kalerkantho


চার আসনেরই আশা আ. লীগে, বিএনপি চায় ভোট বিপ্লব

কাজল কায়েস, লক্ষ্মীপুর   

১৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



চার আসনেরই আশা আ. লীগে, বিএনপি চায় ভোট বিপ্লব

লক্ষ্মীপুর জেলায় আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা নির্বাচনের জন্য মুখিয়েই ছিলেন। তফসিল ঘোষণার পর দলের মনোনয়নপত্র বিক্রি শুরু হতেই তাঁরা তা সংগ্রহ করছেন উৎসবমুখর পরিবেশে। চার আসনের সবটিতেই দলীয় প্রার্থী জয় লাভ করবেন, এমন প্রত্যাশাও রয়েছে আওয়ামী লীগে। তবে পরিবেশ অনুকূল ছিল না বলে আশানুরূপ চাঞ্চল্য দেখা যায়নি বিএনপিতে অনেক আগে থেকেই। রয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দলও। আশা করা হচ্ছে, নির্বাচনে আসার ঘোষণার পর এবার দলীয় মনোনয়নপত্র হাতে পেলে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও শিগগিরই মাঠ দাপিয়ে বেড়াবেন। এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে কমবেশি চাপা আতঙ্ক। কারণ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরে নির্বাচনবিরোধীরা লক্ষ্মীপুরে আন্দোলনের নামে যে জঙ্গিরূপ ধারণ করেছিল, তা এখনো ভুলতে পারেনি অনেকেই।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন বলেন, ‘জেলাব্যাপী আমাদের দল সংগঠিত। উন্নয়নের ফলেও মানুষ এদিকে ঝুঁকে পড়ছে। আমরা আবারও জনগণের ভোটে চারটি আসনই পাব। কারণ মানুষ বোমাবাজি, সন্ত্রাস আর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে অতিষ্ঠ হয়ে বিএনপি-জামায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তরুণ প্রজম্মের সমর্থনও আমাদের পক্ষে রয়েছে।’

লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) : দশম সংসদ নির্বাচনে জোটের হিসাব থেকে তরিকত ফেডারেশনকে ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। এমপি নির্বাচিত হন তরিকতের সাবেক মহাসচিব লায়ন এম এ আউয়াল। তিনি এবারও যখন প্রার্থী হতে চাইছেন, আওয়ামী লীগ থেকে অনেকেই এরই মধ্যে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ আগে থেকে মাঠে সংগঠিত রয়েছেন। মনোনয়নপত্র সংগ্রহকারীদের মধ্যে আছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শফিকুল ইসলাম, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোজাম্মেল হক মিলন, রামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সফিক মাহমুদ পিন্টু, সিনিয়র সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন খান, শামছুল ইসলাম মিজান, সদস্য মাইন উদ্দিন মাইনু, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক এম এ মমিন পাটওয়ারী ও জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সদস্য দেওয়ান সুলতান আহমেদ প্রমুখ। মোবাইল ফোনে তাঁদের সবার সঙ্গে কথা বলে কালের কণ্ঠ’র প্রতিনিধি মনোনয়নপত্র কেনার বিষয়টিতে নিশ্চিত হয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আউয়ালের বিরুদ্ধে মাঠে আটঘাট বেঁধে নেমেছেন আনোয়ার হোসেন খান। তিনি ১০ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও পৌরসভার কয়েকজন কাউন্সিলরকে নিয়ে একাট্টা হয়েছেন। দান-অনুদান দিয়ে তিনি আলোচনায়ও এসেছেন। আনোয়ার খান বিরোধী হিসেবে পরিচিত জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সফিকুল ইসলামও রামগঞ্জের অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নিয়ে ঢাকায় একাধিকবার বৈঠক করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের মধ্যম সারির তিনজন নেতা বলেন, প্রার্থীদের ত্যাগ-শ্রম মূল্যায়ন করেই শেখ হাসিনা চূড়ান্ত মনোননয়ন দেবেন বলে তাঁদের প্রত্যাশা। তাঁরা বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা সফিকুল ইসলাম উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালে রামগঞ্জে অনেক উন্নয়ন করেছেন। সংগঠনকে পোক্ত করতে রাতদিন তিনি শ্রম দিয়েছেন। এ ছাড়া ১৪ বছর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন মো. শাহজাহান। তিনি বর্তমানে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। সংসদ নির্বাচনে তিনি দুইবার মনোনয়নও পেয়েছিলেন।

এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি নাজিম উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা মতিঝিল থানা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসিন আলী ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সদস্য ইমাম হোসেন। বিএনপির সঙ্গে এলডিপির আসন ভাগাভাগি হলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিমের প্রার্থিতার বিষয়টি সামনে চলে আসবে। এ ছাড়া উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে রফিকুল ইসলাম নির্বাচন করতে চান বলে শোনা যাচ্ছে।

লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর, সদরের একাংশ) : গত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান এহসানুল কবির জগলুল। জোটগত হিসাব থেকে জগলুল মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন এবং জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নোমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। মোহাম্মদ নোমান এবারও মনোনয়ন চান জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এলাকার উন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে কাজ করেছি।’

এ আসনে মনোনয়নপত্র কিনেছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক হারুনুর রশিদ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল হুদা পাটওয়ারী, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক এহসানুল কবির জগলুল, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ আলী খোকন, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন, জেলা যুবলীগের সভাপতি এ কে এম সালাহ উদ্দিন টিপু, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য শামছুল ইসলাম পাটওয়ারী, আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কাশেম, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য রফিকুল হায়দার বাবুল পাঠান, এনআরবি ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট শহিদ ইসলাম পাপুল ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সালাহ উদ্দিন রিগ্যান প্রমুখ। এর মধ্যে হারুনুর রশিদ ঢাকাকেন্দ্রিক ও জনবিচ্ছিন্ন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে মোহাম্মদ আলী খোকন ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াতের নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে সুনাম রয়েছে। রায়পুর উপজেলার পশ্চিমাঞ্চল খ্যাত চরাঞ্চলে অর্ধলক্ষাধিক ভোট ব্যাংক রয়েছে। সেখানে খোকনের আধিপত্য থাকার কথা জানা যায়। এ ছাড়া এহসানুল কবির জগলুল শতাধিক শিক্ষিত যুবককে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

এখানে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন জেলা কমিটির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া ও খালেদা জিয়ার সাবেক প্রধান নিরাপত্তা সমন্বয়কারী কর্নেল (অব.) আবদুল মজিদ। কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টির সদস্য শেখ ফায়িজ উল্যা শিপন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. শাহজাহান পাটওয়ারী নির্বাচনের লক্ষ্যে কাজ করছেন।

লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) : দশম সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এ কে এম শাহজাহান কামাল এমপি নির্বাচিত হন। তিনি বর্তমানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি। এবারও তিনি মনোনয়নলাভে আগ্রহী। সদরের পূর্বাঞ্চলে ২২টি সন্ত্রাসী বাহিনী সক্রিয় ছিল। প্রশাসনের তৎপরতায় এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছ, যার কৃতিত্ব কমবেশি সংসদ সদস্যরও। তবে এ আসনে দলীয় মনোনয়নপত্র নিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু, সাবেক সভাপতি এম আলাউদ্দিন, ঢাকা মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সাত্তার, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের, সজিব গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ হাসেম, জেলা যুবলীগের সভাপতি এ কে এম সালাহ উদ্দিন টিপু, জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা বদরুল আলম শ্যামলসহ কয়েকজন প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে গোলাম ফারুক পিংকু এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করেছেন।

সদরে বিএনপি থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে চাইছেন কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ও জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাহাবুদ্দিন সাবু। যদিও জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল খায়ের ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক সাহাবুদ্দিন সাবুর মধ্যে আধিপত্য নিয়ে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির বিরুদ্ধে আবুল খায়ের ভূঁইয়াকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিযোগিতা দিয়ে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করা হয়। এমনকি খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতেও একাট্টা হতে পারেননি তাঁরা। সাহাবুদ্দিন সাবু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই জেলা বিএনপির ঘাঁটি। আওয়ামী লীগ ও পুলিশ আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে হমলা-মামলা দিয়ে নির্যাতন করেছে। এখনো নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে।’

এ ছাড়া জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এম আর মাসুদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ বেলায়েত হোসেন বেলাল ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে অনারারি ক্যাপ্টেন (অব.) মো. ইব্রাহীম প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন।

লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি, কমলনগর) : মেঘনা উপকূলীয় এ আসনটি দীর্ঘদিন উন্নয়নবঞ্চিত ছিল। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকার রামগতি ও কমলনগরে মেঘনা নদীর তীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পের জন্য প্রায় ২০০ কোটি বরাদ্দ দেয়। ওই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ায় জনগণ সুফল পাচ্ছে। এ প্রকল্প ঘিরেই জনগণ আওয়ামী লীগের প্রতি কিছুটা আস্থা রাখছে। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য মো. আবদুল্লাহ, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক উপকমিটির সহ সম্পাদক আবদুজ্জাহের সাজু, কমলনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম নুরুল আমিন রাজু, সাংগঠনিক সম্পাদক শামছুল কবিরসহ কয়েকজন প্রার্থী মনোননয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।

সংরক্ষিত আসনের সাবেক এমপি ফরিদুন্নাহার লাইলি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লক্ষ্মীপুর-৪ আসনটি উন্নয়নে অবহেলিত ছিল। গত ১০ বছরে শেখ হাসিনার সরকার ব্যাপক উন্নয়নের মাধ্যমে তা বদলে দিয়েছে। আমি দল ও জনগণের জন্য কাজ করেছি। তাদের ভালোবাসা নিয়ে ভোটের মাঠে লড়তে চাই। দল আমার শ্রম ও ত্যাগের মূল্যায়ন করবে বলে আমি বিশ্বাস করছি।’

তবে জোটগত নির্বাচনের ধারায় এ আসনের প্রার্থিতায় চমক আসতে পারে বলে অনেকের ধারণা। বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জোট সূত্রে জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিকল্পধারার জোটের হিসাব দাঁড়ালে মেজর (অব.) আবদুল মান্নান প্রার্থী হতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাচ্ছেন দলটির রামগতি উপজেলা কমিটির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সফিউল বারী বাবু, খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা সৈয়দ মোহাম্মদ শামছুল আলম ও কেন্দ্রীয় তাঁতী দলের সহসভাপতি আবদুল মতিন। এ ছাড়া বাসদ থেকে মিলন মণ্ডল ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী খালেদ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।

 



মন্তব্য