kalerkantho


ফোক ফেস্ট শুরু

লোকসংগীতে প্রাণের জোয়ার

নওশাদ জামিল   

১৬ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



লোকসংগীতে প্রাণের জোয়ার

রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে গতকাল ফোক ফেস্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশনা। ছবি : কালের কণ্ঠ

স্বর্গীয় অনুভূতির অন্য নাম সংগীত। সংগীতের মূর্ছনা ভালো করে দেয় বিক্ষিপ্ত মন, জুড়িয়ে দেয় প্রাণ। অন্তরাত্মা হয় পরিশুদ্ধ। সংগীতের আছে নানা ধারা। তার মধ্যে অন্যতম লোকসংগীত। শিকড়সন্ধানী এ গান সহজেই স্পর্শ করে যায় হৃদয়ের গহিনে। মরমী সাধকদের মানবতা আর আধ্যাত্মবাদী দর্শনের বাণীসমৃদ্ধ শব্দতরঙ্গে আলোড়িত হয় শ্রোতার প্রাণ। গতকাল বৃহস্পতিবার অগ্রহায়ণের সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত লোকসংগীতের উৎসবে দেখা গেল প্রাণের জোয়ার। সুর-সমুদ্রে অবগাহন করল কয়েক হাজার সংগীতপ্রেমী।

রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে গতকাল শুরু হয়েছে লোকসংগীতের মহা আসর ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসব। তিন দিনের এ উৎসবের পোশাকি নাম ‘ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট’। সান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ ও সান কমিউনিকেশনের আয়োজনে মেরিল নিবেদিত এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড, গ্রামীণফোন ও রাঁধুনী।

লোকজ আঙ্গিকের কণ্ঠসংগীতের সঙ্গে যন্ত্রসংগীত ও লোকনৃত্যে সজ্জিত ফোক ফেস্টে অংশ নিচ্ছেন সাতটি দেশের দেড় শতাধিক শিল্পী ও কলাকুশলী। লোকসংগীতের এই উৎসবে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের লোকগানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোকজ বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনা। লোকগানের সুরে লোকনৃত্যের পরিবেশনা উৎসবে এনেছে ভিন্ন মাত্রা। উদ্বোধনী দিনের পরিবেশনায় অংশ নেন বাংলাদেশ, ভারত ও পোল্যান্ডের শিল্পীরা।

উৎসবের প্রথম দিনে গতকাল বিকেল থেকেই আর্মি স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে আসতে থাকে সংগীতপ্রেমীরা। সুরের কাছে সমর্পিত গানপ্রেমীদের আগমনে উৎসব প্রাঙ্গণটি যেন হয়ে ওঠে মহাসংগীতযজ্ঞ। সুরের মায়াজালে ঘুচে গিয়েছিল বয়সের সীমারেখা। হাজারো শ্রোতার আগমনে প্রথম রাতটি হয়ে গেল অনবদ্য। চারপাশে বিরাজ করেছে শুধুই সুন্দরের আবহ। রাত যত গড়িয়েছে, বেড়েছে শ্রোতা।

প্রথম দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শুরু হয় উৎসবের প্রথম দিনের আয়োজন। শুরুতেই মঞ্চে আসে নাচের দল ভাবনা। দলটির প্রধান সামিনা হোসেন প্রিমার পরিচালনায় ৫৩ জন নৃত্যশিল্পী একসঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন। জনপ্রিয় লোকগান ‘সোহাগ চাঁদ বদনি’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে দলটি। এরপর ছিল রাঙামাটি অঞ্চলের আদিবাসী নৃত্যের পরিবেশনা। ভাবনার নৃত্য পরিবেশনা শেষ হয় রণনৃত্য রায় বেশে নৃত্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। প্রতিটি পরিবেশনায় মুগ্ধ করে দর্শকশ্রোতাদের।

দ্বিতীয় শিল্পী হিসেবে মঞ্চে আসেন মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ানের শিষ্য নারায়ণগঞ্জের আবদুল হাই দেওয়ান। গুরু তাঁকে উপাধি দিয়েছেন ‘হাফ মাতাল’। দরাজ গলার শিল্পী গেয়ে শোনান ‘মা গো মা জি গো জি/পড়লাম কি রঙ্গে/ভাঙ্গা নৌকা বাইতে আইলাম গাঙ্গে’, ‘তুই বড় রঙ্গিলা বাওয়াইরে, বাওয়াই কতই জাদু জানো’, ‘বাজার ভালো না গো বন্ধু, বাজার ভালো না’, ‘কোনবা দেশে রইলা দয়াল’ ‘বন্ধু রে তোর জ্বালায়া বাঁচি না’ ও ‘তোমারও লাগিয়া রে বন্ধু’।

এরপর ছিল চতুর্থবারের মতো আয়োজিত ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসবের উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা। এতে অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সান ফাউন্ডেশন ও সান কমিউনিকেশনস লিমিটেডের চেয়ারম্যান অঞ্জন চৌধুরী, ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এবং গ্রামীণফোনের ডেপুটি সিইও ও সিএমও ইয়াসিন আযমান।

এরপর মধ্য ইউরোপের সালসা, জিপসি গানে প্রায় এক ঘণ্টা মাতিয়ে রাখে পোল্যান্ডের গানের দল ‘দিকান্দা’।  সেখানকার খ্যাতিমান এই লোকগানের দলটি কুর্দি, বেলারুস, ইসরায়েল অঞ্চলের সুরকে ধারণ করেছে। বলকান ও জিপসি ধারাকে তারা বেছে নিলেও গানে ব্যবহার করে তাদের একেবারেই নিজস্ব কিছু শব্দ। ক্ল্যাসিকাল গিটার, বেহালা, চেলো সহযোগে তারা আদি অকৃত্রিম সুরের সঙ্গে নানা আবেগের প্রকাশে গান করে মাতিয়ে রাখেন শ্রোতাদের। দলপ্রধান আনিয়া উইটযাক গাওয়ার পাশাপাশি অ্যাকোর্ডিয়ান বাজিয়ে শোনান। দলটির অন্যদের মধ্যে কণ্ঠে ছিলেন কাসিয়া বগুশ, পারকাশনে ছিলেন দানিয়েল কাচমারযিয়েক, ক্ল্যাসিকাল গিটারে পিওত্র রেইদাক, ডাবল বেসে যেগরযশ কলব্রেচকি, ট্রাম্পেটে সিমন বব্রস্কি এবং ভায়োলিনে ছিলেন আন্দ্রে ‘ফিস’ ইয়ারযাবেক।

এরপর মঞ্চে আসেন ভারতের শিল্পী সাত্যর্কী ব্যানার্জি। দোতারা, সরোদ, ওউদ, রিভাব যন্ত্রযোগে তিনি বাউল, কীর্তন থেকে শুরু করে শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশন করে মাতিয়ে রাখেন শ্রোতাদের। 

প্রথম দিনের শেষ পরিবেশনা ছিল ভারতের পাঞ্জাবের ওয়াদালি ব্রাদার্সের লোকজ গানের ঢংয়ে সুফি গানের পরিবেশনা। বংশের পঞ্চম পুরুষ হিসেবে ওস্তাদ পূরণচন্দ্র ওয়াদালি ও পেয়ারেলাল ওয়াদালি ভ্রাতৃদ্বয় ভারতের সুফি সংগীতে সমাদৃত।



মন্তব্য