kalerkantho


প্রচারণায় চাঙ্গা আ. লীগ মাঠে নেই বিএনপি

মো. মাসুদ খান, মুন্সীগঞ্জ   

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



প্রচারণায় চাঙ্গা আ. লীগ মাঠে নেই বিএনপি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মুন্সীগঞ্জ জেলার রাজনীতি বর্তমানে বেশ চাঙ্গা। মুন্সীগঞ্জের তিনটি আসনেই বর্তমানে নির্বাচনী বাতাস বইছে। তবে নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি থেকে এগিয়ে আওয়ামী লীগ। তিনটি আসনেই আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশায় মাঠে কাজ করছেন। আওয়ামী লীগের এসব প্রার্থীর প্রচারণা দেখে মনে হয়, এই তিনটি আসনে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছে। অন্যদিকে বিএনপি প্রচার-প্রচারণায় না থাকলেও নির্বাচন নিয়ে তাদের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে তারা। নির্দেশ পেলেই মাঠে নেমে পড়বে তারা।

মুন্সীগঞ্জ-১ (শ্রীনগর-সিরাজদিখান) আসনটি বিএনপির দুর্গ বলে পরিচিত হলেও বর্তমানে আওয়ামী লীগের দখলে। আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষ শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় দীর্ঘদিন এলাকায় যেতে পারছেন না। তবে একাদশ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেতে একাধিক প্রার্থী প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগ করে চলেছেন।

বর্তমান এমপির অবর্তমানে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাবেক স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. বদিউজ্জামান ভূইয়া ডাবলু, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি গোলাম সারোয়ার কবীর, সিরাজদিখান উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন আহম্মেদ, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি সুব্রত সরকার ও শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের সভাপতি নুরুল আলম চৌধুরী।

অনেক আগে থেকেই মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন গোলাম সারোয়ার কবীর। এরই মধ্যে তিনি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করে মনোনয়ন দৌড়ে একধাপ এগিয়ে রয়েছেন।

মহিউদ্দিন আহম্মেদ দুবার নির্বাচিত হয়েছেন সিরাজদিখান উপজেলা পরিষদ থেকে। সেই সুবাদে এলাকায় তাঁর নেতাকর্মী, সমর্থক রয়েছে অনেক।

প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে তিনি আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়ার কথা বলে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করছেন।

মনোনয়ন দৌড়ে এলাকায় সভাসমাবেশ ও গণসংযোগ করছেন ডা. বদিউজ্জামান ভূইয়া ডাবলু। এবার নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে বেশ আটঘাট বেঁধেই মাঠে নেমেছেন তিনি।

এদিকে মনোনয়ন চাইবেন নুরুল আলম চৌধুরী। সুস্থ-সুন্দর রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগের এই নেতার এলাকাবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও এলাকায় না আসার কারণে নেতাকর্মীরা তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। তবে বেশ কিছুদিন ধরে তাঁকে আবার এলাকায় দেখা যাচ্ছে গণসংযোগ করতে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্র লিফলেটের মাধ্যমে এলাকাবাসীর কাছে বিতরণ করে চলেছেন তিনি।

প্রচারণায় আছেন সুব্রত সরকার। তিনিও সরকারের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরে এলাকাবাসীর মধ্যে লিফলেট বিতরণ করে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।

অন্যদিকে এ আসনটি পুনরুদ্ধারে বিএনপির নেতাকর্মীরা হতাশায় ভুগছে। দলের মধ্যে রয়েছে দ্বন্দ্ব-কোন্দল। এসবের মধ্যেই দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, শ্রীনগর উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ মমীন আলী, বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর শরাফত আলী সপু ও সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আল মুসলিম গ্রুপের কর্ণধার শেখ মো. আব্দুল্লাহ। তবে তাঁদের কেউই এখনো নির্বাচনী প্রচারণায় নামেননি। 

এদিকে দেশের প্রধান দুই দলের বাইরে বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বর্তমানে এলাকার সঙ্গে তাঁর তেমন যোগাযোগ নেই। তিনি দলীয় মনোনয়ন না নিলে আসনটিতে তাঁর ছেলে মাহী বি. চৌধুরী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।

জাতীয় পার্টির হয়ে এই আসনে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ব্যক্তিগত আইনজীবী ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ মো. সিরাজুল ইসলাম।

তবে শেষ মুহূর্তে জোট-মহাজোটের কারণে পাল্টে যেতে পারে প্রতীক ও প্রার্থীর নাম।

মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং-টঙ্গিবাড়ী) আসনের লৌহজংয়ের মাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার প্রকল্প পদ্মা সেতুর গোড়াপত্তন হয়েছে। এ কারণে এ আসনটি অনেক গুরুত্ব বহন করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাছে। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা এ আসন থেকে মনোনয়ন পেতে মরিয়া হয়ে গণসংযোগ করছেন। আসনটি একসময় বিএনপির দুর্গ বলে পরিচিত ছিল। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসনটি চলে যায় আওয়ামী লীগের হাতে। সেই থেকে এখানে আওয়ামী লীগের সুদিন।

এ আসনের বর্তমান এমপি অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। ১৯৯৬ সালে মহিলা এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এলাকায় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি আবারও দলীয় মনোনয়ন লাভ করে এমপি নির্বাচিত হন। এমিলির কর্মতৎপরতায় খুশি হয়ে ২০১৪ সালের নির্বাচনেও তাঁকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। সেবারও তিনি এমপি নির্বাচিত হন। তাঁর পাশাপাশি এবার মনোনয়ন পেতে মাঠে নেমেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম। তিনি এরই মধ্যে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে একটি অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। অত্যন্ত ক্লিন ইমেজের এই নেতাকে পেয়ে এলাকাবাসী খুশি। তিনি এলাকার অবহেলিত নেতাকর্মীসহ দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক দান-অনুদান দিয়ে যাচ্ছেন। টঙ্গিবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জগলুল হাওলাদার ভুতুসহ উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি বৃহৎ অংশ ও লৌহজং উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ তাঁর সঙ্গে সরাসরি মাঠে রয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান এমপিও পুনরায় মনোনয়ন পেতে তাঁর প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিটি সভা-সমাবেশে তুলে ধরছেন সরকারের উন্নয়ন সাফল্য।

এ ছাড়া এ আসন থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ লুৎফর রহমানও দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। তিনিও প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ঢালী মোয়াজ্জেম হোসেনও এ আসন থেকে মনোনয়ন পেতে মাঠে কাজ করছেন।

এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় আরো রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলা পরিষদের দুবারের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ। মনোনয়ন চাইবেন লৌহজং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল রশিদ সিকদার ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট সোহানা তাহমিনা।

অন্যদিকে এ আসনের সাবেক এমপি সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সিনহা এবারও এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন। জেলা বিএনপির সহসভাপতি আলী আজগর মল্লিক রিপনও এবার দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। এ ছাড়া সাবেক তথ্যমন্ত্রী এম শামসুল ইসলামের ছেলে প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বাবুও এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন।

এদিকে জাতীয় পার্টির জেলা সভাপতি কুতুবুদ্দিন আহম্মেদ, কেন্দ্রীয় নেতা নোমান মিয়া ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জামাল হোসেনও দলীয় মনোনয়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।

মুন্সীগঞ্জ-৩ (সদর-গজারিয়া) আসনটি উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ধরে রাখতে চায়।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এ আসনে অ্যডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।  তিনি এবারও দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন।

অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস প্রায় সময়ই এলাকায় অবস্থান করে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি, সামাজিক, ধর্মীয় ওয়াজ মাহফিল ও পূজাসহ সব ধরনের অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। তিনি ছাড়া এই আসনে এবার মনোনয়ন চাইবেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাবেক সভাপতি এম ইদ্রিস আলী। মনোনয়ন দৌড়ে বর্তমান সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস এগিয়ে থাকলেও এম ইদ্রিস আলীও ব্যাপক প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। তিনিও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন এবং জনসংযোগ চালাচ্ছেন।

এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের আরো মনোনয়ন চাইবেন মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আনিস উজ-জামান, মুন্সীগঞ্জ পৌর মেয়র হাজি ফয়সাল বিপ্লব, মিরকাদিম পৌর মেয়র শহিদুল ইসলাম শাহিন।

অন্যদিকে বিএনপি থেকে এবার এ আসনে মনোনয়ন চাইবেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এলজিইডি উপমন্ত্রী আলহাজ আব্দুল হাই ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন। তবে আব্দুল হাইয়ের মনোনয়ন অনেকটা নিশ্চিত।

এর বাইরে এ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বাতেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক দিদার হোসেন মনোনয়ন চাইবেন।



মন্তব্য