kalerkantho


১১ বছর পর বাড়ি ফিরলেন সিডরে ভেসে যাওয়া শহিদুল!

মহিদুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি    

১৮ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



১১ বছর পর বাড়ি ফিরলেন সিডরে ভেসে যাওয়া শহিদুল!

সিডরে নিখোঁজ হওয়ার ১১ বছর পর ফিরে এসেছেন জেলে শহিদুল মোল্লা (বর্তমান বয়স ৪৮)। পরিবার তাঁর বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিল বহু আগেই। সরকারিভাবে নিখোঁজের তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। কিন্তু হঠাৎ গত সোমবার বিকেলে বাগেরহাটের শরণখোলার আমড়াগাছিয়া বাজারে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় ঘুরতে দেখে তাঁকে শনাক্ত করে পরিবারের লোকজন। এত বছর পর হারানো স্বজনকে ফিরে পেয়ে ওই পরিবারে এখন আবেগ-আনন্দের বন্যা বইছে।

উপজেলার খোন্তাকাটা ইউনিয়নের দক্ষিণ আমড়াগাছিয়া গ্রামের ফুলমিয়া মোল্লার ছেলে শহিদুল তাঁর ছোট ভগ্নিপতি পান্না ফরাজীর নৌকায় পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের ছাপড়াখালী এলাকায় মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। ওই নৌকায় ছিলেন মাসুম, ছিদ্দিক, সেলিমসহ আরো তিন জেলে। ১৫ নভেম্বর সিডরের আঘাতে তাঁরা সবাই ভেসে যান। তাঁর বাবা ফুলমিয়া ছিলেন অন্য মৎস্য ব্যবসায়ী ইউনুচ শিকদারের নৌকায়। তাঁর কোনো খোঁজ মেলেনি আজও।

শনিবার দুপুরে কথা হয় রায়েন্দা বাজারে ভগ্নিপতি পান্না ফরাজীর বাড়িতে থাকা মানসিক ভারসাম্যহীন শহিদুলের সঙ্গে। সিডর কী তা তাঁর স্মরণে নেই। এখন যা বলছেন, একটু পর সে কথা আর মনে করতে পারছেন না। সিডরে কোথায় ছিলেন, কী ঘটেছিল বলতে পারছেন না। তবু তাঁর অসংলগ্ন কথায় যতটুকু জানা গেল, ভারতের পাটগ্রাম নামক এলাকায় রশিদ খানের বাড়িতে থাকতেন। সেখানে গরু রাখা আর বাড়ির কাজকর্ম করতেন। এরপর সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। সীমান্তে তাঁকে কেউ আটকায়নি। এসবও তাঁর ভারসাম্যহীন মনের কথা। সঠিক করে বলতে পারছেন শুধু নিজের নামটাই।

পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি স্বামীকে হারিয়ে চার সন্তান নিয়ে দুর্বিষহ অবস্থায় পড়েন স্ত্রী মাসুমা বেগম। তিনি চার সন্তানের কথা ভেবে চার বছর আগে কাজের সন্ধানে চলে যান ভারতের বেঙ্গালুরুতে। অভাবের সংসারে অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে গেছে মেয়ে পুতুল (২০) ও মুকুলের (১৮)। মাসুম (১৭) হাফেজি পড়ছে। ছোট ছেলে মাসুদ (১১) সিডরের সময় তিন মাসের গর্ভে ছিল তাঁর। স্বামীর ফিরে আসার খবর মোবাইল ফোনে শুনে খুশিতে আত্মহারা মাসুমা বেগম দু-এক দিনের মধ্যেই বেঙ্গালুরু থেকে ফিরে আসবেন বলে জানিয়েছেন।

শহিদুলের বড় বোন মঞ্জু বেগম জানান, তিনি গত সোমবার বিকেল ৩টার দিকে পরিচিতজনের মাধ্যমে খবর পান, আমড়াগাছিয়া বাজারে বেশ কিছুদিন ধরে শহিদুল নামের এক ‘পাগল’ ঘোরাফেরা করছে। তখন তিনি ছুটে যান সেখানে। গিয়ে দেখেন বাসস্ট্যান্ড যাত্রীছাউনিতে ঘুমিয়ে আছেন শহিদুল। তাঁর কপালের বাঁ পাশের কাটা দাগ, হাতের আঙুলে বড়শি ঢুকে ক্ষত হওয়ার চিহ্ন—এসবের মিল দেখেই শনাক্ত করেন ভাইকে। সেখান থেকে উদ্ধার করে বাড়িতে এনে তাঁর লম্বা চুল, দাড়ি কেটে সিডরে হারিয়ে যাওয়া ভাইটিকে আবিষ্কার করেন।

বর্তমানে মানসিক ভারসাম্যহীন শহিদুলকে সেবা-শুশ্রূষা করা হচ্ছে। তাঁর উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। কিন্তু টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা করানো পরিবারের পক্ষে অসম্ভব। বোন মঞ্জু বেগম ভাইকে সুস্থ করে তুলতে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন।



মন্তব্য