kalerkantho


ইইউ-ওআইসির প্রস্তাবে বিচারে দৃষ্টি

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত আসছে

মেহেদী হাসান   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত আসছে

রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে যৌথ প্রস্তাব আনছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। গত বৃহস্পতিবার তারা ওই প্রস্তাবের খসড়া মানবাধিকার পরিষদে জমা দিয়েছে। আগামী শুক্রবার মানবাধিকার পরিষদের ৩৯তম অধিবেশন শেষ হওয়ার আগেই তা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন ও সিদ্ধান্ত আকারে গ্রহণ করার কথা রয়েছে।

এদিকে কানাডার পার্লামেন্ট গত শুক্রবার রোহিঙ্গা গণহত্যাকে স্বীকৃতি দিয়ে মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের চলতি অধিবেশনে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পাবে বলে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের কূটনীতিকরা নিশ্চিত করেছেন।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ইইউ ও ওআইসির যৌথ প্রস্তাবে মোট ৩৩টি দফা রয়েছে। ওই প্রস্তাবের ২২ ও ২৩তম দফায় ২০১১ সাল থেকে মিয়ানমারে সংঘটিত গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধ ও সহিংসতার বিচারে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের একটি কাঠামো সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সংগতি রেখে জাতীয়, আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালে আগামী দিনে সুষ্ঠু বিচার ত্বরান্বিত করতে মামলার ফাইল তৈরি করবে ওই কাঠামো।

২৩তম দফায় ২০১১ সাল থেকে মিয়ানমারে সংঘটিত গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধ ও সহিংসতার বিচারে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের একটি কাঠামো সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সংগতি রেখে জাতীয়, আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালে আগামী দিনে সুষ্ঠু বিচার ত্বরান্বিত করতে মামলার ফাইল তৈরি করবে ওই কাঠামো।

২৩তম দফায় আরো স্পষ্ট করে ওই কাঠামোর কাজ নির্দিষ্ট করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নবগঠিত কাঠামো এরই মধ্যে সত্যানুসন্ধানী দল সংগৃহীত তথ্য ব্যবহারের পাশাপাশি আরো তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ অব্যাহত রাখবে। তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ নথিভুক্ত ও যাচাই করার সক্ষমতা থাকবে ওই কাঠামোর। তারা মানবাধিকার পরিষদের ৪২তম অধিবেশনে এবং সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে (আগামী বছর সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠেয়) তাদের প্রধান কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানাবে।

খসড়া প্রস্তাবের ২৪তম দফায় নবগঠিত কাঠামোকে মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত ও বিচারে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতকে (আইসিসি) সহযোগিতা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।

জানা গেছে, জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে ওই প্রস্তাবটি গৃহীত হলে তা সাধারণ পরিষদে পাঠানো হবে। সাধারণ পরিষদ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে কাঠামো সৃষ্টি করবে। ইইউ ও ওআইসির যৌথ প্রস্তাবে মিয়ানমারবিষয়ক তদন্ত ও তথ্য সংগ্রহ কাঠামোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও অর্থ বরাদ্দ দিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতি আহ্বান রয়েছে। এ ছাড়া সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদন ও সুপারিশগুলো আমলে নিতে সাধারণ পরিষদের প্রতি মানবাধিকার পরিষদের আহ্বান ওই প্রস্তাবে স্থান পেয়েছে।

ইইউ ও ওআইসির যৌথ প্রস্তাবে মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গাদের ‘রাষ্ট্রহীনতা’ দূর করার পাশাপাশি আনান কমিশনের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে কানাডার পার্লামেন্টে গত শুক্রবার সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এক প্রস্তাবে পার্লামেন্ট সদস্যরা রোহিঙ্গা নিপীড়নকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। গ্লোবাল নিউজ কানাডার অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কানাডার পার্লামেন্ট সদস্যদের এমন উদ্যোগকে ‘নজিরবিহীন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তারা সে সময় মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদন ও সুপারিশ গ্রহণ করে কানাডা সরকারকে সে অনুযায়ী কাজ করার আহ্বান জানায়।

উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা ইস্যুতে কানাডা বেশ সরব রয়েছে। ওই দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো তাঁর মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে বব রেকে নিয়োগ দিয়েছেন।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তাঁর দেওয়া পাঁচ দফা প্রস্তাবের ধারাবাহিকতায় এবার এ সংকট সমাধানে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেবেন। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন গতকাল শনিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে এবারের অধিবেশনে গতবারের মতো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন অর্জনে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। সেখানেও রোহিঙ্গা ইস্যু প্রাধান্য পাবে।

জানা গেছে, এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ও এর ফাঁকে বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইইউ ও ওআইসি রোহিঙ্গা সংকট সমাধান এবং মিয়ানমারের জবাবদিহির উপায় নিয়ে আলোচনা করবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহিরয়ার আলম ও পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক আলাদা কর্মসূচির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটসহ শিক্ষা ও নারীর অধিকার, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মতো বাংলাদেশের অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরবেন।



মন্তব্য