kalerkantho


ঢাকা লিট ফেস্ট

মুক্তচিন্তার সপক্ষে শিল্পের জয়গান

নওশাদ জামিল   

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মুক্তচিন্তার সপক্ষে শিল্পের জয়গান

বাংলা একাডেমিতে গতকাল ঢাকা লিট ফেস্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ভারতের অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র পরিচালক নন্দিতা দাস। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাংলা একাডেমি চত্বর। ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউসের চারদিকে ছোট-বড় অনেক স্টল। স্টলগুলোতে দেশ-বিদেশের বই। বর্ধমান হাউসের সামনেই বড় আকারের তাঁবু। এর নিচে চলছে শিল্প-সাহিত্য নিয়ে নানা অধিবেশন। একাডেমির কয়েকটি মিলনায়তনেও চলছে নানা অধিবেশন। মনে হবে বইমেলা। আসলে তা নয়, বইয়ের লেখকদের নিয়ে উৎসব। শুধু লেখক-সাহিত্যিক নন, নৃত্য, সংগীত, চলচ্চিত্রসহ নানা কিছুর বৃহত্তর সমাবেশ। দেশ-বিদেশের যশস্বী কবি-সাহিত্যিক-অনুবাদক-নাট্যকারদের নিয়ে আয়োজিত এ উৎসবের নাম ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’।

শাস্ত্রীয় সংগীত ও নৃত্যের মূর্ছনায় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে শুরু হয় ঢাকা লিট ফেস্ট। আর উৎসবে মুক্তচিন্তার সপক্ষে ধ্বনিত হয় শিল্পের জয়গান।

এবারের উৎসবে যোগ দিয়েছেন ১৫টি দেশের দুই শতাধিক সাহিত্যিক, অভিনেতা, রাজনীতিক ও গবেষক। আছেন বাংলাদেশের দেড় শতাধিক লেখক, অনুবাদক, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায়, বাংলা একাডেমির সহযোগিতায় এ উৎসবের আয়োজক যাত্রিক। ঢাকা লিট ফেস্টের টাইটেল স্পন্সর বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউন, কি-স্পন্সর ব্র্যাক ব্যাংক, গোল্ড স্পন্সর এনার্জিস আর স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার ব্রিটিশ কাউন্সিল।

বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৮’-এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। উপস্থিত ছিলেন ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সায্ ও আহসান আকবার। পরে ফিতা কেটে উৎসবের সূচনা করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী। এ সময় ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালক ছাড়াও ছিলেন ভারতের অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র পরিচালক নন্দিতা দাস, পুলিত্জার বিজয়ী লেখক অ্যাডাম জনসন।

উৎসবের প্রথম দিনে বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নিয়ে লেখক-সাহিত্যিকরা বলেছেন, দেশে দেশে অস্থিরতা, জঙ্গিবাদের উত্থান, বাক্স্বাধীনতা আক্রান্ত। এসব বাধা মোকাবেলা করেই মুক্তচিন্তার ধারকদের এগিয়ে যেতে হয়। যুগে যুগে, কালে কালে লেখকদের এ বাধা অতিক্রম করেই সত্য ও সুন্দরের কথা বলে যেতে হয়েছে।

উৎসবের পরিচালক বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রকাশক কাজী আনিস আহমেদ বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করে বাক্স্বাধীনতা হরণের একটি চেষ্টা করা হচ্ছে। ঢাকা লিট ফেস্ট সব সময় মুক্তচিন্তা ও বাক্স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। মুক্তচিন্তার সপক্ষেই আমাদের অবস্থান।’

আরেক পরিচালক সাদাফ সায্ বলেন, ‘বিশ্বের সব জায়গায় মুক্তচিন্তার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে, সেখানে এ রকম আয়োজন করতে গেলে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। নারী ইস্যু, হ্যাশট্যাগ মি টু, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ নানা বিষয়ে আলোচনায় উঠে আসবে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা।’

উৎসবের প্রথম দিন ছিল ২০টি অধিবেশন। এসব অধিবেশনে উঠে এসেছে শিল্প-সাহিত্যসহ নানা প্রসঙ্গ। বর্তমান সময়ের বিবেচনায় রাষ্ট্রযন্ত্রের ভবিষ্যৎ খুঁজতে আলাপে বসেন অ্যাডাম জনসন, ডেভিড বিয়েলো, জেমস মিক, কোর্টনি হোডেল ও নিশিদ হাজারির মতো পণ্ডিতরা। ‘পোস্ট-আমেরিকা ফিউচার’ শিরোনামে উদ্বোধনী অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন কাজী আনিস আহমেদ।

দুপুর সাড়ে ১২টায় বাংলা একাডেমির কসমিক টেন্টে আয়োজিত ‘প্রকাশনা শিল্প ও বইয়ের বিপণন’ শীর্ষক আলোচনায় যোগ দেন প্রকাশক খান মাহাবুব, মিলন কান্তি নাথ, সৈয়দ জাকির হোসেন, মাহরুখ মহিউদ্দীন ও পশ্চিমবঙ্গের ‘দে প্রকাশনা’র অপু দে। সঞ্চালনায় ছিলেন ফিরোজ আহমেদ।

বাংলাদেশের মেয়ে নাইমা। রিকশা চালানোর ইচ্ছা তার প্রবল। ওকে ঘিরেই মিতালি বোস পার্কিন্স লিখেছেন ‘রিকশা গার্ল’ উপন্যাসটি। দুপুরে বাংলা একাডেমি লনে ‘নিউ ইয়র্ক লাইব্রেরি নির্বাচিত গত শতাব্দীর সেরা ১০০ শিশু সাহিত্য’ তালিকায় স্থান করে নেওয়া বইটি নিয়ে সুপ্রভা তাসনিমের সঙ্গে মনখোলা আড্ডায় মাতেন তিনি। কবি শামসুর রাহমান সেমিনার হলে ‘যে গল্পের পাঠক নেই’ শীর্ষক আলোচনায় ছোটগল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা হয়। এতে অংশ নেন কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবের, আহমাদ মোস্তফা কামাল, হামীম কামরুল হক ও রাশিদা সুলতানা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ছোটগল্পকার পারভেজ হোসাইন।

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মঞ্চে ‘ক্র্যাশিং রিয়ালিটিস’ শিরোনামে আলোচনায় কথা বলছিলেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক মোহাম্মদ হানিফ। সঙ্গে ছিলেন ব্রিটিশ সাহিত্য ম্যাগাজিন গ্রান্টার নির্বাহী সম্পাদক রস পর্টার। হানিফ কথা বললেন তাঁর নতুন বই ‘রেড বার্ডস’ নিয়ে। গল্পটা নামহীন, বিরতিহীন যুদ্ধের।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা বই নিয়ে কথা বলেছেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। ‘বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায়’, ‘মুজিব ভাই’ ও ‘শেখ মুজিব ট্রায়ামফ অ্যান্ড ট্র্যাজেডি’ নিয়ে আলোচনা হয় ‘দিনগুলি : স্মৃতিচারণ’ শীর্ষক অধিবেশনে। বই তিনটির লেখক যথাক্রমে মফিজ চৌধুরী, এ বি এম মূসা ও এস এ করিম।

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে হয়েছে ‘সময়ের গান, অসময়ের কবিতা’ শীর্ষক আরেকটি অধিবেশন। এতে অংশ নেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। অধিবেশন সঞ্চালনা করেছেন শামীম রেজা।

নিউরো বিজ্ঞানী গর্গ চ্যাটার্জির সঞ্চালনায় রাইট টু লাই বা মিথ্যা বলার অধিকার নিয়ে কথার আয়োজনে ছিলেন জাকির কিবরিয়া, সৈয়দ মফিজ কামাল অনিক, ডেভিড বিওয়েল। তাঁরা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ও ব্যক্তি আচরণ নিয়ে কথা বলেন।

অনুবাদে ভিন্ন ভাষার মূল অক্ষুণ্ন রেখেও রূপান্তর সম্ভব—এমন অভিমতের পাশাপাশি ভিন্ন বক্তব্যও উঠে আসে ‘অনুবাদ : মূলানুগ নাকি রূপান্তর’ শীর্ষক আলোচনায়। ভাস্কর নভেরা এক্সিবিশন হল মিলনায়তনে অনুবাদক আলীম আজিজ, আলম খোরশেদ ও মোজাফফর হোসেনের আলাপচারিতার সূত্রধর ছিলেন প্রথিতযশা অনুবাদক রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী।

এরপর শুরু হয় উর্দু ভাষার প্রগতিশীল লেখক সাদাত হোসেন মান্টোর জীবন ও দেশভাগ নিয়ে নন্দিতা দাস নির্মিত চলচ্চিত্র ‘মান্টো’র প্রদর্শনী। প্রদর্শনী শেষে নন্দিতা বলেছেন এই ছবি তৈরির গল্প। বিকেলের শেষভাগে বাংলা একাডেমির লনে কবিতা পাঠ করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় কবিরা। কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজীর সঞ্চালনায় আসরে অংশ নেন আলফ্রেড খোকন, রাজু আলাউদ্দিন প্রমুখ।



মন্তব্য