kalerkantho


নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুন মামলায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুন মামলায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

নারায়ণগঞ্জের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‌্যাব-১১-এর সাবেক কর্মকর্তা তারেক সাঈদসহ ১৫ জনকে নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের মামলায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। ৭৮১ পৃষ্ঠা এবং ৭৮৩ পৃষ্ঠার পৃথক দুটি রায় গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। প্রথমটি নারায়ণগঞ্জের নিহত সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটির করা মামলায় এবং দ্বিতীয় রায়টি নিহত নারায়ণগঞ্জ আদালতের আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পালের করা মামলায় দেওয়া রায়।

আলোচিত এই হত্যা মামলাটিতে বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ গত বছর ২২ আগস্ট রায় দেন। ওই দিন আদালত সংক্ষিপ্ত রায় দেন। আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী হাইকোর্টের রায় প্রকাশের পর এখন কারাবন্দি সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা আপিল বিভাগে আপিল করার সুযোগ পাবেন। রায়ের কপি প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে তাঁদের আপিল করতে হবে। যাঁদের সাজা কমানো হয়েছে তাঁদের ক্ষেত্রে ইচ্ছা করলে রাষ্ট্রপক্ষও আপিল করতে পারবে।

রায়ে বলা হয়, এ ধরনের মানবতাবিরোধী ও বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের জন্য একটি কঠিন বার্তা দেওয়া প্রয়োজন; যাতে কেউ ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত করতে না পারে এবং নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে না করতে পারে। এ কারণে তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। রায়ে বলা হয়, ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রমাণ করা সহজ নয়। কারণ অপরাধ সংঘটনের আগ পর্যন্ত পরিকল্পনার তথ্য গোপন রাখা হয়। এ ক্ষেত্রে  এই অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্রে তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (বরখাস্ত) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (বরখাস্ত) মাসুদ রানা (এম এম রানা) এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন জড়িত। অন্যরা হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুম করার অপরাধের সঙ্গে জড়িত।

রায়ে আরো বলা হয়, দণ্ডিতরা যে ধরনের অপরাধ করেছেন তাঁদের যদি উপযুক্ত সাজা দেওয়া না হয়, তাহলে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা তৈরি হবে। রায়ে বলা হয়, দেশের জনগণের নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় র‌্যাবের প্রতি মানুষের যথেষ্ট আস্থা রয়েছে। কিন্তু কতিপয় সদস্যের কারণে সামগ্রিকভাবে গোটা বাহিনীকে দায়ী করা যায় না। কিছু উচ্ছৃঙ্খল র‌্যাব সদস্যের কারণে এ বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল অর্জন ম্লান হয়ে যেতে পারে না।

নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত গত বছর ১৬ জানুয়ারি রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর ওই বছরের ২২ জানুয়ারি নিম্ন আদালত থেকে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য পূর্ণাঙ্গ রায়সহ সব নথি পাঠানো হয়

হাইকোর্টে। পরে কারাবন্দি আসামিরা পর্যায়ক্রমে আপিল করেন। এ আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট গত বছর ২২ আগস্ট রায় দেন।

হাইকোর্টের রায়ে মামলার মূল আসামি সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‌্যাব-১১-এর সাবেক কর্মকর্তা তারেক সাঈদসহ ১৫ জনকে নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। আর ১১ জনকে নিম্ন আদালতের মৃত্যুদণ্ডের সাজার পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া নিম্ন আদালতে ৯ জনকে দেওয়া বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডের রায় বহাল রাখেন হাইকোর্ট। নিম্ন আদালত থেকে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য পাঠানো ডেথ রেফারেন্স ও কারাবন্দি আসামিপক্ষে করা আপিলের ওপর শুনানি শেষে এ রায় দেওয়া হয়। সশস্ত্র বাহিনী বা পুলিশের যেসব সদস্যের সাজা হয়েছে তাঁরা সবাই র‌্যাব-১১-এর সাবেক সদস্য।

হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—র‌্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লে. কর্নেল (বরখাস্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, কম্পানি কমান্ডার মেজর (বরখাস্ত) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (বরখাস্ত) মাসুদ রানা (এম এম রানা), হাবিলদার এমদাদুল হক, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহি আবু তৈয়ব, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দু বালা, সৈনিক আবদুল আলীম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সি, সৈনিক আল আমিন ও সৈনিক তাজুল ইসলাম এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন। এর মধ্যে নূর হোসেন ছাড়া বাকিরা সবাই র‌্যাব-১১-এর সাবেক সদস্য।

যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা হলেন—সৈনিক আসাদুজ্জামান নূর, সার্জেন্ট এনামুল কবীর এবং নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তুজা জামান (চার্চিল), আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দীপু, রহম আলী, আবুল বাশার, সেলিম, সানাউল্লাহ ছানা, ম্যানেজার শাহজাহান ও জামাল উদ্দিন।

এ ছাড়া অন্য যে ৯ জনের সাজা বহাল রাখা হয় তাঁরা হলেন—এএসআই আবুল কালাম আজাদ (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), এএসআই বজলুর রহমান (সাক্ষ্য-প্রমাণ সরানোর দায়ে সাত বছর), এএসআই কামাল হোসেন (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), করপোরাল মোখলেছুর রহমান (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), করপোরাল রুহুল আমিন (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), হাবিলদার নাসির উদ্দিন (সাক্ষ্য-প্রমাণ সরানোর দায়ে সাত বছর), কনস্টেবল বাবুল হাসান (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), কনস্টেবল হাবিবুর রহমান (অপহরণের দায়ে ১০ বছর, সাক্ষ্য-প্রমাণ সরানোর দায়ে সাত বছর) ও সৈনিক নুরুজ্জামান (অপহরণের দায়ে ১০ বছর)।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তখনকার কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, তাজুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান স্বপন ও নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর এবং অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিমকে দিনদুপুরে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সে রাতেই তাঁদের শরীরে নেশাযুক্ত ইনজেকশন পুশ করে এবং শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে প্রতিটি লাশের পেট কেটে ইটভর্তি দুটি বস্তা শরীরে বেঁধে মেঘনার মোহনায় শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। তিন দিন পর লাশ ভেসে উঠলে জানা যায়, সেগুলো অপহৃত সাতজনের লাশ।

ওই ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় আলাদা দুটি হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ নূর হোসেন, তারেক সাঈদসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল আলাদা চার্জশিট দেয়। তবে দুই মামলার অভিযোগপত্রেই আসামি অভিন্ন।

 

 



মন্তব্য