kalerkantho


কোন্দলেও সক্রিয় আ. লীগ ছিন্নভিন্ন বিএনপি

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল ও শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ    

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



কোন্দলেও সক্রিয় আ. লীগ ছিন্নভিন্ন বিএনপি

রাজনীতি ও মনোনয়ন নিয়ে বড় দুই দলেই আছে কোন্দল। এ ক্ষেত্রে আবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমস্যা বেশি। এ হচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে কিশোরগঞ্জের রাজনৈতিক মাঠের চিত্র। এদিকে মনোনয়নযুদ্ধে ক্ষমতাসীন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা যতটা সক্রিয়, ততটা নন বিএনপির প্রার্থীরা। জেলার সব আসনে প্রার্থীদের নির্বাচনকেন্দ্রিক তৎপরতাও সমান নয়। এর মধ্যে অদ্ভুত নীরবতা কিশোরগঞ্জ-১ আসনে। স্থানীয় সংসদ সদস্য জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এখানে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচন করতে চান বলে আর কোনো মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রকাশ্যে নেই। ৪ ও ৬ আসনের মনোনয়ন নিয়েও দলে বড় কোনো বিরোধ নেই বলে জানা গেছে। বিএনপিতে ছয় আসনেই কমবেশি বিরোধ রয়েছে, তবে এতটা প্রকাশ্যে নয়।

কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) : সৈয়দ আশরাফ এ আসন থেকে পর পর চারবার নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি বিদেশে চিকিৎসাধীন। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে দারুণ জনপ্রিয় তিনি এলাকায়। জাতীয় চার নেতার একজন মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে হিসেবেও বাড়তি কদর রয়েছে তাঁর। দলের নেতাকর্মীদের মতে, এ আসনে তাঁর বিকল্পও নেই। তবে অসুস্থতার কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি যদি নির্বাচন না করেন, তাহলে হয়তো তাঁরই পরিবারের কাউকে দলীয় হাইকমান্ড মনোনয়ন দিতে পারে বলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের ধারণা।

অন্যদিকে কোন্দলে জর্জরিত বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রে লবিংসহ এলাকায় টুকটাক জনসংযোগ করছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন বর্তমান জেলা বিএনপির উপদেষ্টা মাসুদ হিলালী, সহসভাপতি ঢাকা বিভাগীয় স্পেশাল জজ রেজাউল করিম খান চুন্নু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইসরাইল মিয়া, সহসভাপতি ওয়ালীউল্লাহ রাব্বানী এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় তথ্য সেলের সদস্যসচিব সালাউদ্দিন আহমেদ সেলু। তবে কেউ কেউ মনে করছেন, আসনটি পুনরুদ্ধারে এবার বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মীর্জা আব্বাসকে এ আসন থেকে মনোনয়ন দিতে পারে দল। এদিকে জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আশরাফউদ্দিন রেণু ও সহসভাপতি মোস্তফা খান পাঠান দলের মনোনয়ন চান বলে জানা গেছে। বাম দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমানুল হক দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এলাকায় সভা-সমাবেশ করে বেড়াচ্ছেন। 

কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) : জেলায় এ আসনে মনোনয়ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা। চলছে গণসংযোগের পাশাপাশি বড় বড় শোডাউন, সভা-সমাবেশ। বেশি ব্যস্ততা ক্ষমতাসীন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের। দুই দলেরই সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থান রয়েছে এখানে। বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. সোহরাব উদ্দিন এবারও নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করতে চান; মাঠ চষেও বেড়াচ্ছেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে সাবেক আইজিপি ও কূটনীতিক নূর মোহাম্মদ দীর্ঘদিন এলাকায় গণসংযোগ করছেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আরো আছেন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এম এ আফজল, পাকুন্দিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রেনু, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোখলেছুর রহমান বাদল, দলীয় নেতা মঈনুজ্জামান অপু ও কটিয়াদী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লায়ন আলী আকবর।

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে দল থেকে বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জন মাঝেমধ্যে এলাকায় গিয়ে সভা-সমাবেশও করছেন। বিএনপির টিকিটপ্রত্যাশীদের মধ্যে আরো আছেন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী জেলা বিএনপির সহসভাপতি আশফাক আহমেদ জুন, জেলা বিএনপির উপদেষ্টা মো. ইদ্রিছ আলী, পাকুন্দিয়া বিএনপির আহ্বায়ক সাবেক পৌর মেয়র জালাল উদ্দিন ও জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক শহীদুজ্জামান কাকন। সিপিবির প্রার্থী হিসেবে সভা-সমাবেশসহ মাঠে কাজ করছেন কিশোরগঞ্জ জেলা সিপিবির সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) : শক্ত অবস্থান থাকলেও আওয়ামী লীগ গত দুটি নির্বাচনে মিত্র জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয় আসনটি। বর্তমান এমপি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক চুন্নু এ আসন থেকে দুবার জাপার প্রার্থী হয়ে, শেষ দুবার আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক ও মিত্র দলের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। এবারও তিনি গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন, যা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হতাশার কারণ হয়ে আছে। আসনটিতে ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক অবস্থাও বিভেদে নাজুক। এর পরও এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন বেশ কয়েকজন নেতা। তাঁরা হলেন দুইবারের সংসদ সদস্য ড. মিজানুল হক, উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক নাসিরুল ইসলাম খান আওলাদ, জেলা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহসভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. এরশাদ উদ্দিন, তথ্য ও প্রযুক্তি খাতের সফল ব্যবসায়ী মুক্তিযোদ্ধা শেখ কবীর আহমেদ, কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আসাদুল হক, জেলা বিএমএ নেতা ও জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহবুব ইকবাল ও ব্রিটেনপ্রবাসী ড. আনিছুর রহমান আনিছ।

বিএনপির ভরসা সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক। ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রী হন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ খতিয়ে দেখছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এ কারণে দেশ ছেড়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন। তিনি হয়তো নির্বাচন করবেন না—এমন বিকল্প ভাবনা থেকে মাঠে কাজ করছেন কয়েকজন মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতা। তাঁরা হলেন ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি জালাল মোহাম্মদ গাউস ও জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম সুমন। সিপিবির প্রার্থী হিসেবে কৃষক সমিতির জেলা সভাপতি ডা. এমানুল হক ইদ্রিস গণসংযোগ করছেন।

কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) : হাওর অধ্যুষিত এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক। তিনি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বড় ছেলে। মো. আবদুল হামিদ সাতটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে নির্বাচিত হন। তৌফিক এবারও দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুবাদে তৌফিক নেতাকর্মীদেরও প্রিয়। তবে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিঠামইন উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান কামরুল আহসান শাহজাহান মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন।

এ আসনে বিএনপি থেকে বেশ কয়েকজন নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন, যদিও তাঁরা গণসংযোগে নেই। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য মো. ফজলুর রহমান, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান ভূঞা, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সাবেক ট্রাস্টি ও সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা সুরঞ্জন ঘোষ, ইটনা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, বিএনপির সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম রতন, সাবেক সংসদ সদস্য ফরহাদ আহাম্মদ কাঞ্চনের ছেলে ড্যাব নেতা ডা. ফেরদৌস আহমেদ চৌধুরী লাকী, মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর ও অষ্টগ্রামের ব্যবসায়ী সৈয়দ অসীম।

কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) : আওয়ামী লীগের এমপি মো. আফজাল হোসেন এবারও নির্বাচন করবেন এবং গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া আরো আটজন মনোনয়নপ্রত্যাশীর নাম শোনা যাচ্ছে। বিএনপিতে রয়েছেন ১০ জন। আছেন সিপিবি ও মুসলিম লীগের একজন করে প্রার্থী। বিএনপির মজিবুর রহমান মঞ্জুকে পরাজিত করে আফজাল আলোচিত হলেও নির্বাচনের পর তিনি ‘বিতর্কিত’ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। অন্তত ছয়জন মনোনয়নপ্রত্যাশী সম্প্রতি বাজিতপুরে এমপি আফজালের বিরুদ্ধে সমাবেশ করেছেন। তবে দলীয় সূত্র মতে, গণভিত্তির সুবাদে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন তিনিই পেতে পারেন।

নৌকা প্রতীক প্রত্যাশীদের মধ্যে আরো আছেন বাজিতপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আলাউল হক, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক আহ্বায়ক শেখ নূরুন্নবী বাদল, মুক্তিযোদ্ধা ও ব্যবসায়ী আবুল মনসুর বাদল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অজয় কর খোকন, সাংবাদিক ও ব্যাংকার ফারুক আহাম্মদ, সাবেক ছাত্রনেতা বাজিতপুর উপজেলা যুবলীগের সভাপতি গোলাম রসুল দৌলত, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিল্টন ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক উপকমিটির সদস্য কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা শহীদুল্লাহ মুহাম্মদ শাহ নূর।

বিএনপিতেও রয়েছে বিভক্তি এবং গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন ধানের শীষ প্রতীক প্রত্যাশীরাও। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও ব্যবসায়ী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল। দুই উপজেলায় গণসংযোগ করে যাচ্ছেন তিনি। এ ছাড়া জেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. ছালেহুজ্জামান খান রুনু, শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক তফাজ্জল হোসেন বাদল, বাজিতপুর পৌরসভার মেয়র ও পৌর বিএনপির সভাপতি এহেসান কুফিয়া, ছাত্রদলের সহসভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা ইশতিয়াক আহমেদ নাসির, অ্যাডভোকেট বদরুল মোমেন মিঠু, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক শফিকুল আলম রাজন, সাবেক ছাত্রদল নেতা বদরুল আলম শিপু, সাবেক সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জুর ছেলে ও ছাত্রদল নেতা মাহমুদুর রহমান উজ্জ্বল, ব্যবসায়ী মো. মাসুক মিয়া দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।

কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ার চর) : বর্তমান সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করবেন—এটা প্রায় নিশ্চিত। বিএনপির প্রার্থী হয়ে লড়বেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শরীফুল আলম। জেলা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কয়েকজন নেতা এ আসনের মনোনয়ন সম্ভাবনা নিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগে নাজমুল হাসান পাপন ও বিএনপিতে শরীফুল আলম ছাড়া আপাতত কোনো বিকল্প প্রার্থী নেই। তবে ভৈরব শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ইফতেখার হোসেন বেনু ও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ভৈরব উপজেলা চেয়ারম্যান মো. গিয়াস উদ্দিন দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।



মন্তব্য