে দুই দিক থেকে ট্রলিসহ ভারী গাড়ির চলাচল বেড়ে যাওয়ায় মেঘনা সেতুতে কম্পন বেড়ে গেছে। সেতুটি রক্ষার জন্য সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণকাজ করেছিল। কিন্তু বালু উত্তোলন, অতিরিক্ত গাড়ি ও ভারী গাড়ি নিয়ন্ত্রণ না করলে সেতুটি চরম ঝুঁকিতে পড়বে।

গভীর রাতে বালু উত্তোলন : স্থানীয় লোকজন জানায়, মেঘনা নদীতে সেতুর পিলারসংলগ্ন এলাকাসহ বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে অবাধে বালু উত্তোলন চলে গভীর রাতে। নুনেরটেক, আনন্দবাজার, ভাটিবন্দর, ঝাউচর এবং মেঘনা উপজেলার মৈশারচর, বড়ইয়াকান্দি ও নলচরে এই অপতৎপরতা সবচেয়ে বেশি। ইমরান হোসেন, আলম মিয়াসহ অন্যরা এই কাজে জড়িত।

গত ১০ সেপ্টেম্বর বালু সন্ত্রাসীদের ধরতে দিনভর অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন ও উপজেলা প্রশাসন। সে সময় ইমরান হোসেন ও আলম মিয়াকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা এবং অনাদায়ে ১০ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আর সবুজ মিয়া ও জাবেদ নামের দুজনকে ১০ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযানের মুখে কিছু দিন বন্ধ থাকলেও বালু সন্ত্রাসীরা আবার তৎপর হয়ে উঠেছে।

জানতে চাইলে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীনুর ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বালু উত্তোলনের অপতৎপরতা পুনরায় শুরু হওয়ার বিষয়টি জানি না।’ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বি এম রুহুল আমিন বলেন, ‘আজও (রবিবার) অভিযান চালিয়ে দুটি ড্রেজার জব্দ করা হয়েছে। বালু সন্ত্রাসীদের ধরতে আমরা তৎপর।’

রোজার ঈদের আগে চালু হবে তিন সেতু : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নতুন তিনটি সেতু নির্মাণে সড়ক

ও জনপথ অধিদপ্তর ‘কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ এবং বিদ্যমান সেতু পুনর্বাসন প্রকল্প’ গ্রহণ করেছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে আট হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। বিদ্যমান সেতুর উজানে হচ্ছে চার লেনবিশিষ্ট দ্বিতীয় মেঘনা সেতু। প্রকল্প শেষে মেঘনার দুটি সেতুর লেন হবে ছয়টি।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা আগামী রোজার ঈদের আগে নতুন তিনটি সেতু চালু করব। নতুন মেঘনা সেতুর ঢালাইয়ের কাজ বাকি। এটি চালু হলে বিদ্যমান সেতুটি ছয় মাস বন্ধ রেখে পুরোপুরি মেরামত করা হবে।’

রবিবার মেঘনা সেতুর নিচে ঘুরে দেখা গেছে, একজন পুলিশ সদস্য নৌকায় পাহারা দিচ্ছেন। তবে স্থানীয় লোকজন জানায়, নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হয় গভীর রাতে। তিন সেতু প্রকল্পের পরিচালক নুরুজ্জামান মুন্নার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্প এলাকার নদী থেকে বালু উত্তোলন করতে দেওয়া হয় না। 

নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আলীউল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যত দূর জানি সেতুর অবস্থা ভালো। তবে নতুন তিন সেতু প্রকল্পের আওতায় জাপানি বিশেষজ্ঞরা পুরনো মেঘনা সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ করছেন।’



মন্তব্য