kalerkantho


চারটি আসনই চায় আ. লীগ, বিএনপির প্রত্যাশা পুনরুদ্ধার

বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্ত্তী, বাগেরহাট   

১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



চারটি আসনই চায় আ. লীগ, বিএনপির প্রত্যাশা পুনরুদ্ধার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এরই মধ্যে বাগেরহাট জেলার নির্বাচনী মাঠ সরব হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। বাগেরহাট জেলার চারটি আসনের মধ্যে কোনো কোনোটিতে আওয়ামী লীগ ও  বিএনপির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন। কোন দল থেকে কে মনোনয়ন পাচ্ছেন—এমন আলোচনা চলছে শহর-বন্দর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। তবে ভোটারদের বেশি জানার আগ্রহ বড় দুটি রাজনৈতিক দল থেকে জেলার চারটি আসনে কাদের মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। নবম ও দশম সংসদ নির্বাচনে বাগেরহাটের চারটি আসন আওয়ামী লীগের দখলে রয়েছে। আগামী নির্বাচনেও বাগেরহাটের চারটি আসন ধরে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে বিএনপি চাচ্ছে হারানো আসনগুলো পুনরুদ্ধার করতে।

বাগেরহাট-১ (চিতলমারী-মোল্লাহাট-ফকিরহাট) আসনে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য বঙ্গবন্ধুর ভ্রাতুষ্পুত্র ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দীন। ২০১৪

সালের নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে বর্তমান সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দীন প্রার্থী হবেন বলে দলীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছে। এ আসনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ। নানামুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দীন।

বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ কামরুজ্জামান টুকু জানান, এ আসনে অন্য রাজনৈতিক দলের তেমন কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই। এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে অন্য দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হতে পারবেন না জেনে কেউ আর উদ্যোগী হন না। তিনি আরো জানান, বাগেরহাট-১ আসন থেকে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা অথবা তাঁর চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দীন প্রার্থী হতে পারেন।

অন্যদিকে এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে বাগেরহাট জেলা বিএনপির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট ওয়াহিদুজ্জামান দিপু, বিএনপি নেতা মঞ্জুর মোর্শেদ স্বপন, জেলা বিএনপির সহসভাপতি প্রকৌশলী শেখ মাসুদ রানা, শেখ রবিউল ইসলাম ও জেলা বিএনপির উপদেষ্টা শেখ মুজিবুর রহমানের নাম শোনা যাচ্ছে। বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ও ওয়াহিদুজ্জামান দিপু একাধিকবার সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।

এ আসনে জাতীয় পার্টির অঙ্গসংগঠন ওলামা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা এস এম আল জোবায়ের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।

বাগেরহাট-২ (বাগেরহাট-কচুয়া) আসনে ১৯৯১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে তিনবার আওয়ামী লীগ এবং দুইবার বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের মীর শওকাত আলী বাদশা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এ আসন থেকে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্যকে নিয়ে দলে চাপা ক্ষোভ থাকলেও রাজপথে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বর্তমান সংসদ সদস্য মীর শওকাত আলী বাদশা নানা কারণে দলের মধ্যে সমলোচিত। তাঁকে নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এ কারণে আগামী নির্বাচনে এ আসনে বঙ্গবন্ধুর ভ্রাতুষ্পুত্র ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দীনকে প্রার্থী করলে বিজয় নিশ্চিত হবে।

এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মীর শওকাত আলী বাদশা ও সাবেক সংসদ সদস্য মীর সাখাওয়াত আলী দারুর সহধর্মিণী ফরিদা আক্তার বানু লুসী। তবে দলের নেতাকর্মীরা চাচ্ছে শেখ হেলাল উদ্দীনকে।

মীর শওকাত আলী বাদশা বলেন, ‘২০০৮ ও ২০১৪ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এলাকার মানুষের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। নির্বাচনী ইশতেহারের বেশির ভাগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনেও আমি দলের কাছে মনোনয়ন চাই। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে নির্বাচনে অংশ নেব। অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে কাজ করব।’

ফরিদা আক্তার বানু লুসী বলেন, ‘এলাকার মানুষের কাছ থেকে এরই মধ্যে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। আমাকে নিয়ে বাগেরহাট-কচুয়ার মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আগামী নির্বাচনে আমি দলের কাছে মনোনয়ন চাই। মনোনয়ন পেলে বিজয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’

অন্যদিকে এ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বাগেরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি শিল্পপতি এম এ সালাম ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি মনিরুল ইসলাম। তবে প্রচার-প্রচারণায় এম এ সালাম এগিয়ে আছেন।

এম এ সালাম বলেন, ‘দল এবং দলের নেতাকর্মীদের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি আমি। হামলা-মামলা, নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে বাগেরহাটে দলের অবস্থান ধরে রেখেছি। আগামী সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। দলীয় মনোনয়ন পেলে বিজয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’

এ আসনে অন্যান্য দলের মধ্যে জাতীয় পার্টির বাগেরহাট জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাজরা শহীদুল ইসলাম বাবলু দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী। আর কমিউনিস্ট পার্টির বাগেরহাট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ফররুখ হাসান জুয়েলও এ আসনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। এ ছাড়া বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব বেগ মাহ্তাব উদ্দীনও মনোনয়নপ্রত্যাশী।

বাগেরহাট-৩ (রামপাল-মোংলা) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হাবিবুন নাহার তালুকদার। ২০১৪ সালে এ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য তালুকদার আব্দুল খালেক সংসদ সদস্য পদ ছেড়ে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর উপনির্বাচনে হাবিবুন নাহার এ আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আসনটি ১৯৯১ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ধরে রেখেছে। রামপাল ও মোংলা উপজেলায় সব ক্ষেত্রে যে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এই জনপদ তার সাক্ষ্য দিচ্ছে।

২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে আসনটি বিএনপি চারদলীয় ঐক্যজোটের শরিক দল জামায়াতকে ছেড়ে দেয়। জোটবদ্ধ নির্বাচনে এ আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী পরাজিত হলেও প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা কম নয়। এ কারণে আসনটিতে জামায়াতের অবস্থান ভালো বলে তারা দাবি করে। তবে একাদশ নির্বাচনে আসনটি বিএনপি শরিকদের ছাড়তে না রাজ। এ কারণে বিএনপির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রচার-প্রচারণায় নেমেছেন।

এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য হাবিবুন নাহার তালুকদার, চিত্রনায়ক শাকিল খান ও খুলনা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শেখ আবু হানিফ।

আওয়ামী লীগ মনে করে, এ আসনে দলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ। আগামী নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী তাদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে চিড় ধরাতে পারবেন না।

হাবিবুন নাহার তালুকদার বলেন, ‘এ আসনে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। এ বছর উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচিত হয়ে উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আগামী নির্বাচনে দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। দল থেকে মনোনয়ন দিলে বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী আমি।’

অন্যদিকে এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সহসভাপতি সরদার মো. অজিয়ার রহমান, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী রেজা বাবু ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহপ্রচার সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীম।

এ ছাড়া কমিউনিস্ট পার্টির বাগেরহাট জেলা কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নুর আলম এ আসনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। এর বাইরে বাগেরহাট জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট মাওলানা আবদুল ওয়াদুদ এ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান।

বাগেরহাট-৪ (শরণখোলা-মোরেলগঞ্জ) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. মোজাম্মেল হোসেন। ১৯৯৬, ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিট নিয়ে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গত সংসদ নির্বাচনে বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে তিনটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রবীণ এই নেতা এবারও শেষবারের মতো দলের কাছে মনোনয়ন চান। এ ছাড়া রয়েছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট আমিরুল আলম মিলন ও আওয়ামী লীগ নেতা শিল্পপতি মো. জামিল হোসাইন। 

আওয়ামী লীগ মনে করে, বর্তমানে এ আসন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। আগামী নির্বাচনে এ আসন আওয়ামী লীগের দখলেই থাকবে। অন্যদিকে এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি কাজী খায়রুজ্জামান শিপন, জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও জিয়া গবেষণা কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় সভাপতি ড. কাজী মনিরুজ্জামান মনির এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।

এ ছাড়া আগামী নির্বাচনে এ আসনে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী শহীদুল ইসলাম।

 



মন্তব্য