kalerkantho


সিলেটে প্রার্থী নিয়ে নানা হিসাব দুই শিবিরেই

সিলেট অফিস   

১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সিলেটে প্রার্থী নিয়ে নানা হিসাব দুই শিবিরেই

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জমজমাট সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গন। মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা দৌড়াচ্ছেন মনোনয়ন নিশ্চিত করতে আর কর্মীদের উৎকণ্ঠা পছন্দের নেতার মনোনয়ন পাওয়া না পাওয়া নিয়ে। সাধারণ ভোটারদের কৌতূহলও কম নয়। কে জেতেন মনোনয়ন-দৌড়ে, তা নিয়ে আগাম বিশ্লেষণে ব্যস্ত অনেকে। সিলেটের সব কটি আসনেই বড় দুই দলে প্রার্থীর ছড়াছড়ি। সিলেট-৩ ও ৬ আসনেই শুধু আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কিনেছেন ২৪ জন। বিএনপিতেও আসনপ্রতি মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা কম নয়। বড় দুটি দলেই মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ভিড়ে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছেন শরিক দলগুলোর প্রার্থী হতে ইচ্ছুক নেতারা। এ ক্ষেত্রে কোনো আসনই কণ্টকমুক্ত নয়। নির্বাচনের মূল লড়াইয়ে নামার আগে তাদের রীতিমতো স্নায়ুযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

মর্যাদাপূর্ণ সিলেট-১ আসনে এখনো সব শিবিরেই সম্ভাব্য একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন পাঁচজন। তাঁরা হলেন বর্তমান সংসদ সদস্য আবুল মাল আবদুল মুহিত, তাঁর ছোট ভাই জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে আব্দুল মোমেন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। তাঁদের মধ্যে কে শেষ পর্যন্ত নৌকার টিকিট পাচ্ছেন, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে। তবে আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত মনোনয়ন-দৌড়ে এগিয়ে আছেন এ কে আব্দুল মোমেন। এ আসনে শরিক দলের প্রার্থী নিয়ে আওয়াম লীগের মাথাব্যথা নেই, যদিও মাঝখানে জোর গুঞ্জন ছিল বিকল্পধারা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হলে সিলেট-১ আসনে জোটের প্রার্থী হতে পারেন সমশের মবিন। তবে আওয়ামী লীগের একটি সূত্রে জানা গেছে, সমশের মবিনকে সিলেট-৬ আসনে মনোনয়ন দেওয়ার চিন্তা চলছে।

সিলেট-১ আসনে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নানা হিসাব-নিকাশে দুলছে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের স্বপ্ন। দলটির মনোনয়ন ফরম কিনেছেন প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ইনাম আহমদ চৌধুরী, দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, দলের কেন্দ্রীয় সদস্য ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সহসভাপতি ও সিটি কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ ডা. আরিফ আহমেদ মোমতাজ রিফা। তাঁদের মধ্যে আপাতত এগিয়ে আছেন ইনাম আহমদ চৌধুরী ও খন্দকার মুক্তাদির, যদিও এখানে আরো হিসাব-নিকাশের বিষয় থেকে যাচ্ছে। গুঞ্জন আছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান দলের হাল ধরতে দেশে ফিরলে নিজের পিতৃভূমি সিলেটের এই আসন থেকে নির্বাচন করতে পারেন, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে সম্ভাবনা ক্ষীণ হচ্ছে।

সিলেট-২ আসনে প্রার্থী নিয়ে বিএনপির তেমন ঝামেলা নেই। দলটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লোনার মনোনয়ন বলা চলে বছর কয়েক আগে থেকেই নিশ্চিত হয়ে আছে, যদিও এখানে ২০ দলীয় জোটের শরিক দল খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মো. মুনতাসির আলী দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। কিন্তু তাঁর মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং শেষ মুহূর্তে তাহসিনা রুশদীর জায়গায় তাঁর ছেলে ব্যারিস্টার আবরার ইলিয়াস অর্ণব প্রার্থী হয়ে চমক দেখাতে পারেন।

এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত করা নিয়ে নানা হিসাব চলছে। দলের ছয় নেতা মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থী ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়াকে আসন ছেড়ে দিয়েছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী। এবার তিনি ছাড় দিতে নারাজ। তাঁর পাশাপাশি মনোনয়ন ফরম কিনেছেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ড. তৌফিক রহমান চৌধুরী, জেলা আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক জগলু চৌধুরী, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের মুহিত আলী মিঠু ও কাজী মো. শাহজাহান। এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির ইয়াহইয়া চৌধুরী এবারও মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি সিলেট-৩ আসনেরও মনোনয়ন ফরম কেনায় ধারণা করা হচ্ছে, তাঁকে সিলেট-২ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কে পাচ্ছেন তা নিয়ে শুধু পুরো সিলেটের মানুষের কৌতূহল রয়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এ আসনে প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন শফিকুর রহমান চৌধুরী।

সিলেট-৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েস এবার পড়েছেন প্রতিরোধের মুখে। সিলেট-১ আসন ছাড়াও এ আসনে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। এ ছাড়া দক্ষিণ সুরমা উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আবু জাহিদ, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বাছিত টুটুল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ মুজিবুর রহমান জকন, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট আব্দুর রকিব মন্টু, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের মনির হোসেন ও সাইফুল আলম রুহেলও মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। এ আসনে জাতীয় পার্টির ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া মনোনয়ন-দৌড়ে রয়েছেন। তবে তাঁকেও লড়তে হচ্ছে নিজ দলের আরো দুই প্রার্থীর সঙ্গে। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আতিকুর রহমান আতিক এবং জেলার সদস্যসচিব মো. উসমান আলীও মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। সরকারি দল ও জাপার একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এ আসনে মনোনয়ন-দৌড়ে এগিয়ে আতিকুর রহমান আতিক।

এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন ফরম কিনেছেন দলের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এম এ হক, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য শফি চৌধুরী ও যুবদলের সাবেক সহসভাপতি আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী। ২০ দলের শরিক খেলাফত মজলিসের মো. দিলওয়ার হোসেনও প্রার্থী হতে চান। শেষ খবর অনুযায়ী মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আছেন ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম।

সিলেট-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ এবারও দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। তবে তাঁর সঙ্গে দলীয় মনোনয়নের লড়াইয়ে নেমেছেন আরো ছয়জন। তাঁরা হলেন জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহফুজ আহমদ, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক আহমদ, গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম কিবরিয়া হেলাল ও গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ফজলুল হক। তবে ইমরান আহমদই এগিয়ে রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন ফরম কিনেছেন উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য দিলদার হোসেন সেলিম, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতা অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান সেলিম ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট শামসুজ্জামান জামান। এ পর্যন্ত দলের মনোনয়ন-দৌড়ে এগিয়ে আছেন আবদুল হাকিম চৌধুরী।

নির্বাচন না করার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন সিলেট-৫ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হাফিজ আহমদ মজুমদার। তবে এ আসনে দলের মনোনয়ন চান জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মাসুক উদ্দিন আহমদ, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আহমদ আল কবীর, অ্যাডভোকেট মোস্তাক আহমদ, মহানগর কৃষক লীগের সভাপতি আব্দুল মোমিন চৌধুরী, ঢাকার রমনা-শাহবাগ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল মুনির চৌধুরী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ফয়সল আহমদ রাজ। জাপার মনোনয়ন কিনেছেন পাঁচজন। তাঁরা হলেন বর্তমান সংসদ সদস্য সেলিম উদ্দিন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সাব্বির আহমদ, জাপার কেন্দ্রীয় সদস্য সাইফুদ্দিন খালেদ, এম জাকির হোসেইন ও এম এ মতিন চৌধুরী। আওয়ামী লীগ আসনটি জাতীয় পার্টির সেলিম উদ্দিনকে ছেড়ে দেবে বলে খবর পাওয়া গেছে।

এ আসনে বিএনপির সাত নেতা মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। তাঁরা হলেন জকিগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি ইকবাল আহমদ তাপাদার, জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশীদ চাকসু মামুন, জকিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শরিফ আহমদ লস্কর, ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ছিদ্দিকুর রহমান পাপলু, আরব আমিরাত বিএনপির সভাপতি জাকির হোসাইন, যুক্তরাজ্য স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদুর রহমান ও কানাইঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। জানা গেছে, আসনটি জামায়াত নেতা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীকে ছেড়ে দিচ্ছে বিএনপি।

সিলেট-৬ আসনে এবারও দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তবে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন আরো ১৩ নেতা। তাঁরা হলেন কানাডা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সরওয়ার হোসেন, বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের সহসভাপতি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ডেইজী সারওয়ার, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খান, গোলাপগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র জাকারিয়া আহমদ পাপলু, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য অ্যাডভোকেট এ এফ মো. রুহুল আনাম চৌধুরী মিন্টু, বিয়ানীবাজার উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কাসেম পল্লব, লন্ডন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আফসার খান সাদেক, ফ্রান্স আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা চৌধুরী সালেহ আহমদ, নিউ জার্সি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিক উদ্দিন, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক শামসুল ইসলাম বাচ্চু, গোলাপগঞ্জ উপজেলা তাঁতী লীগের আহ্বায়ক হেলাল আহমদ চৌধুরী ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা জাকির হোসাইন। সিলেটের এ আসনে দলের সর্বোচ্চ ১৪ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও বিকল্পধারা জোটে যোগ দিলে আসনটি ছেড়ে দিতে পারে আওয়ামী লীগ। এ ক্ষেত্রে সমশের মবিন চৌধুরী এ আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন।

এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেন জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাহের শামীম, জেলা কমিটির সদস্য ফয়সল আহমদ চৌধুরী, জেলা বিএনপির উপদেষ্টা মাওলানা রশীদ আহমদ, জাসাসের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অভিনেতা হেলাল খান ও মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আজমল বখত সাদেক। জামায়াতের মাওলানা হাবিবুর রহমানও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। তবে এখন পর্যন্ত বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি ফয়সল আহমদ চৌধুরীর।



মন্তব্য