kalerkantho


নির্বাচন ঘিরে অস্থির পুঁজিবাজার

বড় দরপতনে এক দিনেই সূচক কমল ৭৯ পয়েন্ট

রফিকুল ইসলাম   

২৩ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



নির্বাচন ঘিরে অস্থির পুঁজিবাজার

আগামী নির্বাচনকে ঘিরে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হতে পারে এমন শঙ্কায় পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রি বেড়েছে। ছোট বিনিয়োগকারীরা কম মূলধন থাকায় আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করছে কিন্তু বড় মূলধনের বিনিয়োগকারীরাও বাজারকে কোনো সাপোর্ট দিচ্ছে না, যার জন্য পুঁজিবাজারের দরপতন ত্বরান্বিত হচ্ছে। গতকাল বড় দরপতনে ডিএসইর সূচক কমেছে ৭৯ পয়েন্ট।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহে (সাত কার্যদিবস) দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মূলধন কমেছে ১১ হাজার কোটি টাকা। আর মূল্যসূচক কমেছে ১৫৬ পয়েন্ট। ক্রমাগত নিম্নমুখী পুঁজিবাজারে আতঙ্কিত হয়ে পড়ায় বিনিয়োগকারীরা কম দামে শেয়ার বিক্রি করে বাজার ছাড়ছে।

এদিকে স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে চলমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় জরুরি বৈঠক ডেকেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

সূত্র জানায়, পুঁজিবাজারে নির্বাচনকালীন নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে সম্প্রতি দুটি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ২০০০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করেছে, যার ৭৫ শতাংশই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হবে। দ্বিতীয়টি চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছে ডিএসইর ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি থেকে পাওয়া প্রায় এক হাজার কোটি নতুন বিনিয়োগ হিসেবে আনছে, তিন বছর রাখার শর্তে ১০ শতাংশ কর মওকুফ করছে সরকার। তবে এই দুটি সিদ্ধান্তের কোনোটিই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। আইসিবিও বন্ড ইস্যুর অর্থ এখনো হাতে পায়নি। পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় তারা এখন বাজারকে সাপোর্ট দিতে পারছে না। আর শেয়ার বিক্রির ব্রোকারদের এক হাজার কোটি টাকার বিষয়ে মৌখিক ঘোষণা এলেও চূড়ান্ত না হওয়ায় সেটা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

গত এক সপ্তাহের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৪ অক্টোবর থেকে গতকাল পর্যন্ত ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আর মূল্যসূচক কমেছে ১৫৬ পয়েন্ট। সর্বশেষ গতকাল সোমবার ডিএসইর প্রধান সূচক কমেছে ৭৯ পয়েন্ট বা মোট সূচকের ১.৪৮ শতাংশ।

ডিএসই সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহের ডিএসইতে চার দিনেই সূচক কমেছে। এই চার দিনে সূচক কমেছে ২০৯ পয়েন্ট। আর অন্য তিন দিন সূচক বেড়েছে ৫৩ পয়েন্ট। সেই হিসাবে ডিএসইর প্রধান সূচক ১৫৬ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। আর লেনদেনও কমতে কমতে ৪০০ কোটি টাকার ঘরেও নেমে এসেছে। যদিও এক মাস আগেও ডিএসইতে এক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।

ডিএসই জানায়, এই সময়ে মূলধন কমেছে ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। গত ১৪ অক্টোবর মূলধন ছিল তিন লাখ ৯১ হাজার ১৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, যা গতকাল সোমবার দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৮০ হাজার ১৫১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। সেই হিসাবে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি মূলধন হারিয়েছে ডিএসই।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগামী নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আর এই অস্থিরতা থেকেই পুঁজিবাজারে বড় পতন হয়েছে। অনেক ভালো কম্পানির শেয়ারের দামও কমতে কমতে অনেক নিচে নেমেছে। নির্বাচনকালীন অস্থিরতার শঙ্কায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে কম দামে শেয়ার বিক্রি করছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি করে নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।’

বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, পুঁজিবাজার গতিশীল করতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ ও নতুন নতুন সিদ্ধান্তও নিচ্ছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য আইসিবিকে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছে শেয়ার বিক্রির অর্থও ব্রোকারেজ হাউসগুলো দ্রুতই পেয়ে যাবে। কাজেই পুঁজিবাজার ভালো হওয়ার অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। এখনই কম দামে শেয়ার বিক্রি না করে ধৈর্য ধরতে হবে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীকেও দায়িত্বশীল আচরণ করার পরামর্শ দেন তিনি। ডিএসইর ব্রোকারেজ হাউসগুলোর সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাক আহমেদ সাদেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী আগামী নির্বাচনকে ঘিরে আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করলেও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা নিষ্ক্রিয়। তারাও ডে ট্রেডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে শেয়ার বিক্রি করছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীকেও সক্রিয় হতে হবে।

গতকালের পুঁজিবাজার : গতকাল সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন হয়েছে ৪৩৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা। আর মূল্যসূচক কমেছে ৭৯ পয়েন্ট। আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৪৩৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। আর মূল্যসূচক কমেছিল ৫০ পয়েন্ট।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, লেনদেন শুরুর পর থেকে পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রির চাপে সূচক নিম্নমুখী হয়। এতে দিন শেষে সূচক কমার মধ্য দিয়েই দিনের লেনদেন শেষ হয়। দিন শেষে সূচক দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ২৫১ পয়েন্ট, যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারি এই সূচকে ছিল ডিএসই। ডিএস-৩০ মূল্যসূচক ২৫ পয়েন্ট কমে এক হাজার ৮৫৯ পয়েন্ট ও ডিএসইএস শরিয়াহ সূচক ২০ পয়েন্ট কমে এক হাজার ২০৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। লেনদেন হওয়া ৩৪০ কম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছে ৬৪টির, দাম কমেছে ২৩৬টির আর অপরিবর্তিত রয়েছে ৪০ কম্পানির শেয়ারের দাম।

অন্য বাজার সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা। আর সূচক ১৪১ পয়েন্ট। আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ১৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। আর সূচক কমেছিল ৭৬ পয়েন্ট। সোমবার লেনদেন হওয়া ২৩২ কম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছে ৪১টির, দাম কমেছে ১৬৫টির আর অপরিবর্তিত রয়েছে ২৬ কম্পানির শেয়ারের দাম।

 



মন্তব্য