kalerkantho


ঢাকা লিট ফেস্ট

নারীর এগিয়ে আসার বার্তা

জেমকন সাহিত্য পুরস্কার পেলেন প্রশান্ত মৃধা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নারীর এগিয়ে আসার বার্তা

জেমকন সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্তদের সঙ্গে অতিথিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

চলমান ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিনে গতকাল শুক্রবার দিনভর বাংলা একাডেমি ছিল অসংখ্য মানুষের আনন্দমুখর সম্মিলন কেন্দ্র। ছুটির দিনে সকাল থেকেই ভিড় করে নানা শ্রেণির মানুষ। দিনভর নানা অধিবেশনে অংশ নেয় তারা। ৩০টির বেশি অধিবেশনে উঠে আসে শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজ-রাষ্ট্রের নানা প্রসঙ্গ। বিশেষভাবে উঠে আসে নারীর এগিয়ে চলার গল্প।

এবার লিট ফেস্টে দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিশেষভাবে। এর মধ্যে অন্যতম নারীর অধিকার ও বাক্স্বাধীনতা। উৎসবের প্রথম দিনে মুক্তচিন্তা ও বাক্স্বাধীনতার সপক্ষে উচ্চারিত হয় শাণিত বক্তব্য। দ্বিতীয় দিনে সকাল থেকেই বিভিন্ন অধিবেশনে বারবার উঠে এসেছে নারীর স্বাধীনতা ও অধিকার প্রসঙ্গটি। উঠে এসেছে চলমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আন্দোলন #মিটু নিয়েও। সব মিলিয়ে এতে নারীর এগিয়ে আসার বার্তা উঠে এসেছে বারবার। এর মাঝে বলিউডের দুই অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা ও নন্দিতা দাস কথা বলেছেন চলচ্চিত্র ও সমাজের নারীর অবস্থান নিয়েও।

উৎসবের দ্বিতীয় দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বলিউড অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা ও নন্দিতা দাসের অধিবেশন। দিনের শুরুতেই বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘ব্রেকিং ব্যাড’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত হয় এ অধিবেশন। সঞ্চালনা করেন উৎসবের অন্যতম পরিচালক সাদাফ সায্।

মনীষা কৈরালা বলেন, পরিচালক হিসেবে এখনো মানুষ একজন নারীকে কল্পনা করতে পারে না। চলচ্চিত্রজগতে শতকরা ২০ জনেরও কম নারী ক্যামেরার পেছনে কাজ করে। আর এটা শুধু চলচ্চিত্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নয়, প্রায় সব ক্ষেত্রেই হয়ে আসছে। সব ক্ষেত্রে নারীর অধিকার অর্জনের জন্য আত্মবিশ্বাসী হয়ে নারীদেরই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে।

নন্দিতা দাসের আলোচনায় উঠে আসে নারীর প্রতি বর্ণবাদ প্রসঙ্গটি। তিনি বলেন, গায়ের রং কালো হওয়া কোনোদিনই কোনো মেয়ের জন্য আশীর্বাদ ছিল না। এই একবিংশ শতাব্দীতেও সেই অবস্থা একই রয়েছে। নিজেকে ‘কালো মেয়ে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আত্মীয়স্বজন সব সময় বলতেন, বাইরে যেও না, রং ফর্সাকারী ক্রিম ব্যবহার করো, তোমাকে ফর্সা হতে হবে। কিন্তু তাদের বোঝা উচিত, একজন মেয়ে কালো হয়ে জন্মেছে, এখানে তার কিছুই করার নেই।’

বিকেলে অধিবেশনে উঠে আসে #মিটু আন্দোলনের প্রসঙ্গ। ‘#মিটু এর যুগে বাঙালি সমাজ ও নারীত্ব’ শিরোনামের এ অধিবেশনে আলোচনা করেন সাংবাদিক মুন্নী সাহা, জাইমা ইসলাম, অভিনেত্রী বন্যা মির্জা এবং সমাজকর্মী রিতা দাশ রায়।

বক্তারা বলেন, ‘শুধু সামাজিক মাধ্যমে লেখাতেই এ আন্দোলন সীমাবদ্ধ নয়; একজন নারীকে সেই সঙ্গে এই প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা ও সাহস রাখতে হবে। দৈনন্দিন জীবনে শুধু নারীরাই নয়, অনেক ছেলে শিশুও কিন্তু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। কিন্তু সেটা রয়ে যায় আমাদের অগোচরে। তাই #মিটু শুধু নারীদের নয়, একই সঙ্গে পুরুষদেরও আন্দোলন হওয়া চাই।’

ইউটিউবার রাবা খান অংশ নেন ‘ওমেন অ্যান্ড উইট’ অধিবেশনে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ফারিহা পান্নি। এতে রাবা খান বলেন, ‘অনেকই রস আর ভাঁড়ামোর মধ্যে পার্থক্য বোঝেন না। সারা পৃথিবীতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও কমেডিয়ান হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছেন। সেটা রসবোধের কারণে। যদিও আমাদের দেশে এ রসবোধ বিষয়টিকে ভালোভাবে নেওয়া হয় না।’

কুড়িগ্রামের রাজারহাটের ‘লোকসংগীত’ দলের কীর্তন পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দ্বিতীয় দিনের আয়োজনে এ ছাড়া শিশুদের জন্য ছিল নানা অধিবেশন। সাত থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ছিল ‘সুপারডগস’ শিরোনামের অধিবেশন। ফাতেমা-তুজ-জোহরা শিশুদের পাঠ করে শোনান ‘পশু পাখির তিন গল্প’। ছোটদের নাট্যদল বিদ্যাভুবন মঞ্চায়ন করে নাটক ‘দ্য লাস্ট ট্রি’। ছিল ছড়াপাঠের আয়োজন ‘আউট অব দ্য ক্লোজেট’। রিফাত ইসলাম ইশার সঞ্চালনায় অংশ নেন সারিনা হোসাইন ও সাকিয়া চৌধুরী। আরো ছিল পুতুলনাট্য ‘মানুষ’ পরিবেশন করেন রশিদ হারুন।

এর আগে ‘মঞ্চ নাটক, টিভি নাটক ও চিত্রনাট্য’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন কবি মাহবুব আজীজ, চলচ্চিত্র নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী, গবেষক সাইমন জাকারিয়া ও কবি আলতাফ শাহনেওয়াজ। সঞ্চালনা করেন অভিনেত্রী বন্যা মির্জা। ‘ফিয়ারসাম ফিউচারস’ শিরোনামে অধিবেশনে কেলি ফ্যালকোনারের সঙ্গে আলাপচারিতা করেন পুলিৎজার বিজয়ী মার্কিন সাহিত্যিক অ্যাডাম জনসন। পরে ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস : সংকট ও উত্তরণ’ শীর্ষক আলাপচারিতায় অংশ নেন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. নিখিলেশ রায় এবং কবি ও অধ্যাপক সুমন গুণ। এ পর্বটি সঞ্চালনা করেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মুহসিন। এ ছাড়া গতকাল সকাল ১০টায় উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ছিল ‘দ্য জয় অব রিডিং’ শিরোনামের অধিবেশন। এতে মাইমুনা আহমেদের সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নেন আহসান হাবীব ও বুশরা জুলফিকার।

সকাল সোয়া ১১টায় উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে নিজেদের রচনা পাঠ করেন কবি কামাল চৌধুরী ও রুপার্ট ডস্তুর। এ পর্বটি সঞ্চালনা করেন সাবরিনা ফাতেমা আহমেদ। নভেরা প্রদর্শনালয়ে ছিল প্রথম বই রচনার আলোচনা। অরূপ স্যানালের সঞ্চালনায় ‘ফার্স্ট বুকস : হোয়ার ডু দে কাম ফ্রম?’ শিরোনামের এ অধিবেশনে নিজেদের প্রথম বই রচনার গল্প বলেন ওলগা গার্জাসনোয়াম, হিমাঞ্চল শংকর ও চন্দ্রহাস চৌধুরী।

দুপুর সোয়া ১২টায় কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে ‘অ্যাপ্রিসিয়েট কালচার’ শিরোনামের অধিবেশনে সামিয়া খাতুনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন অ্যানি জায়দি, জয়শ্রী মিশ্র ও হিমাঞ্জল শংকর। কসমিক টেন্টে ছিল ‘ডার্টি লন্ড্রি’ শিরোনামের অধিবেশনে নিসিম জান সাজিদের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন ক্যাটরিনা ডন, অমিত আশরাফ, কাজী ইসতেলা ইমাম ও ফারাহ খন্দকার।

দুপুর ২টায় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে অস্কার জয়ী টিল্ডা সুইন্টন নিজের লেখা ‘ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট মেন’ থেকে পাঠ করেন। কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে এড কামিংয়ের সঞ্চালনায় জেমস মিক অংশ নেন ‘দ্য গ্রেট বিট্রেইল’। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে কোর্টনি হোডেলের সঞ্চালনায় ক্রিস হেইসার ও রুপার্ট ডস্তুর অংশ নেন ‘শর্ট আউট’ শিরোনামের অধিবেশনে। নভেরা প্রদর্শনালয়ে সালি পমি ক্লাইটন পরিবেশন করেন ‘অ্যামেজিং মেইডেন্স’। কসমিক টেন্টে ছিল ‘ম্যাথ অলিম্পিয়াড’ নিয়ে আলোচনা। মুনীর হাসানের সঞ্চালনায় এতে অংশ নেন বিশ্ব ম্যাথ অলিম্পিয়াডের স্বর্ণজয়ী আহমেদ জাওয়াদ চৌধুরী, মাহবুবুল আলম মজুমদার ও শুভা নওয়ার পুষ্পিতা।

বিকেল সোয়া ৩টায় কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে ছিল ‘লাইব্রেরি অব বাংলাদেশ’ শিরোনামের অধিবেশন। এতে সঞ্চালনা করেন রিফাত মুনীম। আলোচনায় অংশ নেন কায়সার হক, খাদেমুল ইসলাম ও কিউপি আলম। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ছিল গল্প বলার আয়োজন। এড কামিংয়ের সঞ্চালনায় গল্পপাঠে অংশ নেন ক্রিস্টিয়ান হোডেল, ক্রিস হেইসার ও রস পর্টার।

বিকেল সাড়ে ৪টায় কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে খাদেমুল ইসলামের সঞ্চালনায় ‘সিক্রেট হিস্টোরি’ নিয়ে আলোচনা করেন ফিলিপ হেনসের। নভেরা প্রদর্শনালয়ে সান্ড্রা কোপ পরিবেশন করেন ‘দ্য ট্রি অব লাইফ’। কসমিক টেন্টে ছিল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে ‘ইলিয়াস’ শিরোনামের অধিবেশন। এতে সঞ্চালনা করেন মুসহারাত হুসেইন। আলোচনায় অংশ নেন খালেকুজ্জামান ইলিয়াস, ইমদাদুল হক মিলন, প্রশান্ত মৃধা ও সর্বজন দাশগুপ্ত। নজরুল মঞ্চে ছিল উত্তরবঙ্গের লোকজ পরিবেশনা ‘কুশন’। বিকেল পৌনে ৬টায় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ছিল ‘আই এমন চেঞ্জ’ শিরোনামের অধিবেশন। এতে সঞ্চালনা করেন নবনীতা চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেন খালেদা শাহরিয়ার কবির, সায়েবা আখতার, নমিতা হালদার ও কাঙালিনি সুফিয়া। কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে ছিল ‘দ্য বাংলাদেশ প্যারাডক্স’ শিরোনামের অধিবেশন। এতে সঞ্চালনা করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। আলোচনা করেন বিনায়েক সেন, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ও কে এ এস মুরশিদ। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ছিল কবিতা পাঠের আসর ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’। এ পর্ব সঞ্চালনা করেন ফরিদ কবির। নভেরা প্রদর্শনালয়ে প্রদর্শিত হয় চলচ্চিত্র ‘বিদ্যাভুবন’। আলোচনা করেন নাদিম ইকবাল ও শেখ আল মামুন। কসমিক টেন্টে ‘স্টারস, স্টোরিজ অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’ শিরোনামের অধিবেশন। এতে রুপার্ট হাকসলের সঞ্চালনায় আলোচনা করেন ক্রিস্টান হোডেল। নজরুল মঞ্চে প্রবর রিপনের নির্দেশনায় গান আর কবিতার যুগলবন্দি পরিবেশিত হয় নিউ সোনার বাংলা সার্কাস। সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় শুরু হয় দ্বিতীয় দিনের শেষ অধিবেশন। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী নিজের বই ‘চ্যারোট অব লাইফ’ নিয়ে হায়াত সাইফের সঞ্চালনায় আলোচনা করেন।

জেমকন সাহিত্য পুরস্কার প্রদান : এদিকে ২০১৮ সালের জেমকন সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন কথাসাহিত্যিক প্রশান্ত মৃধা। আর জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন হামিম কামাল ও জেমকন তরুণ কবিতা ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছেন হাসান নাঈম।

গতকাল বিকেলে ঢাকা লিট ফেস্টে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন জেমকন গ্রুপের পরিচালক কাজী নাবিল আহমেদ। এ সময় জুরি বোর্ডের সদস্য বাংলাদেশ কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান কবি মুহাম্মদ সাদিক, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ, কবি আসাদ চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। 

প্রশান্ত মৃধাকে ‘ডুগডুগির আসর’ উপন্যাসের জন্য আট লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে হামিম কামালকে তাঁর ছোট গল্পের পাণ্ডুলিপি ‘সোনাইলের বনে’ ও হাসান নাঈমকে তাঁর ‘দিল নিলামের হাট’ নামে কবিতার পাণ্ডুলিপির জন্য নগদ এক লাখ টাকা করে এবং ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র প্রদান করা হয়।

স্বাগত বক্তব্যে কাজী নাবিল আহমেদ বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যের সৃজনশীল লেখকদের সম্মানিত করার জন্যই জেমকন সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই পুরস্কার সৃষ্টিশীল লেখকদের উৎসাহ জোগাবে বলে বিশ্বাস করি।’

অনুভূতি প্রকাশ করে প্রশান্ত মৃধা বলেন, ‘যেকোনো পুরস্কারপ্রাপ্তি আনন্দের ব্যাপার। ইতিমধ্যে যাঁরা এই পুরস্কার পেয়েছেন তাঁরা সকলেই আজ বাংলা সাহিত্যে সমাদৃত। তাঁদের সঙ্গে পুরস্কার ভাগাভাগি করে নিতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।’

সাহসী জীবনের গল্প শোনালেন মনীষা কৈরালা



মন্তব্য