kalerkantho


ইকোনমিক ক্যাডার প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত

৪১তম বিসিএস থেকে থাকছে না আর

আরিফুর রহমান   

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ইকোনমিক ক্যাডার প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত

বিলুপ্ত হলো বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডার। ১৯৮৫ সালে তৈরি হওয়া ইকোনমিক ক্যাডার বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এসংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। একীভূত হওয়ার ফলে এখন থেকে ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রশাসন ক্যাডারের মতো সমান সুবিধা পাবেন। প্রশিক্ষণ আর যোগ্যতা থাকলে বিলুপ্ত ক্যাডারের কর্মকর্তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা প্রশাসকও হতে পারবেন।

ইকোনমিক ক্যাডারদের পদবিও পরিবর্তন হয়ে যাবে। এই ক্যাডারের একজন কর্মকর্তার সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় পদবি ছিল সহকারী প্রধান। সেটি এখন থেকে হবে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তার মতো সহকারী সচিব। তেমনিভাবে পরের পদবিগুলোরও পরিবর্তন হবে। সিনিয়র সহকারী প্রধানের পরিবর্তে সিনিয়র সহকারী সচিব, উপপ্রধানের পরিবর্তে উপসচিব, যুগ্ম প্রধানের পরিবর্তে যুগ্ম সচিব এবং বিভাগ প্রধানের পরিবর্তে অতিরিক্ত সচিব।

৩৫ বছর ধরে এই ক্যাডার চালু ছিল। বিলুপ্ত হওয়ার ফলে আগামী ৪১তম বিসিএস থেকে ইকোনমিক ক্যাডার আর থাকছে না। ফলে ক্যাডারের সংখ্যা ২৭ থেকে কমে এখন ২৬-এ দাঁড়াল। এর আগে, নব্বইয়ের দশকে সচিবালয় ক্যাডার প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত হয়েছিল। আর ২০১৬ সালে বিনিয়োগ বোর্ড ও বেসরকারীকরণ কমিশন বিলুপ্ত করে গঠন করা হয় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)।

ইকোনমিক ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁদের মোট কর্মকর্তা আছেন ৪৬৪ জন। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা আছেন চার হাজার ৮৪৫ জন। দুই ক্যাডার একীভূত হওয়ার ফলে এখন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তার সংখ্যা দাঁড়াল পাঁচ হাজার ৩০৯।

গতকাল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিপিএ এক অধিশাখা থেকে জারি করা গেজেটে বলা হয়েছে, উন্নয়ন বাজেট অধিকতর গতিশীল ও জনবান্ধব প্রশাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সার্ভিস (রি-অর্গানাইজেশন অ্যান্ড কন্ডিশনস) অ্যাক্ট ১৯৭৫-এর ৪ নম্বর সেকশনের প্রদত্ত ক্ষমতাবলে দুই ক্যাডারকে একীভূত করার আদেশ জারি করা হয়েছে। এই আদেশ বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ক্যাডার এবং বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (ইকোনমিক) ক্যাডার একীভূত আদেশ ২০১৮ নামে অভিহিত হবে।

গেজেটে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সমন্বিত মেধাতালিকা অনুসারে পুলে যোগদানকারী বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা স্ব স্ব ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্ধারণ হবে। আরো বলা হয়েছে, সরকার কর্তৃক গঠিত আন্ত মন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী একীভূত ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সমপদে পদায়ন, জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ ও একীভূতকরণের সব প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হবে। এই আদেশ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যাখ্যা অথবা এই আদেশে উল্লিখিত হয়নি এরূপ কোনো বিষয়ে আদেশের প্রয়োজন হলে সরকার ব্যাখ্যা অথবা প্রয়োজনীয় আদেশ দিতে পারবে।

জানতে চাইলে জনপ্রশাসনসচিব ফয়েজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন থেকে ইকোনমিক ক্যাডার আর থাকছে না। দুই ক্যাডারকে একীভূত করতে যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, এখন সে কমিটি কাকে কোথায় পদায়ন করা যায় সেসব বিষয় দেখবে। বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারা ইউএনও, ডিসি হতে পারবেন। তবে যুগ্ম প্রধান থেকে ওপরের পদে যাঁরা কর্মরত ছিলেন, তাঁরা পারবেন না।

ইকোনমিক ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী জাহাঙ্গীর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে উভয় ক্যাডারের মধ্যে এত দিন যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে।’

এদিকে গতকাল প্রকাশিত প্রজ্ঞাপন দেখে সন্তুষ্ট হতে পারেননি বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদন করা সংক্ষিপ্তসার, সচিব কমিটির সিদ্ধান্ত এবং দুই ক্যাডারের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি প্রজ্ঞাপনে। উদাহরণ দিয়ে এক কর্মকর্তা জানান, গত বছর ৩০ মে সচিব কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত ছিল, বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডার ও প্রশাসন ক্যাডার একীভূত করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস  প্রশাসন ক্যাডার পুনর্গঠন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়া সংক্ষিপ্তসারের ১২ ক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, বিসিএস প্রশাসন ও ইকোনমিক ক্যাডার একীভূত করে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার পুনর্গঠন করা যায়। আর সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছিল, দুই ক্যাডারের কর্মকর্তারা পুনর্গঠিত ক্যাডারের সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন। কিন্তু গতকাল প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে কোথাও পুনর্গঠন শব্দটি উল্লেখ নেই। এখন মনে হবে, ইকোনমিক ক্যাডার প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে মিলে গেল। ফলে দুই ক্যাডারের একীভূত হওয়ার যে স্পিরিট ছিল, সেটির প্রতিফলন ঘটেনি।

বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের উন্নয়ন বাজেটের আকার ছিল অনেক ছোট। মূলত উন্নয়ন বাজেটের আকার বাড়তে থাকে আশির দশক থেকে। উন্নয়ন বাজেট তৈরির পরিকল্পনা, প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়নের জন্য ১৯৮৫ সালে ইকোনমিক ক্যাডার তৈরি করা হয়। একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ক্যাডার গঠিত হলেও তাঁরা বছরের পর বছর ধরে বৈষম্যের শিকার হয়ে এসেছেন। তাঁদের পদোন্নতি হচ্ছিল না। গাড়ি সুবিধা নেই। তাঁদের ক্যাডারে গ্রেড ওয়ান পদও  ছিল না। পদের নাম নিয়েও তাঁদের বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়। তাই তাঁরা ১৯৯৬ সাল থেকে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত হওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ২২ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর দাবি পূরণ করায় তাঁরা খুশি হলেও প্রজ্ঞাপনে একীভূত হওয়ার মূল স্পিরিট আসেনি। প্রজ্ঞাপনে যেভাবে বলা হয়েছে, তাতে ভবিষ্যতে তাঁদের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি না হওয়ার শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ।

 



মন্তব্য