kalerkantho


আওয়ামী লীগের কেউ কেউ বিতর্কিত, বিএনপি বিচ্ছিন্ন

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



আওয়ামী লীগের কেউ কেউ বিতর্কিত, বিএনপি বিচ্ছিন্ন

দিন যত গড়াচ্ছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজশাহী জেলার রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মতৎপরতাও তত বাড়ছে। নিজ নিজ দল থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা তাঁদের অনুসারীদের নিয়ে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণায় ব্যস্ত থাকছেন।

রাজশাহী জেলার ছয়টি আসনের সব কটিতে ১০ বছর ধরে সংসদ সদস্য আছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও মহাজোট মনোনীতরা। স্বাধীনতা-পরবর্তী এই প্রথম রাজশাহীতে সব কটি আসন টানা ১০ বছর নিজেদের দখলে রেখেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। এমনকি যে পাঁচটি আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য রয়েছে, এর আগে এত দীর্ঘ সময় কখনো সম্ভব হয়নি। অবশ্য এই দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকায় কিছু কিছু কর্মকাণ্ডে নিজ দলের নেতাকর্মীদের কাছেই বিতর্কিত হয়ে উঠেছেন কোনো কোনো সংসদ সদস্য। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায়, এলাকায় না যাওয়ায় এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা না করায় বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্যরা অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। একদিকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড অন্যদিকে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্যদের এলাকা ও নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার বিষয়গুলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।  

তথ্য মতে, রাজশাহী জেলার সংসদ সদস্যদের একক ক্ষমতা ও অপ্রত্যাশিত কর্মকাণ্ড মেনে নিতে না পেরে তাঁদের প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়ে মাঠে নেমেছেন আওয়ামী লীগের অনেক তরুণ নেতা। আগামী নির্বাচনে নিজেদের মনোনয়নপ্রত্যাশী ঘোষণা দিয়ে প্রচারণাও শুরু করেন তাঁরা। রাজশাহী জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের অন্তত ২০ জন নেতা। এই তরুণ মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বর্তমান সংসদ সদস্যদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছেন বলে দাবি করছে তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

রাজশাহীর-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে এবার নিজ দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য ফারুক চৌধুরী। বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া ফারুক চৌধুরী গত ১০ বছরে এলাকায় একক ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। এটি করতে গিয়ে তিনি কখনো কখনো নিজ দলের অনুসারী কিংবা নেতাকর্মীদের ওপরই হামলা-মামলার আশ্রয় নেন। এর ফলে রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলায় তাঁর বিপক্ষে অবস্থান নেয় দলের বড় একটি অংশ। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অন্য অঙ্গসংগঠনের সমর্থন হারাতে থাকেন তিনি। আবার আগামী নির্বাচনে ফারুক চৌধুরীকে মনোনয়ন না দেওয়ার দাবিতে সাতজন প্রার্থী একসঙ্গে প্রচারণায় মাঠে নামেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মণ্ডুমালা পৌরসভার মেয়র গোলাম রাব্বানী, গোদাগাড়ী পৌর মেয়র রবিউল আলম, পুলিশের সাবেক আইজিপি মতিউর রহমান প্রমুখ।

তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মুণ্ডুমালা পৌর মেয়র গোলাম রাব্বানী বলেন,  ‘আওয়ামী লীগ বড় রাজনৈতিক দল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দলের একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। মনোনয়ন প্রত্যাশা করা দোষের কিছু নয়। দল সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে বাছাই করে মনোনয়ন চূড়ান্ত করবে। দল আমাকে ছাড়া যদি অন্য কাউকে এ আসনে মনোনয়ন দেয় আমি তাঁর পক্ষে কাজ করব। দলের বাইরে আমি নই।’

এদিকে এই আসনে বিএনপি থেকে এবারও হেভিয়েট প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক। তিনি ছাড়াও এবার বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইছেন জেলা যুবদলের সভাপতি কে এম সাজেদুর রহমান খান মারকনি, মুণ্ডুমালা পৌর বিএনপির সভাপতি মোজাম্মেল হকের ছেলে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী শাহাদৎ হোসেন শাহিন, দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহুরুল ইসলাম, সাবেক যুগ্ম সচিব গোলাম মোর্তজা।

রাজশাহী-২ (সদর) আসনে এবারও মহাজোটের প্রার্থী হচ্ছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। এমনটিই মনে করছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের নেতারা। গত ৫ অক্টোবর রাসিকের নবনির্বাচিত মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণ অনুষ্ঠানে সে ধরনের ইঙ্গিতই দিয়েছেন। কিন্তু তার পরও এ আসনটি এবার নিজেদের দখলে নিতে মাঠে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার, তরুণ নেতা আহসানুল হক পিন্টু, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান বাবু, মহানগর যুবলীগের সভাপতি রমজান আলী প্রমুখ।

অন্যদিকে এ আসন থেকে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনুর নাম বেশি শোনা যাচ্ছে। এর বাইরে অন্য কারো নাম শোনা যাচ্ছে না। 

রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে পাঁচ বছর ধরে এমপি রয়েছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আয়েন উদ্দিন। আগামী নির্বাচনে এ আসন থেকে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। তবে দলের আরেক নেতা আসাদুজ্জামান আসাদ এবার প্রচারণা চালাচ্ছেন দলের প্রার্থী হতে। এই দুজনের পক্ষেই দলের নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে বর্তমানে প্রচারণায় ব্যস্ত রয়েছে।

অন্যদিকে এ আসনে বিএনপি থেকে যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে তাঁরা হলেন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা সাবেক এমপি কবীর হোসেন, রাজশাহী বিভাগের সহসাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহিন সকত, নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মন্টু। এর মধ্যে শফিকুল হক মিলন প্রচারণায় এগিয়ে আছেন। কবীর হোসেন বার্ধক্যজনিত কারণে দলের মনোনয়ন পাবেন কি না, সেটি নিয়ে সংশয় রয়েছে।

রাজশাহী-৪ আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকের বাইরে মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন তাহেরপুর পৌর মেয়র আবুল কালাম আজাদ ও বাগমারা উপজেলা চেয়ারম্যান জাকিরুল ইসলাম সান্টু। এনামুল হককে নিয়ে বাগমারায় নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে বিএনপি-জামায়াত নেতাদের পুনর্বাসনের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ নিয়ে তাঁকে প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামে দলের নেতাকর্মীরা।

এ আসনে বিএনপি থেকে এবার মনোনয়ন পেতে চেষ্টা চালাচ্ছেন সাবেক এমপি ও রাজশাহী জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মুহাম্মদ আব্দুল গফুর, বাগমারা-মোহনপুর আসনের সাবেক এমপি আবু হেনা, জিয়া পরিষদের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক জাহিদ দেওয়ান শামীম, রাজশাহী জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও বাগমারা উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক মকলেছুর রহমান মণ্ডল, জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও ভবানীগঞ্জ পৌর সভার সাবেক মেয়র আব্দুর রাজ্জাক প্রামাণিক এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ডি এম জিয়াউর রহমান।

রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে গত ১০ বছর সংসদ সদস্য হিসেবে রয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা কাজী আব্দুল ওয়াদুদ দারা। তাঁকে নিয়েও এলাকায় রয়েছে নানা বিতর্ক। এ নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বড় ধরনের বিভেদ তৈরি হয়েছে। ফলে এবার এমপিবিরোধী জোট তৈরি হয়েছে পুঠিয়া-দুর্গাপুরে। সে ক্ষেত্রে এই আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে জেলা যুবলীগের সহসভাপতি ওবাইদুর রহমান, সাবেক এমপি তাজুল ইসলাম মোহাম্মাদ ফারুক, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহসানুল হক মাসুদ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ সরদার ও আওয়ামী লীগ নেতা মুনসুর রহমানের নাম শোনা যাচ্ছে। একই সঙ্গে এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের তরুণ মনোনয়নপ্রত্যাশী ওবাইদুর রহমানকে ঘিরে নেতাকর্মীরা বেশ উজ্জীবিত। 

বিএনপি থেকে এই আসনে নাম শোনা যাচ্ছে সাবেক এমপি নাদিম মোস্তফা, দুর্গাপুরের দেলুয়াবাড়ী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি গোলাম সাকলাইন, পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি খাইরুল ইসফাক হক শিমুল ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবু বকর সিদ্দিকের নাম।

রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘা) আসনে ১০ বছর ধরে সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহিরয়ার আলম। এবার তিনি ছাড়াও মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক এমপি রায়হানুল হক ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি লায়েব উদ্দিন লাভলু। রাজশাহীর অন্য পাঁচটি আসনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ থাকলেও এ আসনে নেই।

বিএনপি থেকে এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও চারঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান আবু সাইদ চাঁদ, বাঘা উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুজ্জামান খান মানিক, জেলা বিএনপির সহসভাপতি বজলুর রহমান ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন উজ্জল এবং বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দেবাশীষ রায় মধু, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন।

আওয়ামী লীগে বিরোধ নেই

কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি



মন্তব্য