kalerkantho


দেবীদ্বার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

নার্স-আয়াদের হাতে নবজাতকের এমন পরিণতি!

দেবীদ্বার (কুমিল্লা) প্রতিনিধি   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নার্স-আয়াদের হাতে নবজাতকের এমন পরিণতি!

দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নবজাতকের খণ্ডিত দেহের অংশ নিয়ে এলাকায় তোলপাড় চলছে। রবিবার সকাল ৯টায় পথচারীরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রশিক্ষণ ভবনের পাশে নবজাতকের দেহের অংশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখে থানায় খবর দেয়। এর পরই এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। জানা গেছে, ডাক্তারকে না জানিয়ে নার্স-আয়ারা হাসপাতালে ভর্তি এক প্রসূতির সন্তান প্রসব করানোর চেষ্টা করে। রোগীর জটিল পরিস্থিতিতে নার্সদের সন্তান প্রসবের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এর পরই নবজাতকের দেহের অংশ রাস্তায় পাওয়া যায়।

ওই ঘটনা অনুসন্ধানে উপজেলা কমপ্লেক্সের গাইনি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. তামান্না আফতাব সোলাইমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. মঞ্জুর রহমান ও মেডিক্যাল অফিসার ডা. আহসানুল হক মিলু।

প্রত্যক্ষদর্শী ও রোগীর স্বজনরা জানায়, উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের রিকশাচালক সেলিম মিয়ার স্ত্রী প্রসূতি ফাতেমা বেগম (৩০) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী সার্জন ডা. নীলা পারভীনের তত্ত্বাবধানে মুন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিয়মিত রোগী ছিলেন। শনিবার দুপুর দেড়টায় ওই চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি আলট্রাসনোগ্রামসহ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান রোগীর অবস্থা ভালো না, ভালো কোনো হাসপাতালে তাঁর জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। পরে রোগীর স্বজনরা দুপুর আড়াইটায় দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইমার্জেন্সির দায়িত্বে থাকা ডা. রোমানা পারভীনের তত্ত্বাবধানে প্রসূতিকে ভর্তি করায়। রাতে দায়িত্বরত দুজন সিনিয়র নার্স আছিয়া আক্তার ও ঝরনা বেগম এবং আয়া জেসমিন আক্তার ডলির নেতৃত্বে প্রসূতিকে প্রসবের চেষ্টা করানো হয়। একপর্যায়ে নবজাতকের শরীরের অংশ বের করে আনলেও কিছু অংশ ভেতরে রয়ে যায়। পরে বিষয়টি গোপন রেখে নার্সরা রাত্রীকালীন ডিউটিরত মেডিক্যাল অফিসার ডা. আহসানুল হক মিলুর কাছ থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতেই কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের কাগজে সই করিয়ে নেয়। পরে দ্বিতীয় দফার চেষ্টায় নার্স ও আয়ারা নবজাতকের দেহাংশ বের করে আনে। কিন্তু বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায় তারা। কিন্তু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রশিক্ষণ ভবনের পাশে নবজাতকের শরীরের অংশ পড়ে থাকার বিষয়টি প্রকাশ পেয়ে যায়। ওই ঘটনায় প্রথমে কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স, আয়াসহ কেউই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেনি। পরে দায়িত্বরত নার্স ও আয়াদের জিজ্ঞাসাবাদে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসে।

রাত্রীকালীন ডিউটিরত মেডিক্যাল অফিসার ডা. আহসানুল হক মিলু জানান, রোগীর আশঙ্কাজনক অবস্থার কথা তাঁকে না জানিয়েই কর্তব্যরত নার্সরা কুমেক হাসপাতালে স্থানান্তরের কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়।

একই কথা জানালেন তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান ও গাইনি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. তামান্না আফতাব সোলাইমান। তিনি বলেন, তারা চিকিৎসকের সহযোগিতা ছাড়াই গোপনে ডেলিভারি করার চেষ্টা চালায়। সমস্যা দেখা দেওয়ার পরও চিকিৎসকদের না জানিয়ে নার্স আর আয়ারা ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। সাত মাসের অসম্পূর্ণ বাচ্চাটির হয়তো জন্মগত ত্রুটি ছিল। কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

নবজাতকের বাবা সেলিম মিয়া বলেন, ‘ডাক্তার নবজাতকের মৃত্যু সংবাদ দিলে আমরা ভেঙে পড়ি। পরে নার্সরা তাঁকে নিয়মানুযায়ী মৃত নবজাতককে বের করে আনার কথা বলে। রোগী ভেতরে থাকায় আমরা কিছুই জানতে পারিনি। পরে এমন খবর পেলাম। আমরা গরিব মানুষ। কিভাবে কী হলো বুঝতে পারলাম না।’

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী সার্জন ডা. নীলা পারভীন বলেন, ‘তিনি আমার নিয়মিত রোগী ছিলেন। আলট্রাসনোতে শিশুটি মৃত মনে হওয়ায় রোগীর অভিভাবককে কুমেক হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেছিলাম। তবে ব্যবস্থাপত্রে রেফারের বিষয়টি উল্লেখ করিনি।’

এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহাম্মদ কবীর বলেন, নার্সদের আয়ত্তের বাইরে থাকার পরও ডেলিভারির চেষ্টা করেছে তারা। কারোর সহযোগিতা চাওয়া বা ঘটনাটি গোপন করার চেষ্টা করেছে তারা, যা কোনোভাবেই পেশাগত দায়িত্বে পড়ে না। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. মজিবুর রহমান বলেন, টিএইচওকে নির্দেশ দিয়েছি তদন্ত কমিটি গঠনপূর্বক তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনিয়ম-দুর্নীতি, চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি নিয়েও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।



মন্তব্য