kalerkantho


গাজীপুরের মাদরাসায় জোড়া খুনের শিকার শিক্ষকের স্ত্রী ও ছাত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



গাজীপুরের মাদরাসায় জোড়া খুনের শিকার শিক্ষকের স্ত্রী ও ছাত্র

গাজীপুরে একটি হাফেজিয়া মাদরাসার ভেতরে খুনের শিকার হয়েছেন শিক্ষকের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার স্মৃতি (২২) ও এক ছাত্র মামুন (৭)। ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে তাদের লাশ উদ্ধার হয়। কারা এবং কেন তাদের হত্যা করেছে জানা যায়নি। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাদরাসার পরিচালক ও শিক্ষক ইব্রাহিম খলিল তালুকদারকে (৩৫) আটক করেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গাজীপুর মহানগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের চান্দনা পূর্বপাড়া এলাকায় অবস্থিত হুফ্ফাজুল কোরআন মাদরাসা। সেখানেই ঘটেছে এ জোড়া খুন। চারদিকে উচু কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা নির্জন স্থানটিতে জায়গা ভাড়া নিয়ে দুই বছর আগে মাদরাসাটি গড়ে তোলেন ইব্রাহিম খলিল। এর আগে রাশেদুল আলম রাজীব নামে এক ব্যক্তির গরুর খামার ছিল এটি। ইব্রাহিম হুজুরের বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতী থানার বাঁশজানা মালতি গ্রামে। তাঁর বাবার নাম রবিউল আলম তালুকদার।

মাদরাসাটির হেফজ বিভাগের ছাত্র আলী হায়দার জানান, ৩৫ জন আবাসিক ছাত্র রয়েছে মাদরাসায়। টিনশেড ভবনের সামনের দিকে ছাত্ররা এবং ভেতরের দিকে শিক্ষক ইব্রাহিম স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন। প্রতিদিনের মতো শিক্ষার্থীরা ভোর পৌনে ৫টায় ফজরের নামাজ পড়তে পাশের মসজিদে যায়। কয়েক মিনিট পর সেখানে পৌঁছেন শিক্ষক ইব্রাহিম। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে জানা যায়, মাদরাসার ভেতরে হুজুরের স্ত্রী ও এক ছাত্র খুন হয়েছে। সবাই দৌড়ে সেখানে পৌঁছে দেখা যায় দুজনের লাশ পড়ে আছে।

নিহত মাহমুদা আক্তার স্মৃতির বাড়ি চাঁদপুর সদরে। বাবা হানিফ গাজী থাকেন গাজীপুরে মাদরাসার কাছেই বাসা ভাড়া নিয়ে। কন্যা খুনের সংবাদ পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছেন হানিফ গাজী। তিনি জানান, ২০১২ সালে হাফেজ ইব্রাহিমের সঙ্গে বিয়ে হয় মাহমুদার। হুজাইফা (৪) ও হুরাইয়ারা (২) নামে তাঁদের দুটি ছেলেসন্তান রয়েছে। ভোরে সংবাদ পেয়ে মাদরাসায় পৌঁছে দেখতে পান ঘরের বিছানায় মাহমুদার রক্তাক্ত লাশ। মামুনের লাশ পড়ে ছিল ঘরের সামনে। ছোট শিশু হুরাইয়ারার হাতের আঙুল কেটে রক্ত ঝরছে। তার হাতে ব্যান্ডেজ করে আনা হয় স্থানীয় ফার্মেসি থেকে। ততক্ষণে সংবাদ পেয়ে পুলিশ পৌঁছে মাদরাসায়।

হানিফ গাজী জানান, একমাত্র ছেলে ইব্রাহিম খলিলের শিক্ষক ছিলেন হাফেজ ইব্রাহিম খলিল তালুকদার। সেই পরিচয়ের সূত্রে ছয় বছর আগে বড় মেয়েকে বিয়ে দেন তার সঙ্গে। সাত মাস আগে জানতে পারেন ইব্রাহিম তালুকদার আগে বিয়ে করেছিলেন এবং সেই স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। এসব কথা জানাজানির পরও ঝগড়া-বিবাদ হয়নি। জোড়া খুনের এ ঘটনাটি কেন ঘটেছে সে ব্যাপারে ধারণা দিতে পারেননি হানিফ।

হত্যার শিকার শিশু শিক্ষার্থী মামুনের বাবা আবু সাঈদ জানান, তাঁদের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার ছয়ানী রসুলপুর গ্রামে। নুরানি বিভাগের ছাত্র ছিল মামুন। হুজুরের স্ত্রী মাহমুদার দূরসম্পর্কের ভাগিনা মামুনকে এক বছর আগে মাদরাসায় ভর্তি করা হয়। দুই দিনের ছুটি কাটিয়ে গত রবিবার বিকেলে সে মাদাসায় ফিরেছে। এরপর কী কারণে খুনের শিকার হয়েছে তা বলতে পারছেন না কেউ। গতকাল ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মাদরাসার হুজুর ইব্রাহিমের মোবাইল ফোন থেকে মামুনের বাবাকে একজন কল করে দ্রুত মাদরাসায় আসতে বলেন। কারণ না জানিয়ে লাইন কেটে দেওয়া হয়। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আবু সাঈদ দেখতে পান শিশুসন্তানের লাশ।

বাসন থানার ওসি মো. মুক্তার হোসেন বলেন, ‘নিহত মাহমুদার গলায়, গালে ও কানে সাত-আটটি এবং মামুনের ঘাড়ে, মাথায় ও পিঠে চারটি ধারালো অস্ত্রের কোপ রয়েছে। আলামত দেখে মনে হচ্ছে,  ছোট দুই শিশু ঘুমে থাকাবস্থায় মাহমুদাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় অস্ত্রের আঘাতে এক শিশুর আঙুল কেটে গেছে। আর খুনের দৃশ্য দেখে ফেলার কারণে মামুনকে খুন করা হতে পারে। মাদরাসার এ ঘরটি থেকে রক্তমাখা একটি দা ও দা ধার দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত একটি কাঠ উদ্ধার  করা হয়েছে। ছাত্ররা আগের রাতে মাদরাসার পরিচালক ইব্রাহিম হুজুরকে বালু দিয়ে একটি কাঠে দা ধার দিতে দেখেছিল। আর ফজরের নামাজে যাওয়ার আগে তিনি মামুনকে ডেকে পাঠান বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে। মাদরাসার বাইরে পাওয়া গেছে হুজুরের ভেজা লুঙ্গি। এ অবস্থায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে ইব্রাহিম হুজুরকে।’

এদিকে জোড়া খুনে নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে মাদরাসার পরিচালক ইব্রাহিম খলিল তালুকদার বলেন, ‘ভোরে স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে ঘরে ঘুমে রেখে ছাত্রদের নিয়ে পাশের মসজিদে গিয়েছিলাম ফজরের নামাজ পড়তে। এ সময় মেইন গেট তালাবদ্ধ ছিল। তবে কেচি গেট খোলা ছিল। ২০১০ সালে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছে। কিন্তু ছয় মাস আগে সাবেক স্ত্রী দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছে।’ সাবেক স্ত্রী জোড়া খুনের ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন বলে জানান ইব্রাহিম হুজুর।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ওয়াই এম বেলালুর রহমান বলেন, ‘কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে আমরা তদন্ত শুরু করেছি। খুব তাড়াতাড়ি খুনের রহস্য উদ্ঘাটিত হবে বলে আশাবাদী।’



মন্তব্য