kalerkantho


দুর্গ ফিরে পেতে চায় বিএনপি, ধরে রাখার চেষ্টায় আ. লীগ

তারিকুল হক তারিক, কুষ্টিয়া   

২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



দুর্গ ফিরে পেতে চায় বিএনপি, ধরে রাখার চেষ্টায় আ. লীগ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কুষ্টিয়ার চারটি আসনে বেশ জোরেশোরেই ভোটের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়প্রত্যাশীরা নিয়মিত জনসংযোগে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। জাসদসহ আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দলও ভোটের মাঠে আছে। বর্তমানে এই চারটি আসনে আওয়ামী লীগের কমপক্ষে ২০ জন এবং বিএনপির ১০ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়ার চারটি আসনের সব কয়টিতে সর্বশেষ বিএনপিবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী জোট বিজয় লাভ করে।২০১৪ সালের ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ কুষ্টিয়া-৩ (সদর) ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। অন্য দুই আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী দুজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই দুই আসনের মধ্যে কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) এ দলের মনোনীত প্রার্থী আব্দুর রউফ বিজয়ী হন এবং কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) এ বিদ্রোহী প্রার্থী রেজাউল হক চৌধুরী জয়লাভ করেন।

এলাকার ভোটারদের অনেকে বলছেন, এবার হারানো দুর্গ ফিরে পেতে সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নামছে বিএনপি। আর আসন ধরে রাখতে আওয়ামী লীগও বদ্ধপরিকর। ‘উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার’ জন্য ভোটারদের কাছে গিয়ে নৌকায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। আর বিএনপি নেতারা সরকারের নানা ব্যর্থতা তুলে ধরে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। পাশাপাশি জেলার সবকটি আসনেই বিএনপি ও আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এই কোন্দল আরো বাড়তে পারে বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনে করছে। অন্যদিকে শরিক দল জাসদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্কও ভালো নয়।

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর)

ভারত সীমান্তসংলগ্ন ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসন। এই উপজেলায় এখন বেশ জোরেশোরেই ভোটের হাওয়া বইছে। জেলার বৃহত্তম এই উপজেলায় ২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত বিএনপির একক অধিপত্য ছিল। এ আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী হিসেবে বিজয়ী বর্তমান সংসদ সদস্য রেজাউল হক চৌধুরী ও সাবেক সাংসদ আফাজ উদ্দিন আহম্মেদ একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী। এ দুজন ছাড়াও আওয়ামী লীগের বিকল্প সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদীয় মনোয়ন বোর্ডের অন্যতম সদস্য রশিদুল আলমের নাম শোনা যাচ্ছে। পাশাপাশি অন্য যারা জনসংযোগ করছেন তাঁরা হলেন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা উপকমিটির অন্যতম সদস্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ও স্থানীয় খলিশাকুণ্ডি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোফাজ্জেল হক, কুষ্টিয়া বিশেষ জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দিন রিমন ও জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাসানুল আসকার হাসু। এ ছাড়া সাবেক ছাত্রনেতা সরোয়ার জাহান বাদশার নামও শোনা যাচ্ছে।

এদিকে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপিতেও প্রার্থী নিয়ে জট দেখা দিতে পারে বলে জানা গেছে। উপজেলা বিএনপির সভাপতি, সাবেক এমপি রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লাকে দলের একক প্রার্থী মনে করে বেশির ভাগ নেতাকর্মী। তবে ২০০৮ সালে মনোনয়ন পাওয়া জেলা বিএনপির সহসভাপতি আলতাফ হোসেন শেষ পর্যন্ত বাচ্চু মোল্লার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারেন। পাশাপাশি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহীদ সরকার মঙ্গল ও বিএনপির নেতা অ্যাডভোকেট রমজান আলী সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন। বড় দুই দলের বাইরে জাতীয় পার্টি থেকে সাবেক প্রতিমন্ত্রী কোরবান আলীর ছেলে, জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার জামিল জুয়েল ও জাপা মঞ্জু গ্রুপ থেকে সাবেক ছাত্রনেতা ও ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন মনোনয়ন চাইবেন। এ জন্য তাঁরা নির্বাচনী প্রচারণাও চালাচ্ছেন। এ ছাড়া উপজেলা জাসদের (ইনু) সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম নির্বাচন করবেন বলে মাঠে রয়েছেন।

কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা)

কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে গত নির্বাচনে জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তবে আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এ আসনে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর অন্যতম শরিক জাসদের নেতাকর্মীরা। দুই দলের কোন্দল এখন প্রকাশ্য। আগামী নির্বাচনে হাসানুল হক ইনু নৌকার প্রার্থী হলে তাঁকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবেন চান মাহবুবউল আলম হানিফের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত মিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান কামারুল আরেফিন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে চান বলে ঘোষণা দিয়ে মাঠে রয়েছেন। এদিকে আসনটি ফিরে পেতে তৎপর বিএনপি। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সাংসদ অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরী ও ঢাকা মহানগর মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন ধানের শীষের প্রার্থী হতে জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে ২০ দলীয় জোটভুক্ত জামায়াত নেতা আব্দুল গফুরকে দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে জোটভুক্ত জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) কেন্দ্রীয় নেতা আহসান হাবিব লিংকনও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন।

কুষ্টিয়া-৩ (সদর)

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনের বাসিন্দা হলেও জোটগত নির্বাচনের কারণে গত নির্বাচনে আসনটি জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ছেড়ে দিতে হয়। ওই নির্বাচনে হানিফ কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন পান। এ আসনে তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনএফের প্রার্থী লিটন হোসেন। নির্বাচনের আগের দিন লিটন সংবাদ সম্মেলন করে তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন হানিফ। তবে আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে দলের হেভিওয়েট নেতা হানিফের জন্য নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া সহজ হবে না বলে মনে করছেন অনেকে। তবে হানিফ ছাড়াও এ আসনে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও কুষ্টিয়ার পৌর মেয়র আনোয়ার আলী, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আমিনুল হক রতন মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে জানা গেছে। কুষ্টিয়ার এ আসনে স্বাধীনতার পর বেশির ভাগ সময়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থীরা। তবে দীর্ঘ সময় পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খন্দকার রশীদুজ্জামান দুদু বিএনপির প্রার্থী অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিনকে ধরাশয়ী করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে ২০০১ সালে সোহরাব উদ্দিন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার আগে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও এ আসনে বিএনপির প্রার্থীরা নির্বাচিত হন।

এবার সোহরাব উদ্দিনের বাইরেও বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাঁরা হলেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শিল্পপতি জাকির হোসেন, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম এ শামীম আরজু ও ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামীম-উল-হাসান অপু। সোহরাব উদ্দিন এই আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এবারও তিনিই দলীয় মনোনয়ন পাবেন, এমনটিই সবার ধারণা।

জাতীয় পার্টি থেকে বেশ কয়েকজন প্রার্থী আলোচনায় আছেন। জাতীয় পার্টি জাফর গ্রুপ থেকে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর উল্লাহ খান চৌধুরী লাহরী, এরশাদ গ্রুপ থেকে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি নাফিজ আহমেদ খান টিটু ও মন্জু গ্রুপ থেকে মনোনয়ন চাইবেন সাবেক ছাত্রনেতা ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন। তাঁরা সবাই গণসংযোগ করছেন। জাসদ (ইনু) থেকে প্রচারণায় নেমেছেন জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মহসিন। বাংলাদেশ আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) থেকে প্রচারণায় আছেন কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ইলিয়াস আহম্মেদ বিপ্লব।

কুষ্টিয়া-৪ (খোকসা-কুমারখালী)

এই আসনে ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আব্দুর রউফ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আগামী নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে গণসংযোগ করছেন। তবে দলীয় কোন্দলসহ বিভিন্ন কারণে তাঁর সঙ্গে দলের প্রভাবশালী নেতাদের দূরত্ব ও টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে দলের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। তাঁরা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য সুলতানা তরুণ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও খোকসা উপজেলা চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, কুমারখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান খান, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়াম্যান জাহিদ হোসেন জাফর, কুমারখালী খানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার মেয়র শামছুজ্জামান অরুণ, জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক সুফি ফারুক ইবনে আবু বকর, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা নওশের আলী, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মিজানুর রহমান বিটু ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের শাহাবাগ থানা শাখার তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক অভি চৌধুরী। তাঁদের সবারই এলাকায় কমবেশি জনপ্রিয়তা রয়েছে। তবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতা সবারই নেই।

অন্যদিকে এই আসনে ২০ দলীয় জোট থেকে সাবেক এমপি ও কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী গণসংযোগ করছেন। তিনি ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পাশাপাশি বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নুরুল ইসলাম প্রামাণিক আনসার ও অ্যাডভোকেট গোলাম মহম্মদের নাম শোনা যাচ্ছে। জাতীয় পার্টি থেকে এ আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন সাবেক ছাত্রনেতা সুমন আশরাফ।



মন্তব্য