kalerkantho


সিলেট-১ আসনে নৌকা কার?

ইয়াহইয়া ফজল   

১৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সিলেট-১ আসনে নৌকা কার?

সংসদীয় আসনগুলোর মধ্যে সিলেট-১ আসন আলাদা গুরুত্ব পায় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে। দীর্ঘদিনের মিথ হচ্ছে, এ আসনে যে দল জয়ী হয় সেই দলই সরকার গঠন করে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই মিথের পাশাপাশি বরাবরই হেভিওয়েট প্রার্থীরা এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন। এবার মূল লড়াই শুরুর আগেই নিজেদের মধ্যে মনোনয়নযুদ্ধ জমে উঠেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে। বর্তমান সংসদ সদস্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছাড়াও সাবেক নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন, অর্থমন্ত্রীর ছোট ভাই জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. এ কে আব্দুল মোমেন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহউদ্দিন সিরাজ আগেই মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। সর্বশেষ গত রবিবার সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান মনোনয়ন ফরম কেনার পর আলোচনা জমে উঠেছে। সবার মধ্যেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, কে হচ্ছেন মর্যাদাপূর্ণ সিলেট-১ আসনে নৌকার মাঝি।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী তাঁর ভাই ড. এ কে আব্দুল মোমেন কোনো কারণে মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হলে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। অর্থাৎ তাঁদের দুজনের মধ্যে একজন সরে দাঁড়াবেন। কিন্তু এর পরও মনোনয়ন দৌড়ে থাকবেন চার প্রার্থী। ফলে শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে জুটবে নৌকা প্রতীক, তা নিয়েই সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ আর আলোচনার ঝড় বইছে সিলেটে।

গুরুত্বপূর্ণ এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আবুল মাল আবদুল মুহিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলে আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন। সে ক্ষেত্রে তাঁর ছোট ভাই সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. এ কে আব্দুল মোমেন এ আসনে নির্বাচন করবেন বলেও সিলেটে একাধিক সভা-সমাবেশে তিনি বলেছেন। ২০১৬ সালের শেষের দিকে সিলেটের কবি নজরুল অডিটরিয়ামে দলের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী তাঁর বয়স হয়েছে জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি আর নির্বাচন করব না।’ এ সময় তিনি তাঁর ছোট ভাইকে সিলেটবাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দল চাইলে ড. এ কে আব্দুল মোমেন সিলেট-১ আসনে নির্বাচন করবেন।’ এরপর ২০১৭ সালের মে মাসে অর্থবছরের বাজেট তৈরির কাজ শেষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, ‘ভালোয় ভালোয় আর একটি বছর, তারপর অবসর, তবে...।’ ওই সময় এ আসনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রার্থী হবেন বলে গুঞ্জন উঠলে তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া এ আসনে নির্বাচন করলে তিনিও নির্বাচন করবেন। একই বছরের ৯ জুন সিলেট সদর উপজেলা পরিষদে এক অনুষ্ঠান শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘আমি আছি, তবে ভোটে দাঁড়াব কি না সেটা পরে দেখা যাবে।’ পরে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদও ব্যক্ত করেন।

গত ২৪ অক্টোবর জাতীয় সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘আর সংসদ নির্বাচন করব না। আমি আপনাদের কাছে দোয়া চাই। মানুষের দোয়াই আমাকে উৎসাহিত করেছে। আমি অবসরে যাচ্ছি, এটা ঠিক। তবে চলে যাচ্ছি না। সংশ্লিষ্ট থাকব।’

তবে ৩১ অক্টোবর সিলেট-১ আসন থেকে আবারও নির্বাচন করার ইঙ্গিত দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এদিন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি আসন্ন সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কথা বলেছিলাম। কিন্তু পরিবর্তিত সার্বিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ ৮ নভেম্বর সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনে দাঁড়াব না, ইটস মাই ডিসিশন। তবে আমি ডামি ক্যান্ডিডেট হিসেবে মনোনয়ন ফরম সাবমিট করব, যদি কোনো কারণে আমার ক্যান্ডিডেট যে হবে সে যদি মিস করে যায়, তাহলে আমাকে দাঁড়াতে হবে।’

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রথমবার নির্বাচন না করার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর ছায়া সঙ্গী হয়ে আছেন তাঁর ভাই ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বিশেষ করে সিলেটে যেখানেই সভা-সমাবেশ বা অনুষ্ঠানে যান অর্থমন্ত্রী, ভাই ড. মোমেন তাঁর সঙ্গে থাকেন। তা ছাড়া প্রায় তিন বছর ধরে ড. মোমেন মাঠপর্যায়েও কাজ করছেন।

গত শুক্রবার অর্থমন্ত্রীর পক্ষে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন তাঁর ছেলে সাহেদ মুহিত। পাশাপাশি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন তাঁর ছোট ভাই ড. এ কে আব্দুল মোমেনও। জানা গেছে, ড. মোমেনকে মনোনয়ন ফরম কেনার জন্য ৩০ হাজার টাকা দেন বড় ভাই অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত দুই ভাইয়ের মধ্যে কে থাকেন মনোনয়ন লড়াইয়ে।

অন্য দিকে প্রায় দুই বছর ধরে সিলেট-১ আসনের প্রার্থিতার আলোচনায় রয়েছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও আইনসচিব মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন। নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে রাজনীতির মাঠে নামার ঘোষণা দেন তিনি। সিলেট আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। সিলেটে নিয়মিত আসা-যাওয়ার মধ্যে রয়েছেন তিনি। তিনি সিলেটে এলে নগরের কাজিটুলায় তাঁর বাসায় গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা ভিড় জমান। একই সঙ্গে সিলেট আওয়ামী লীগের একটি অংশ তাঁকে প্রার্থী হিসেবে চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে এবার সিলেট-১ আসন থেকে প্রার্থী হতে চান সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার। গত শুক্রবার বিকেলে তাঁর পক্ষে দলীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়ন ফরম কেনেন তাঁর ছেলে রুবাইয়াত ছহুল ও ভাতিজা সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর দেলোয়ার হোসেন সজিব। আর এই মনোনয়ন ফরম ক্রয়ের মধ্য দিয়ে নির্বাচনে নামার বিষয়টি স্পষ্ট করলেন মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন। তাঁর ভাতিজা দেলোয়ার হোসেন সজিব বলেছেন, ‘নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতিতে নামতে চান ছহুল হোসাইন। এ কারণে তাঁর পক্ষে আমরা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছি।’

মর্যাদাপূর্ণ সিলেট-১ আসনের মনোনয়ন ফরম এবার সবার আগে কিনেছেন আওয়ামী লীগের ময়মনসিংহের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা বারের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। প্রথম দিনই তিনি দলীয় কার্যালয় থেকে দুটি মনোনয়ন ফরম কেনেন। সিলেট-১ আসন ছাড়াও তিনি সিলেট-৩ আসন থেকে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। অর্থমন্ত্রীর বিরোধী বলয়ের  লোক মিসবাহ সিরাজ। প্রায় ১০ বছর ধরে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর টানাপড়েন চলছে। ২০১৪ সালেও তিনি এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অর্থমন্ত্রী এখানে নির্বাচন করায় তিনি সে সুযোগ পাননি। পরে সিলেটের আলিয়া মাদরাসা মাঠে আওয়ামী লীগের বিভাগীয় কর্মী সম্মেলন মঞ্চে অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তিনি বক্তৃতায় সিলেট-১ আসন থেকে লড়াইয়ের ইচ্ছার কথা জানান। এ সময় তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি মানুষের অধিকার আদায়ে। এবার জনপ্রতিনিধি হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই।’

এই চার প্রার্থী সিলেট-১ আসনে নির্বাচনের বিষয়ে প্রকাশ্যে তৎপর থাকলেও সিটি করপোরেশনের একাধিকবারের নির্বাচিত সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের আগ্রহের বিষয় তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যেই অনেকটা সীমাবদ্ধ ছিল। মূলত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই সিটি করপোরেশন নির্বাচন থাকায় মেয়র পদে লড়ার জন্য তিনি সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ে আগাম তৎপরতা শুরু করতে পারেননি। কিন্তু সিটি নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি এ বিষয়ে তৎপর হন এবং শেষ পর্যন্ত গত রবিবার মনোনয়ন ফরম কেনেন। বদরউদ্দিন আহমদ কামরান জানিয়েছেন, নেত্রী (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) যদি তাঁকে নৌকা প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ দেন তবে তিনি ভালো ফলাফল বয়ে আনতে পারবেন।

 

 



মন্তব্য