kalerkantho


সুনসান ‘আইভি ভবন’ রায়ে রুষ্ট ভৈরববাসী

তারেকের ফাঁসি চেয়ে বিক্ষোভ

নাসরুল আনোয়ার, ভৈরব থেকে ফিরে    

১১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



সুনসান ‘আইভি ভবন’ রায়ে রুষ্ট ভৈরববাসী

কিশোরগঞ্জের ভৈরব শহরের ভৈরবপুর উত্তরপাড়ায় হাজী বলাকী মোল্লার বাড়ির প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের বাড়ির নাম ছিল ‘গৃহকোণ’। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় প্রিয়তম স্ত্রী আইভি রহমানের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বাড়ির নাম বদলে রাখেন ‘আইভি ভবন’। গতকাল দুুপুরে যখন গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষিত হচ্ছিল, তখন আইভি ভবনের সামনে স্কুলগামী ১০-১২টি ছেলে ফুটবল খেলছে। এ প্রতিবেদককে দেখেই একজন বলল, ‘যান, গেট খোলা।’ বাড়িতে আইভি রহমানের পরিবারের কাউকে পাওয়া গেল না। কিছ লোক বাড়ির দেয়াল রং করছিলেন। রহিম নামে একজন জানালেন, রায় সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।

বাড়ির বাইরে দেখা হয় প্রয়াত রাষ্ট্রপতির চাচাতো ভাই মিজানুর রহমান বুলবুলের সঙ্গে। তিনি জানালেন, বাড়ি একরকম খালিই থাকে। মাঝেমধ্যে জিল্লুর-আইভি

দম্পতির একমাত্র ছেলে বিসিবি সভাপতি ও কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনের এমপি নাজমুল হাসান পাপন আসেন, দুই দিন আগেও তিনি এসে গেছেন। পাপনের দুই বোন তানিয়া ও তনিমা আসেন আরো কম। তাঁরা সবাই ঢাকায় গুলশানের ‘আইভি কটেজে’ থাকেন বলে বুলবুল জানালেন। তবে আইভি রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীতে এ বাড়িতেই মিলাদ পড়ানো হয়।

ততক্ষণে গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষিত হয়ে গেছে। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের ফাঁসি এবং তারেক রহমানসহ আরে ১৭ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ হওয়ার খবর চাউড় হয়ে গেছে। আইভি ভবনের সামনে খেলারত ছেলেদের একজন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র রাশেদীন রাহবার একটু ভেবে বলল, ‘সবগুলোকেই ফাঁসি দেওয়া দরকার ছিল।’ তবে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া রাজু, সামিক, রিফাত, সাহিল কিছু না ভেবে জানাল, এ রায়ে ওরা সবাই খুশি।

আইভি রহমান না থেকেও ভৈরবে মানুষের মনের গভীরে ঠাঁই নিয়ে আছেন। মিজানুর রহমান বুলবুল জানালেন, আইভি রহমান ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের মূল প্রেরণা। ভৈরববাসী তাই আইভি রহমানের কাছে ঋণী। জানা গেলে, কিশোরগঞ্জ জেলা, ভৈরব উপজেলা ও পৌর প্রশাসন নানাভাবে প্রয়াত আইভি রহমানকে নানাভাবে সম্মান ও স্বীকৃতি দিয়েছে। ভৈরব স্টেডিয়ামের নাম রাখা হয়েছে ‘আইভি রহমান পৌর স্টেডিয়াম’। তাঁর বাবার বাড়ি চণ্ডিবের এলাকায় ভৈরব-মেন্দপুর সড়কের পাশে আইভি রহমানের বিশাল পোর্ট্রেটসহ ‘আইভি চত্বর’ গড়া হয়েছে। পাশের একটি গ্রামের নাম রাখা হয়েছে ‘আইভি পাড়া’। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ভৈরব থানার পাশে আইভি রহমানের স্মৃতি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে।

আইভি রহমানের বাবার বাড়িও ভৈরব পৌরসভার চণ্ডিবের এলাকায়। সদর থেকে চণ্ডিবের যেতে যেতে চোখে পড়ল রাস্তার পাশের বিভিন্ন চায়ের স্টলে মানুষের ভিড়। সবাই টেলিভিশনে গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের লাইভ বিবরণ দেখছিল। তাদের অনেকেই বলছিল, ‘কেন তারেক রহমানের ফাঁসি দেওয়া হলো না?’

রায় ঘোষণার পর গতকাল দুুপুরে চণ্ডিবেরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে আইভি রহমানর নিজ গ্রামবাসী। মিছিলকারীরা স্লোগান দিচ্ছিল, ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, তারেক জিয়ার ফাঁসি চাই।’

আইভি রহমানের বাবা জালাল উদ্দিন ছিলেন ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল। তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল মানুষের ভিড়। আইভি রহমানের ভাইপো ফারহান একাই বাড়িতে। তিনি জানালেন, এ রায়ে ততটা খুশি হতে পারেনি এলাকার মানুষ। তবে তারেক রহমানের ফাঁসি চেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে রিভিউ করা হবে।

আইভি রহমানের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত এই গ্রাম। আইভির ছোটবেলার দিনগুলো কাছে থেকে দেখেছেন তাঁর চাচাতো ভাই অশীতিপর আমিনুল হক। তিনি জানালেন, ছোটবেলায় আইভি শান্ত স্বভাবের ও খুবই মিশুক প্রকৃতির ছিলেন। উদার মনের আইভি গ্রামে এলে সবার সঙ্গে মিশতেন, খোঁজখবর নিতেন। মামলার রায় শুনে অখুশি এ বৃদ্ধ বললেন, ‘তারেকের ফাঁসি চেয়েছিলাম। কিন্তু হলো না।’

মামলার রায়ের প্রতিক্রিয়ায় গতকাল বিকেলে ভৈরববাজারে মিছিল করেছে উপজেলা আওয়ামী লীগ। মিছিলে তারা স্লোগান দিয়েছে, ‘বাংলার মাটিতে তারেক জিয়ার ঠাঁই নাই’, ‘ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই, তারেক জিয়ার ফাঁসি চাই।’

ভৈরব উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের ঘনিষ্ঠজন মো. সায়দুল্লাহ মিয়া বলেন, ‘এ বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার মহানায়ক তারেক রহমানের ফাঁসির আদেশ হয়নি। তাই আমরা অসন্তোষ প্রকাশ করছি। উচ্চ আদালতের মাধ্যমে খুনি তারেক রহমানের ফাঁসি কার্যকরের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই।’

 



মন্তব্য