kalerkantho


বরিশালে ইউপি চেয়ারম্যানকে গুলি করে হত্যা

নেপথ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্যের বিরোধ

বরিশাল অফিস   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নেপথ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্যের বিরোধ

বরিশালের উজিরপুরের জল্লা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বিশ্বজিৎ হালদার ওরফে নান্টুকে (৪৫) গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার কারফা বাজারে নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তাঁকে গুলি করা হয়। দলীয় কোন্দলের জের ধরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে দলীয় নেতাকর্মীদের মত। খুনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় ছাত্রলীগের কর্মী সোহাগ সরদারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও তাঁর বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্ এমপি ঘটনাস্থলে গিয়ে খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পুলিশ স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাসহ তিনজনকে আটক করেছে। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্ বলেন, ‘নান্টু শুধু জনপ্রতিনিধিই ছিলেন না, দলের জন্য একজন নিবেদিত কর্মীও ছিলেন। তাঁকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। যারা এই খুনের সঙ্গে জড়িত তাদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতেই হবে। প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছি যারা এই খুনের সঙ্গে জড়িত তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে। জনপ্রিয় চেয়ারম্যান নান্টুর আত্মীয় ও দলীয় কর্মীদের অনুরোধ করেছি আইন নিজেদের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য।’   

জেলা পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম জানান, বাজারে ইউপি চেয়ারম্যানের কাপড়ের একটি দোকান আছে। সেখানেই তিনি শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বসে ছিলেন। তখন বাজারে বিদ্যুৎ ছিল না। এ সময় তিনটি মোটরসাইকেলে করে দক্ষিণ দিক দিয়ে কয়েকজন তাঁর দোকানের সামনে নামে। এ সময় ওই যুবকরা খুব কাছ থেকে তাঁকে গুলি করে বাজারের পূর্ব দিক দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। গুলিতে চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালদার ও তাঁর সহযোগী কারফা গ্রামের নীহার হালদার (৩৫) আহত হন।

স্থানীয় লোকজন ও স্বজনরা তাঁদের উদ্ধার করে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। সেখানে অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা ইউপি চেয়ারম্যানকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে রাত পৌনে ১০টার দিকে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিহত বিশ্বজিৎ হালদারের মাথায়, বুকে, পিঠে ও পায়ে পাঁচটি গুলির চিহ্ন রয়েছে। গুলির ক্ষতও বেশ গভীর ছিল।’ রাত সোয়া ১০টার দিকেই বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান। তখন উত্তেজিত কর্মীরা ঘটনার জন্য সংসদ সদস্যকে দায়ী করে। একপর্যায়ে উজিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ইকবালের সঙ্গে সংসদ সদস্য ইউনুসের এ নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয়। তখন জেলার শতাধিক নেতাকর্মী ইকবালের পক্ষ নিয়ে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশের সহযোগিতায় সংসদ সদস্য শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ত্যাগ করেন। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে ভেবে গতকাল শনিবার সংসদ সদস্য ইউনুস জল্লায় যাননি।

এদিকে গতকাল সকাল থেকেই জল্লার জনগণ কারফা বাজারে জড়ো হতে থাকে। তারা বাজারের শতাধিক দোকান বন্ধ করে খুনিদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করে। বাজারের দুই পাশের প্রবেশপথ বন্ধ করে বিক্ষোভ চলমান থাকায় দুপুর ২টা পর্যন্ত কেউ বাজারে প্রবেশ করতে পারেনি। গতকাল সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চেয়ারম্যান হত্যার প্রতিবাদে ও ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে কারফা বাজারে প্রায় ২০০ ব্যবসায়ী তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করছে। এ সময় তারা সড়ক অবরোধ করে রাখে।  সকাল ১১টার দিকে বিক্ষুব্ধ কিছু লোকজন বাজারের ব্যবসায়ী সোহাগ সরদার, হরষিত রায়সহ চারটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে বিক্ষুব্ধের একাংশ ও নিহতের স্বজনরা ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সোহাগ সরদারের ভাই খোকন সরদারের তিনতলা বাসভবনে হামলা করে ব্যাপক ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেখানে থাকা ভাড়াটিয়াদের রাতেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাই হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। বরিশাল ডিবি পুলিশ হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগে কারফা পাবলিক একাডেমির দশম শ্রেণির ছাত্র শংকর ভাংড়াকে আটক করলে উত্তেজনা ছড়িয়ে। এ সময় বিক্ষুব্ধরা ডিবি পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে।

এদিকে অগ্নিসংযোগের খবর পেয়ে উজিরপুর ফায়ার স্টেশনের দমকল বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করলে বিক্ষুব্ধ জনতার বাধায় তারা কারফা বাজারের প্রবেশপথ থেকে ফিরে যায়।

দুপুর সোয়া ২টার দিকে নান্টুর লাশ বরিশাল থেকে জল্লা আইডিয়াল কলেজ মাঠে নেওয়া হয়। নান্টুকে একনজর দেখতে সেখানে শোকার্ত হাজার হাজার নারী-পুরুষের ঢল নামে। সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্ ঢাকা থেকে সরাসরি কারফা বাজারে যান। তখনো সেখানে বিক্ষুব্ধরা খুনিদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করছিল। সেখানে হাসানাত গিয়ে তাদের সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে খুনিদের বিচারের আশ্বাস দেন। এর পরেই বিক্ষুব্ধরা কারফা বাজার ছেড়ে যে যার মতো করে বাড়ি ফেরে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কারফা বাজারে বিপুল পরিমাণ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।   

জানা গেছে, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি বিশ্বজিৎ হালদার ও জল্লা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ও জল্লা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি তাইজুল ইসলামের বিরোধ চলে আসছিল। ব্যবসায়ী নিহার রঞ্জন সমাদ্দার (৩৭) জানান, সম্প্রতি জল্লা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা তাইজুল ইসলাম, জল্লা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. নান্নু সিকদার, জল্লা ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সভাপতি মো. মামুন শাহ এবং প্রভাবশালী ছাত্রলীগ নেতা মো. রাব্বি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুস্থদের ভিজিএফের চাল চুরির অভিযোগ এনে এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন করে চেয়ারম্যানের বিচারের দাবি জানান। এমনকি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও করেন। তবে উজিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ইকবাল বলেন, গৌরনদী উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবু সাঈদ স্থানীয় সংসদ সদস্য ইউনুসের ব্যক্তিগত সহকারী। সাঈদের সহযোগিতায় ছাত্রলীগ সভাপতি মামুন শাহ্ ও সাগর সরদার এলাকায় মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন। মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ার পাশাপাশি দলীয় কোন্দলের কারণে জনপ্রিয় চেয়ারম্যান নান্টুকে খুন করা হয়েছে। তারা খুনিদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি শাস্তির দাবি জানায়। ঘটনার পর থেকেই সাঈদ আত্মগোপনে রয়েছেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির বলেন, দায়িত্বে অবহেলার কারণে ঘটনাস্থলের পাশেই থাকা পুরুলিয়া পুলিশ ক্যাম্পের কর্তব্যরত উপপুলিশ পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান ও এসআই এ বি ইউসুফকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনকে পুলিশ এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের বিশেষ অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। 

সংসদ সদস্য তালুকদার মো. ইউনুস বলেন, দুর্বৃত্তদের হাতে জনপ্রিয় চেয়ারম্যান নান্টু নির্মমভাবে খুন হয়েছেন। এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এরই মধ্যে সেই নির্দেশ প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে। খুনিরা গ্রেপ্তার হলেই নেপথ্যের ঘটনা বেরিয়ে আসবে। তার আগেই একটি পক্ষ খুনের ব্যাপারে বিকৃত তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।



মন্তব্য