kalerkantho


ঢাকা উত্তরে ৯৮, দক্ষিণে ৯৩ শতাংশ বাড়ি এডিসের ঘাঁটি

ডেঙ্গু বিস্তারের কারণ খুঁজতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ

তৌফিক মারুফ   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ঢাকা উত্তরে ৯৮, দক্ষিণে ৯৩ শতাংশ বাড়ি এডিসের ঘাঁটি

গত পাঁচ বছরের মধ্যে ঢাকায় এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কারণ খুঁজতে গিয়ে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে জরিপ চালিয়ে দেখতে পেয়েছে, উত্তরে ৬৬ শতাংশ এলাকার ৯৮ শতাংশ বাসাবাড়িতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননবান্ধব পরিবেশ রয়েছে। দক্ষিণে ৬১ শতাংশ এলাকার ৯৩ শতাংশ বাসাবাড়ির একই অবস্থা। এসব বাসাবাড়িতে এডিস মশার ঘাঁটি অর্থাৎ প্রজননস্তরের লার্ভা-পিউপা পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক (ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়া) ডা. আক্তারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা দুই সিটির ৯৩টি ওয়ার্ডের ১০০টি এলাকায় জরিপ চালিয়েছি। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটির ৫৯ ও উত্তর সিটির ৪১টি এলাকা ছিল। ১০ দিন ধরে এ কার্যক্রম চালানো হয় এক হাজার ৯৯৮টি বাসাবাড়িতে।’ তিনি বলেন, ঢাকা উত্তরের ২৭টি (৬৬ শতাংশ) এবং দক্ষিণের ৩৬টি (৬১ শতাংশ) এলাকা জরিপভুক্ত ছিল। এর মধ্যে উত্তরের ৯৮ ও দক্ষিণের ৯৩ শতাংশ বাসাবাড়িতে এডিস মশার নমুনা মিলেছে। এ ক্ষেত্রে নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদ, পানির ট্যাংক, পরিত্যক্ত পরিবহন, টায়ার, প্লাস্টিক ড্রাম, বালতি, মগ, ফুলের টব, রঙের কৌটা ইত্যাদি কারণে এডিস মশার বংশবিস্তার বেশি দেখা যায়। দুই অংশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক এলাকা, বিভিন্ন ধরনের সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের এলাকাও ডেঙ্গু বিস্তারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুসারে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। গত রবিবার সন্ধ্যায় কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ তথ্যানুসারে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চার হাজার ১৮২ জনে। এর মধ্যে শুধু চলতি মাসের গত ১৬ দিনে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ২৬৬ জন। আগের ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের সংখ্যা ৪৯। এ ছাড়া এই বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের। ওই সূত্র জানায়, এই কন্ট্রোল রুমে ঢাকার হাসপাতাল বা সব প্রাইভেট চিকিৎসকদের চেম্বারে চিকিৎসা নিতে আসা ডেঙ্গু রোগীর তথ্য আসে না, সারা দেশ থেকে শুধু ২২-২৩টি হাসপাতাল যে তথ্য পাঠায় তা-ই সংরক্ষণ করা হয়। ফলে বেসরকারি পর্যায় থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বাস্তবে আরো অনেক বেশি বলে দাবি করা হয়।

জনস্বাস্থ্য ও রোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, এডিস মশা শুধু ডেঙ্গুই নয়, চিকুনগুনিয়া এবং জিকাসহ আরো একাধিক রোগের ভাইরাস বাহক।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভিলেন্স অ্যান্ড সোস্যাল মেডিসিনের (নিপসম) অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণ করাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় কার্যকর পদক্ষেপ। আর আক্রান্তদের জন্য প্রয়োজন যথাসময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা। এ জন্য একটি কার্যকর গাইডলাইন থাকা দরকার, যেমনটা কালাজ্বর বা ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রে করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ফুলের টব, স্থির জলের চৌবাচ্চা, নিচু জায়গা, টায়ার, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পরিবহনসহ বিভিন্ন ধরনের উপকরণে যাতে পানি জমে না থাকে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। কারণ এ পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্ম নেয়।

কীটতত্ত্ব বিজ্ঞানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে বর্ষাকালীন আবহাওয়া এ মশার জন্য প্রজননবান্ধব। অন্য সময় এডিসের প্রজনন হলেও তা কম। তাই বর্ষার আগেই এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আগাম কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

এদিকে ঢাকার উভয় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেই বারবার দাবি করা হচ্ছে, এডিস মশা যেহেতু বাসাবাড়ির মধ্যে স্বচ্ছ পানিতে জন্ম দেয়, তাই সিটি করপোরেশনের পক্ষে এটা সামাল দিতে বেগ পেতে হচ্ছে। কারণ বাসাবাড়ি বা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার স্থাপনার মধ্যে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা ঢুকতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতাই সব চেয়ে বড় উপায় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করার।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার উদ্যোগে নিয়মিতভাবে ডেঙ্গুর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসকদের জন্য ধারাবাহিক অবহিতকরণ কার্যক্রম চলছে। গত রবিবার এর অংশ হিসেবে ঢাকা শিশু হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিয়ে অবহিতকরণ সভা করা হয়।

রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক (ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়া) ডা. আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘গত এক সপ্তাহে আমরা বিভিন্ন হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধানদের নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে সেখানকার চিকিৎসকদের নিয়ে সভা করেছি।’



মন্তব্য