kalerkantho


বাংলাদেশসহ ৮৭ দেশের উদ্যোগ

রোহিঙ্গা গণহত্যার নিন্দায় জাতিসংঘে নতুন প্রস্তাব

জাতিসংঘ আবারও বলেছে, প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নেই
নিরাপত্তা ছাড়া রোহিঙ্গারা ফিরতে চায় না : নেদারল্যান্ডস

মেহেদী হাসান   

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা গণহত্যার নিন্দায় জাতিসংঘে নতুন প্রস্তাব

মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাদের ওপর গণহত্যাসহ অন্যান্য নির্যাতন-নিপীড়নের জবাবদিহির চাপ তৈরির চেষ্টায় কাজ করছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা গণহত্যার নিন্দা জানিয়ে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসির) ৫৭টি সদস্য রাষ্ট্রের পক্ষে বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মানবাধিকারবিষয়ক কমিটিতে (তৃতীয় কমিটি) একটি জোরালো প্রস্তাব এনেছে। ওই প্রস্তাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৮টি সদস্য রাষ্ট্র এবং যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রয়েছে। ৮৭টি দেশের আনা ওই প্রস্তাব নিয়ে আগামী ১৫ নভেম্বর রাতে তৃতীয় কমিটিতে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। সেদিনই বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অনুকূল ও নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে কি না সে বিষয়ে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা অনেক দেশের সংশয় রয়েছে। সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে বিবেচনাধীন প্রস্তাবের খসড়াতেও মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফরের পর নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী সিরগিড কাগ গতকাল বৃহস্পতিবার প্রত্যাবাসন নিয়ে রোহিঙ্গাদের বিরূপ মনোভাবের কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে জাতিসংঘ আবারও বলেছে, প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ নেই বলে তারা যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল তা এখনো বহাল রয়েছে।

নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বুধবার রাতে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের একজন জানতে চান, রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো যথেষ্ট ভালো পরিবেশ নেই বলে বলা হচ্ছে। এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি আছে কি না। জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, ‘পর্যবেক্ষণে কোনো পরিবর্তন নেই।’

এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে ‘মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি’ প্রস্তাবের খসড়ায় মিয়ানমারে বিশেষ করে রাখাইন, কাচিন ও শান রাজ্যে অব্যাহতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে ধরে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমারের স্বাধীনতার আগে থেকে রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে নাগরিকত্বহীন করা এবং ২০১৫ সালে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে।

২০ দফা প্রস্তাবের শুরুতেই জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে রাখাইন, কাচিন ও শান রাজ্যে গণহত্যা, হত্যা, আটক, গুম, ধর্ষণ, যৌন দাসত্বসহ অন্যান্য যৌন নির্যাতন ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। প্রস্তাবে মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে এবং দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে দেশটির সরকারের প্রতি আহ্বান রয়েছে। অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের অভিযোগের পূর্ণ ও স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করার ওপরও প্রস্তাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রস্তাবে মিয়ানমার সরকার গঠিত তদন্ত কমিশনকে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রস্তাবের পঞ্চম দফায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ গঠিত স্বাধীন কাঠামোর কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। অষ্টম দফায় মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা মুসলমান ও অন্য সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য এবং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা বন্ধ করতে জরুরি তাগিদ রয়েছে। তাদের রাষ্ট্রহীনতা দূর ও অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টিরও আহ্বান জানানো হয়েছে।

মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়া টেকসই করতে জাতীয় সব প্রতিষ্ঠানকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের অধীন করা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণগুলো সমাধানের আহ্বান রয়েছে প্রস্তাবে। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় নিরাপদ প্রত্যাবাসনের সুযোগ দিতে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘকে সহযোগিতা করতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান রয়েছে প্রস্তাবে। রোহিঙ্গাদের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে তহবিলে সহযোগিতা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিও আহ্বান জানানো হয়েছে।

সু চির উদ্যোগের প্রত্যাশায় নেদারল্যান্ডস : গত সপ্তাহে বাংলাদেশের পর মিয়ানমার সফরে গিয়ে দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির সঙ্গে বৈঠক করেন নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী সিরগিড কাগ। গতকাল নেদারল্যান্ডস ব্রডকাস্টিং সার্ভিসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সু চির সরকার রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় ব্যর্থতার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়েছে। সু চির সরকারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা পূরণের আহ্বান জানিয়েছি। বিশেষ করে, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরকে অবাধ প্রবেশাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি।’ সিরগিড কাগ জানান, নেদারল্যান্ডস আর্থিকভাবে মিয়ানমারকে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু সমস্যার সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে। এ বিষয়টি তিনি সু চিকে বলেছেন।

এদিকে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরের পরিস্থিতিকে ‘অকল্পনীয়’ বলে মন্তব্য করেন সিরগিড কাগ।



মন্তব্য