kalerkantho


কালের কণ্ঠ-জাফলং চা গোলটেবিল বৈঠক

চা-শিল্পে জরুরি ভিত্তিতে মহাপরিকল্পনা দরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



চা-শিল্পে জরুরি ভিত্তিতে মহাপরিকল্পনা দরকার

ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ কনফারেন্স রুমে গতকাল ‘বাংলাদেশের চা-শিল্পের সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রিত অতিথিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশের চা-শিল্পে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো ও কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। তবে এটি নির্ভর করছে এ শিল্পের আধুনিকায়নের ওপর। এ শিল্পে সমন্বয় ও মহাপরিকল্পনা জরুরি হয়ে পড়েছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে চায়ের প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণসহ তাদের সুবিধা দিতে মালিকদের আরো মানবিক হতে হবে।

এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, চাহিদার চেয়ে দেশে উৎপাদনে ঘাটতি থাকায় পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে নিম্নমানের চা এসে দেশের বাজারে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। এটা বন্ধ করা না গেলে দেশের চায়ের বাজার অচিরেই হুমকিতে পড়বে। গতকাল শনিবার ‘বাংলাদেশের চা-শিল্পের সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ কনফারেন্স রুমে কালের কণ্ঠ ও ওরিয়ন গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান জাফলং চা যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে।

আলোচকরা বলেন, দেশে এখনো এক কোটি ২০ লাখ কেজি চায়ের ঘাটতি আছে। বর্তমানে বছরে জনপ্রতি ৫৫০ গ্রাম চা পান করে। আর চাহিদা আট কোটি ৮০ লাখ কেজি। সাত কোটি ৬০ লাখ কেজি উৎপাদিত হয়। ফলে চাহিদা পূরণে আমাদের চা আমদানি করতে হয়। এসব চা আসে ভারত, কেনিয়া ও চীন থেকে। তাঁরা বলেন, ৫ শতাংশ হারে চায়ের চাহিদা বাড়ছে বলা হলেও প্রকৃত অর্থে মাথাপিছু প্রতিবছর ৯ থেকে ১০ শতাংশ হারে চাহিদা বাড়ছে। এই হিসাবে আগামী পাঁচ বছর পর দেশের চায়ের চাহিদা দাঁড়াবে ১২ কোটি কেজি। এ নিয়ে এখনই একটি মহাপরিকল্পনা করতে হবে। অবৈধ চায়ের কথা উল্লেখ করে তাঁরা আরো বলেন, চার-পাঁচ বছর ধরে প্রচুর ভারতীয় চা অবৈধভাবে বাংলাদেশের বাজারে ঢুকছে। দেশটির ২৫ কোটি থেকে ৩০ কোটি কেজি চা অবিক্রীত থাকছে। এটা আমাদের বাজারের চাহিদার চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি।

সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী বলেন, চা-শিল্প ও এর শ্রমিকদের দেশের মুক্তিযুদ্ধে গৌরবময় অধ্যায় রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর প্রতিরোধযুদ্ধে চা শ্রমিকরা তীর-ধনুক নিয়ে প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাই চা শ্রমিকদের সন্তানদের বুক ফুলিয়ে তাদের কথা বলতে হবে। বর্তমান সরকার এ শিল্পের উন্নয়নে কাজ করছে। এ খাতের নীতিমালাসহ চা শ্রমিকদের নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করছে। তবে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে এ শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না। উৎপাদন বাড়াতে চাইলে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণসহ তাদের সুবিধা দিতে মালিকদের আরো মানবিক হতে হবে।

কেয়া চৌধুরী বলেন, ৫২ শতাংশ নারী শ্রমিক এ খাতে কাজ করলেও তাদের স্বাস্থ্য সুবিধার কথা কেউ বলে না। কর্মক্ষেত্রে স্যানিটেশনের অভাবে কাজের স্থান থেকে অনেক দূরে গিয়ে তাদের প্রাকৃতিক কাজ সারতে হয়। দুপুরে খেতে হয় রাস্তার পাশে রোদে পুড়ে। এ ছাড়া নৃগোষ্ঠী হিসেবে সরকারের অনেক সুবিধা তাদের পাওয়ার কথা থাকলেও প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভাবে এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত তারা। ফলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তাদের অগ্রাধিকার দিলেও তালিকায় অন্য পছন্দের নাম আসে।

কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে চা-শিল্পের বিশাল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। চা যেমন শরীরকে চাঙ্গা করে, একইভাবে চা-শিল্পের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হবে। তিনি বলেন, দেশের চা-শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছিলেন টি বোর্ডের প্রথম বাঙালি চেয়ারম্যান।

কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল বলেন, চা আমাদের জীবনের অংশ হয়ে পড়েছে। কাজের শুরুতে এর ব্যবহার অপরিহার্য। ফলে তৈরি পোশাকের মতো আমাদের চা শিল্প নিয়ে বিশ্ববাসী আজ গর্ব করে। এ ছাড়া এর গুণগত মান আর সুনামের ফলে চা শিল্প আজ দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে। তাই এ খাতকে এগিয়ে নিতে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে।

টি প্লান্টার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, চায়ের আবাদি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি না হলেও বর্তমানে মোট উৎপাদন বাড়ছে, যা শিল্পটির জন্য ইতিবাচক। প্রায় ৯৩ শতাংশ চা উৎপন্ন হয় সিলেটে। কিন্তু চায়ের নিলাম হয় চট্টগ্রামে। তিনি আশা করেন সিলেটে চা নিলাম কেন্দ্র করার। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে গত বছর মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে দেশের দ্বিতীয় চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। চট্টগ্রাম থেকে শ্রীমঙ্গলে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো রেলপথ। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে যাতায়াত করা ট্রেনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আসন বা কম্পার্টমেন্ট নেই। এ ছাড়া আছে সাপ্তাহিক ছুটি। চা শ্রমিকদের ব্যাপারে তিনি বলেন, চা বাগানে কাজ করাটা শুধু শ্রমিকদের চাকরি নয়, এটা তাদের পুরো জীবনব্যবস্থা। তাই চা শ্রমিকদের সার্বিক উন্নয়নে আমাদের সবার কাজ করা উচিত।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ইয়াসমিন সুলতানা বলেন, চা শ্রমিকদের অবস্থার পরিবর্তন এরই মধ্যে হয়েছে। তাদের সার্বিক উন্নয়নে সরকার আরো চিন্তা করছে। এ ছাড়া চা বাগানের ম্যাপিং হয়ে গেছে। তিনি বলেন, স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মাধ্যমে উৎপাদনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এতে ভয়ের কিছু নেই। শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্র কিছুটা সংকুচিত হলেও এ পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে আমাদের। এ ছাড়া এক অঙ্কের সুদে ঋণসুবিধা দিতে সরকার ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। এসএমই খাতে এ ঋণসুবিধা চালু হয়েছে। আশা করছি চা শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এ সুবিধা পাবে। চা ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের ভৌগোলিক পণ্য। এটাকে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে আমি কাজ করব।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, পোশাক ও চামড়া খাত নিয়ে কথা বলা হলেও চা শিল্প নিয়ে খুব একটা কথা হয় না। অথচ একক রপ্তানিনির্ভর পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে হলে চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া চায়ের মূল্য সংযোজন এবং বহুমুখী হওয়ার ফলে এর চাহিদা বাড়ছে। দেশের চা শিল্প একই সঙ্গে পর্যটন খাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। এর ফলে এর মূল্য সংযোজনও হবে।

ন্যাশনাল টি কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল আউয়াল বলেন, শুধু আইন দিয়ে সব কিছু আদায় হয় না। আইনের বাইরে গিয়েও ঐতিহ্যগতভাবে শ্রমিকরা আমাদের কাছে অনেক সমস্যা নিয়ে আসে। শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকদের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। কারণ শ্রমিকদের কোনো সসম্যা থাকলে তা উৎপাদনব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে। চা শিল্পের সম্ভাবনা বহুমাত্রিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, চা উৎপাদনে আমাদের আরো বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। নতুন ধরনের চা উৎপাদনের পাশাপাশি আমাদের উচিত অভ্যন্তরীণ চাহিদার বিষয়টির দিকে গুরুত্ব দেওয়া। কেননা দেশেই এখন চায়ের বড় বাজার তৈরি হয়ে গেছে। শুধু রপ্তানি করলেই হবে না। আমদানি না করে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়ে চাহিদা পূরণ করাও বড় ব্যাপার।

কাজী অ্যান্ড কাজী টির প্রধান নির্বাহী সৈয়দ শোয়েব আহমদ বলেন, দেশে আট কোটি কেজি চা উৎপাদিত হয়। এর আরো চাহিদা আছে। এ ছাড়া রপ্তানি আয়ও বাড়ছে। অন্য রপ্তানি পণ্যের মতো চা খাতেও প্রণোদনা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিন। চা শিল্পকে ঘিরে দেশের পর্যটন শিল্পও গড়ে উঠতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

ওরিয়ন টি কম্পানির হেড অব অপারেশন ইব্রাহীম খলীল বলেন, বাংলাদেশে চা শিল্পের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চাই। তবে নানা কারণে এই শিল্পের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি চা শিল্প বিকাশে ট্যারিফ ব্যালেন্সিংয়ের সুপারিশ করেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুর রউফ বলেন, চা বাগানের উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতকরণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় পুরনো আইনগুলোর আধুনিকায়ন করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকার সব সময় যেকোনো শিল্পের সার্বিক অবস্থা নিয়ে ভাবে। চা শিল্প নিয়েও সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। কিছু অর্জন করতে হলে আমাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। চা শিল্পের সার্বিক উন্নয়ন করতে হলেও আমাদের সেই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে।

ইস্পাহানি টি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক ওমর হান্নান বলেন, ‘আমাদের চায়ের কেজি বাজারদর গড়ে ৩২০ টাকা। অন্যদিকে সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় চা পাওয়া যায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। তাই এটা বন্ধ করা না

গেলে দেশের চায়ের বাজার অচিরেই হুমকির মুখে পড়বে।’

গোলটেবিল বৈঠকে আরো বক্তব্য দেন ওরিয়ন টি কম্পানির হেড অব সেলস মো. আমিরুল ইসলাম, এইচআরচি প্রডাক্টসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক, চা গবেষক পাভেল পার্থ, অর্থনীতিবিদ ড. আহমদ আল কবির, মুক্ত চা শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ ব্যানার্জি, চা বিশেষজ্ঞ অর্ধেন্দু কুমার দেব, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি, চা-ছাত্র যুব পরিষদের নেতা সজল কৈরি, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক আহ্বায়ক বিজয় ব্যানার্জি, বাংলাদেশ টি এস্টেট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি মাহবুব রেজা, চা গোষ্ঠী আধিবাসী ফ্রন্ট সভাপতি পরিমল সিং বাড়াইক, চা শ্রমিক নেত্রী গীতা গোস্বামী, টি প্লান্টার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোশিয়েশন অব বাংলাদেশের জহর তরফদার প্রমুখ।



মন্তব্য