kalerkantho


চার দিনের সন্তানকে ছুড়ে পাঁচতলা থেকে লাফ দিলেন মা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি   

২০ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



চার দিনের সন্তানকে ছুড়ে পাঁচতলা থেকে লাফ দিলেন মা

‘তোর বাচ্চা আমি পালুম না।’ দেখিস, সকালে উইঠ্যা আমি কী করি।’ মাঝরাতে স্বামীর সঙ্গে এভাবেই ফোনে ঝগড়া করছিলেন মা সীমা আক্তার। পাশে তখন চার দিনের নবজাতক। সীমা স্বামীকে ফোনে বলেছিলেন, হাসপাতালের বিল ২০ হাজার টাকা আসতে পারে। ফোনের ওপ্রান্ত থেকে বাহরাইনপ্রবাসী স্বামী কিছু একটা বলতেই সীমা চিৎকার করে ওই কথা বলেন। তারপর সারা রাত নবজাতক সন্তানের কান্না থামানোরও চেষ্টা তিনি করেননি। সকালে সন্তান নিয়ে পাশের হাসপাতালের পাঁচ তলার ছাদে উঠে যান। প্রথমে শিশুটিকে তিনি শূন্যে ছুড়ে মারেন। তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সীমা নিজেও ঝাঁপ দেন। সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যার এ নৃশংস ঘটনাটি ঘটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ভাইরাল হয়ে যায়।

সীমা আক্তার জেলার আখাউড়া উপজেলার কল্যাণপুর গ্রামের বিল্লাল মিয়ার মেয়ে ও সদর উপজেলার বাসুদেব ইউনিয়নের ঘাটিয়ারার ফুলচংয় গ্রামের লেবাননপ্রবাসী মো. মনির হোসেনের স্ত্রী। তিনি পাশের লাইফ কেয়ার শিশু হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এবং চার দিন আগে সন্তানের জন্ম দেন। তবে তিনি আত্মহত্যা করেন ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের ছাদে উঠে। পৌর এলাকার কুমারশীল মোড়ে হাসপাতাল দুটির অবস্থান।

রাস্তার ওপারই অবস্থান আরেকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের—সন্ধানী শিশু চাইল্ড কেয়ার হসপিতাল। এ হাসপাতালের দারোয়ান শিমুল মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, একটি শিশুর রাস্তায় আছড়ে পড়ার দৃশ্য দেখে তিনি ওপরে তাকান। শিমুল একজন নারীকে ছাদে দাঁড়ানো দেখে অনুমান করেন, ওই নারীও ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে শিমুল চিৎকার করে ওই নারীকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন, সেই সঙ্গে তিনি মোবাইল ফোনের ক্যামেরার ভিডিও বাটনে চাপ দেন। ভিডিওতে দেখা যায়, রাস্তায় বেশ কিছু মানুষ ভয়ে চিৎকার করে বলছে লাফ না দিতে। কিন্তু সীমা আক্তার কারো কথা শোনেননি। এদিকে শিমুলের তোলা ভিডিওতে তাঁর আত্মহত্যার নৃশংস দৃশ্যটি আগাগোড়া ধারণ হয়ে যায়।

শিমুল সাংবাদিকদের বলেন, মুহূর্তের মধ্যে কয়েকজন ওই ভবনের ছাদে ওঠার জন্য দৌড় দিয়েছিল। কিন্তু কেউ কিছু করার আগেই সব শেষ হয়ে যায়।

সীমার মা রেহেনা বেগমও হাসপাতালে ছিলেন। তিনি বলেন, সকালে তিনি নাশতা আনতে বাইরে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখেন মেয়ে ও নাতি নেই। পরে খবর পান পাশের হাসপাতালের ভবন থেকে পড়ে সীমা ও তার বাচ্চা মারা গেছে। তবে সীমা কেন এ কাজ করেছেন এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে চাননি।

রাতের ঘটনার প্রত্যক্ষশ্রোতা লাইফ কেয়ার হাসপাতালের ৩০৩ নম্বর কেবিনের রোগীর স্বজন কসবা উপজেলার ফরিদা খাতুন। তিনি জানিয়েছেন, সীমা ছিলেন ৩০২ নম্বর কেবিনে। দুই কক্ষ মিলে একটি এসি। এ কারণে মাঝখানে ফুটো রয়েছে এবং এক কেবিনের অনেক কথা পাশের কেবিন থেকে শোনা যায়। ফরিদা খাতুন সাংবাদিকদের বলেন, রাতে স্বামীর সঙ্গে সীমার ঝগড়া তিনি শুনেছেন। স্বামীকে হুমকি দেওয়ার পর সীমা রাতে বাচ্চাকে সম্ভবত দুধ দেয়নি বলেও ফরিদার সন্দেহ। কারণ সারা রাত বাচ্চাটি কাঁদছিল।

জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে লাশ দুটির ময়নাতদন্ত হয়েছে। অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা করেছে পুলিশ। তদন্তকারী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বাবু জানিয়েছেন, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত লাশ মর্গেই পড়ে ছিল। কেউ বুঝে নিতে আসেনি। বিল ১৬ হাজার টাকার কিছু বেশি এসেছে জানিয়ে হাসপাতালের মালিক দেলোয়ার হোসেন খান বলেন, প্রসব ও চার দিনের চিকিৎসা ধরলে এ বিল বেশি না। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘রাতের বেলা মা ও স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথাকাটাকাটি হয় ওই নারীর। তিনি মানসিক আঘাত পেয়ে এ ধরনের কাজ করে থাকতে পারেন।’

 



মন্তব্য