kalerkantho


রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিত করতে বলল জাতিসংঘ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিত করতে বলল জাতিসংঘ

ফাইল ছবি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিত করতে এবার বাংলাদেশকে আহ্বান জানালেন খোদ জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রধান মিশেল ব্ল্যাশেলেট। আগামীকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর প্রাক্কালে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেনেভা থেকে এক বিবৃতিতে তিনি এ আহ্বান জানান।

এর আগে গত সোমবার জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো অনুকূল পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি। গত সপ্তাহে মিয়ানমারে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল ৎসপোর্টিয়ার (বিশেষ দূত) ইয়াংহি লিও একই কারণ দেখিয়ে প্রত্যাবাসন উদ্যোগ স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সর্বশেষ গতকাল সন্ধ্যায় প্রত্যাবাসন উদ্যোগ স্থগিত করার আহ্বানটি এলো জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রধানের কাছ থেকে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, প্রত্যাবাসন উদ্যোগের প্রতি চীন ও ভারতের সমর্থন রয়েছে। তারা চায় দ্রুত প্রত্যাবাসন শুরু হোক। বাংলাদেশও চাচ্ছে প্রত্যাবাসন শুরু করতে। ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী গতকাল নয়াদিল্লিতে ৬০ জনেরও বেশি বিদেশি কূটনীতিককে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্ল্যাশেলেট বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রত্যাবাসনে রোহিঙ্গাদের জীবন ও স্বাধীনতা চরম ঝুঁকিতে পড়বে। প্রত্যাবাসন উদ্যোগটিই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।

মিয়ানমারে নাজুক পরিস্থিতির তথ্য তুলে ধরে মিশেল ব্ল্যাশেলেট বলেন, তাঁর দপ্তর এখনো রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের হত্যা, গুম ও গ্রেপ্তারের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের ওপর চলাফেরা ও অন্যান্য বিধিনিষেধ অব্যাহত আছে। এক লাখ ৩০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বাস্তুচ্যুত শিবিরে আছে। এ ছাড়া শূন্য রেখায় প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা আছে। তাদের স্বাধীনতা ও চলাফেরার ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধ আছে।

আগামীকাল (১৫ নভেম্বর) বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে। প্রথম ধাপে দুই হাজার ২৬০ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন ১৫০ জন করে ১৫ দিনে এসব রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো হবে।

কিন্তু প্রত্যাবাসনের তালিকায় থাকা রোহিঙ্গারা ফিরতে চাচ্ছে না। তাদের বেশির ভাগই মিয়ানমারে তাদের স্বজনদের হত্যা ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া দেখেছে। অনেকে মিয়ানমারে না ফিরে আত্মহত্যা করার হুমকি দিচ্ছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রধান বাংলাদেশকে সতর্ক করে বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর নিকৃষ্টতম নৃশংসতা মানবতাবিরোধী অপরাধ এমনকি গণহত্যা বলেও আশঙ্কা করা হয়। এমন প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর অর্থ তাদের আবার সহিংসতা ও নিপীড়নের মধ্যে ঠেলে দেওয়া। তিনি মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গাদের ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের ওপর ধারাবাহিক নিপীড়ন বন্ধ করার মাধ্যমে আন্তরিকতা দেখানোর আহ্বান জানান।

আন্তর্জাতিক মান, অনুকূল পরিবেশ, স্বচ্ছতা নিরাপত্তা ও মৎসদা নিশ্চিতের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন করতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস অব্যাহত সহিংসতা, লড়াই ও প্রত্যাবর্তনে ভরপুর। এই চক্রের পুনরাবৃত্তি বন্ধে আমাদের এক সুরে কথা বলা প্রয়োজন।’

নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে গত সোমবার সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন উঠেছিল, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফেরার পর পরিস্থিতি অনুকূল মনে না করলে আবারও বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে পারবে কি না। জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিবের উপমুখপাত্র ফারহান হক বলেন, এটি মিয়ানমার সরকারের বিষয়। নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা—ইউএনএইচসিআর মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করছে।

দিল্লিতে ব্রিফিং: রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে নয়াদিল্লিভিত্তিক দূতাবাসগুলোর ৬০ জনেরও বেশি কূটনীতিককে ব্রিফিংকালে বাংলাদেশের পক্ষে হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী এ আহ্বান জানান। প্রায় এক ঘণ্টার ওই ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা পরিস্থিতিও তুলে ধরার পাশাপাশি আগামীকাল বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে ওআইসি ও ইইউয়ের আনা ‘মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রস্তাবে বাংলাদেশ সমর্থন প্রত্যাশা করে। এরই মধ্যে ৯৯টি দেশ ওই প্রস্তাবে সহসমর্থক হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটকে অন্যতম ভয়াবহতম সংকট হিসেবে উল্লেখ করে হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বলেন, মিয়ানমারের সৃষ্টি করা এ সংকটের চাপ বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে। মিয়ানমারের ওপর অব্যাহত ও টেকসই আন্তর্জাতিক চাপ এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে অনুঘটক হবে।

গত বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে ‘মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমান পরিস্থিতি’ শীর্ষক একটি প্রস্তাবের পক্ষে ১৩৫টি এবং বিপক্ষে ১০টি দেশ ভোট দিয়েছিল। এ ছাড়া ২৬টি দেশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল।

হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করার পরিকল্পনার কথাও বিদেশি কূটনীতিকদের জানান। তিনি বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে সমঝোতার আওতায় এবং ইউএনএইচসিআরের তত্ত্বাবধানে এ প্রত্যাবাসন শুরু হবে।

হাইকমিশনার বলেন, ‘এটি একটি প্রতীকী প্রত্যাবাসন ও মিয়ানমারের জন্য পরীক্ষা।’

এদিকে প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম আছে, এমন রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের শিবির থেকে পালাচ্ছে—বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের এমন প্রতিবেদন প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক গতকাল ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর কাছে এমন কোনো তথ্য নেই।

 



মন্তব্য