kalerkantho


আ. লীগের টার্গেট আসন রক্ষা বিএনপি চায় পুনরুদ্ধার

আহমেদ উল হক রানা, পাবনা   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



আ. লীগের টার্গেট আসন রক্ষা বিএনপি চায় পুনরুদ্ধার

সারা দেশের মতো পাবনা জেলায়ও বইছে নির্বাচনী হাওয়া। এই জেলায় নির্বাচনী আসন পাঁচটি। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাটবাজার, গ্রামগঞ্জে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নপ্রত্যাশীরা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গণসংযোগ চালিয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। জেলার সর্বত্র সাধারণ মানুষের মধ্যেও এখন প্রধান আলোচনা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিশেষ করে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে কে কে মনোনয়ন পাচ্ছেন তা জানতে সবাই উদগ্রীব। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার পাঁচটি আসনে আওয়ামী লীগ তাদের বিজয় ধরে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি চাচ্ছে তাদের হারানো আসনগুলো পুনরুদ্ধার করতে।

পাবনা-১ (সাঁথিয়া ও বেড়া) আসনে স্বাধীনতার পর থেকে নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা মন্ত্রী হয়েছেন। নির্বাচনী এই এলাকায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল দীর্ঘদিনের। বিএনপি তাদের কোন্দল অনেকটা কমিয়ে আনলেও আওয়ামী লীগের কোন্দলে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় সংঘর্ষের ঘটনা।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের পক্ষে মনোনয়ন পেয়ে শামসুল হক টুকু জামায়াতের সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীকে পরাজিত করে বিজয়ী হন এবং সরকারের বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও পরে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হন। এরপর তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদকে পরাজিত করে বিজয়ী হন। আসন্ন নির্বাচনে এই দুই হেভিওয়েট প্রার্থী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। গণসংযোগ চালানোর সময় ইতিমধ্যে উভয় নেতার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

অন্যদিকে বিএনপিদলীয় জোট থেকে এই আসনে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাদিম মোমেনের নাম শোনা যাচ্ছে। প্রকাশ্যে গণসংযোগ না চালালেও নিজস্ব বলয়ে চলছে তাঁর প্রচারাভিযান। এমনটিই জানিয়েছে স্থানীয়রা। পাবনা-২ (সুজানগর-বেড়া) আসনে স্বাধীনতার পর থেকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত চারবার আওয়ামী লীগ, তিনবার বিএনপি এবং একবার জাতীয় পার্টির প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আসনটিতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির শক্ত অবস্থান যেমন রয়েছে, একইভাবে এই দুই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও এখানে বেশি। জামায়াত, জাতীয় পার্টি বা অন্য রাজনৈতিক দল এখানে সাংগঠনিক ভিত তৈরি করতে পারেনি। ফলে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিদলীয় প্রার্থীর মধ্যে। বিগত নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আওয়াী লীগ এই আসন ধরে রাখতে এবং বিএনপি আসনটি পুনরুদ্ধারে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে বর্তমান সংসদ সদস্য খোন্দকার আজিজুল হক আরজু, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সুজানগর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আহমেদ ফিরোজ কবির, প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মির্জা জলিল ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে যাঁরা নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন তাঁরা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও অ্যাব মহাসচিব কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন এবং পাবনা জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল হালিম সাজ্জাদ।

পাবনা-৩ (ভাঙ্গুড়া-ফরিদপুর-চাটমোহর) আসনে একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থিতা প্রত্যাশা করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নবীন-প্রবীণ মিলিয়ে ২৩ জন নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। ভোটযুদ্ধে নামতে সবাই চাইছেন দলীয় প্রতীক। এলাকায় গণসংযোগ চালানোর পাশাপাশি মনোনয়ন পেতে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে। দুই দলেই রয়েছে গ্রুপিং। আসন্ন নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য, কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মকবুল হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল হামিদ মাস্টার, দলের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক ও রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আবদুল আলিম, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মুক্তিযোদ্ধা আ স ম আব্দুর রহিম পাকন, পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক বাকি বিল্লাহ, চাটমোহর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন সাখো, পাবনা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ  নেতা অ্যাডভোকেট শাহ আলম, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমান আতিক, ফরিদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান সরকার। তাঁরা নিজ নিজ সমর্থকদের নিয়ে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সংসদ সদস্য কে এম আনোয়ারুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হবিবুর রহমান হল ছাত্রসংসদের সাবেক জিএস পাবনা বারের সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদ  খোন্দকার, সেন্ট্রি সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসানুল ইসলাম রাজা, চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাসাদুল ইসলাম হীরা, ফরিদপুর উপজেলা বিএনপি সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম বকুল এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক আরিফা সুলতানা রুমা। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে কে এ আনোয়ারুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট মাসুদ খোন্দকার ও হাসানুল ইসলাম রাজার গণসংযোগ চোখে পড়ার মতো।

পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া) আসন পাবনার অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি আসন। এই আসনেও মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ব্যাপক নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন।

এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলু। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়ে মন্ত্রী হয়েছেন। এবারের নির্বাচনে তিনি আবারও মনোনয়ন চাইবেন, এমনটাই জানিয়েছে স্থানীয়রা। এ ছাড়া এ আসনে আওয়ামী লীগের আরো চারজন মনোনয়নপ্রত্যাশীর নাম শোনা যাচ্ছে। তাঁরা হলেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) নজরুল ইসলাম, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম কৌঁসুলি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট রবিউল আলম বুদু, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পাঞ্জাব আলী বিশ্বাস এবং ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের সাবেক জিএস কেন্দ্রীয় আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম লিটন প্রমুখ।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের পক্ষে এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম সরদার, ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের ছাত্রদলের সাবেক জিএস ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু, উপজেলা বিএনপির সভাপতি শামসুদ্দিন আহমেদ মালিথা প্রমুখ। এদের বাইরে জোটের শরিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য পাবনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক আবু তালেব মণ্ডল ২০ দলীয় জোট থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বলে জানা গেছে।

পাবনা-৫ (সদর) আসনে নির্বাচনের আমেজ এখনো লাগেনি মনে হলেও বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। জেলা সদর হওয়ায় এই আসনের গুরুত্ব অন্য আসনগুলোর চেয়ে বেশি। জেলার গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে বড় দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দল দীর্ঘদিনের।

২০১৪ সালের ২০ ডিসেম্বর কাউন্সিলের মাধ্যমে গোলাম ফারুক প্রিন্সকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা হয়। তিনি পাবনা সদরের সংসদ সদস্য। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে প্রিন্স দল গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি তাঁর নেতৃত্বে দলের সব কোন্দল নিরসন করে দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন।

পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক প্রিন্স এবারও দলের মনোনয়ন চাইবেন। এর বাইরে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোশারফ হোসেন, এডওয়ার্ড কলেজের সাবেক ভিপি ও জিএস এবং জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোহেল হাসান শাহিন নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিএনপি থেকে এ আসনে অনেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করলেও দলীয় ফোরাম থেকে জোরেশোরে শিমুল বিশ্বাসের নাম শোনা যাচ্ছে। তিনি নিজে কিছু না বললেও জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং তাঁর সমর্থকরা পাবনা সদর আসনে শিমুল বিশ্বাসই বিএনপির প্রার্থী হবেন বলছেন প্রকাশ্যে। এর বাইরে পাবনা পৌর মেয়র কামরুল হাসান মিন্টুর নামও শোনা যাচ্ছে ভোটের মাঠে।

উন্নয়নের পক্ষে রায় যাবে

আমাদের সব প্রস্তুতিই আছে



মন্তব্য