kalerkantho


প্রচারণায় সরব আ. লীগ নীরবে বিএনপি

রেজাউল করিম রেজা, নাটোর    

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



প্রচারণায় সরব আ. লীগ নীরবে বিএনপি

নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো জাতীয়  নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না করলেও চলতি বছরের ২৭ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এর আগে ২০১৪ সালের দশম নির্বাচনে নাটোরের চারটি আসনেই জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ।

নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে ২০১৪ সালে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বর্তমানে এই আসনে আওয়ামী লীগ থেকে  সংসদ সদস্য কালামসহ মনোনয়ন লড়াইয়ে নেমেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বকুল, মুক্তিযোদ্ধা মাজেদুর রহমান চাঁদ, সাবেক সংসদ সদস্য শহীদ মমতাজ উদ্দীন আহমেদের স্ত্রী ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শেফালী মমতাজ, কৃষক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আতিকুল হক আতিক, কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক সিলভিয়া পারভীন লেনী, লে. কর্নেল (অব.) রমজান আলী সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতা আলহাজ আনিসুর রহমান।

দলীয় সূত্র জানায়, একাধিক প্রার্থী ভোটারদের কাছে গিয়ে নৌকা প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করছেন। মিটিং, মোটরসাইকেল শোডাউন, উঠান বৈঠকে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে মনোনয়নের জন্য সর্বাধিক মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বকুল। তিনি প্রায় প্রতিদিনিই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাগাতিপাড়া ও লালপুর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা  অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্য কালাম তাঁর একক নেতৃত্ব কায়েমের জন্য হাইব্রিড নেতাকর্মীদের দিয়ে আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা চাপিয়ে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের নতুন মুখ আনিসুর রহমান জানান, তিনি ছাত্রজীবন থেকে আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে ঢাকার কামরাঙ্গি চর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। গত দুই বছর তাঁর নির্বাচনী এলাকা  লালপুরে অবস্থান করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। মনোনয়ন পেলে তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশী মাজেদুর রহমান চাঁদ বলেন, মনোনয়ন দেবেন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। গণসংযোগ করে নৌকার পক্ষে ভোট চাওয়ার অধিকার সবার রয়েছে। সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, তাঁর  সময়ে লালপুর-বাগাতিপাড়া এলাকায় যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটেছে। গত প্রায় পাঁচ বছরে লালপুর-বাগাতিপাড়া এলাকায় ১২ শ থেকে ১৪ শ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ করা হয়েছে। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা কমিটির সব নেতা তাঁর সঙ্গে রয়েছেন।

অন্যদিকে বিএনপি থেকে এ আসনে নতুন মুখ হিসেবে আসতে পারেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রী মরহুম ফজলুর রহমান পটলের সহধর্মিণী অধ্যক্ষ কামরুন্নাহার শিরীন। এ ছাড়া গোপালপুর পৌরসভার পরপর তিনবার নির্বাচিত সাবেক মেয়র মঞ্জুরুল ইসলাম বিমল, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি তরিকুল ইসলাম টিটু। জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য আবু তালহা ও জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান মনির। অন্য দলগুলোর মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য আনছার আলী দুলাল, সাম্যবাদী দল কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট বীরেন সাহা, ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খলিলও মনোনয়নপ্রত্যাশী। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক তাসনিম আলম আগামী নির্বাচনে এ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।

নাটোর-২ (নাটোর সদর ও নলডাঙ্গা উপজেলা) আসন জেলা সদর হওয়ায় এই আসনটি জেলার রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শিমুল,  জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও নাটোর পৌরসভার মেয়র প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা বাবু শঙ্কর গোবিন্দ চৌধুরীর মেয়ে উমা চৌধুরী জলি, নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নাটোর সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম রমজান, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও প্রয়াত জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হানিফ আলী শেখের ভাই অ্যাডভোকেট মালেক শেখ এবং জেলা যুবলীগের সভাপতি বাশিরুর রহমান খান চৌধুরী এহিয়া মনোনয়নপ্রত্যাশী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম রমজান। শরিফুল ইসলাম রমজান জানান, প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন গ্রামে উঠান বৈঠক, সভা-সমাবেশ এবং গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে প্রচারণায় দেখা যায় বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে।

শফিকুল ইসলাম শিমুল বলেন, তাঁর সময়ে নাটোরে যে উন্নয়ন হয়েছে সে উন্নয়ন স্বাধীনতার পরে আর কেউ করতে পারেনি। নলডাঙ্গায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ, ৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নাটোর শহরের প্রধান সড়ক নির্মাণের কাজসহ নাটোর ও নলডাঙ্গা এলাকায় এক হাজার কোটি টাকারও বেশি উন্নয়নকাজ করেছেন তিনি। এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি গত পাঁচ বছর নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন এবং প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। 

অন্যদিকে এই আসনে বিএনপির রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু প্রার্থী হচ্ছেন—এটা নিশ্চিত। কোনো কারণে তিনি প্রার্থী না হলে তাঁর স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন ছবি বিএনপির প্রার্থী হবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে জাপার কেন্দ্রীয় নেতা ও নাটোর জেলা জাপার সভাপতি  সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান সেন্টু ও ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট লোকমান হোসেন বাদলের নাম শোনা যাচ্ছে।

নাটোর-৩ (সিংড়া) আসনে ২০০৯ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে জুনাইদ আহেমদ পলক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কনিষ্ঠ এই সংসদ সদস্য পরে সরকারের তথ্য, যোগাযোগ ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আগামী নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হিসেবে প্রায় নিশ্চিত। পলকের সমর্থকরাও তাঁর মনোনয়ন প্রাপ্তির বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত। মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তারপর এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন সিংড়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফিক। এই আসনে আওয়ামী লীগের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মনজুর আলম হাসু।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওয়াহেদুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বড় দল। সুতরাং সংসদ সদস্য হিসেবে সবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। এ বিষয়টিকেও দলীয় নেতাকর্মীদের বিবেচনায় আনতে হবে।

অন্যদিকে এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন প্রায় এক ডজন নেতা। তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক কাজী গোলাম মোর্শেদ এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন। এ ছাড়া সিংড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান মন্টু, উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বর্তমানে পৌর বিএনপির সভাপতি দাউদার মাহমুদ, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান শামীম হোসেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আবদুলাহ আল কাফি, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম ইউসুফ আলী, সিংড়া পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম আনু, উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ডা. নজরুল ইসলাম, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ফরহাদ আলী  দেওয়ান শাহীন রয়েছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায়। তবে মাঠপর্যায়ে বিএনপির প্রচার-প্রচারণা চোখে পড়ছে না।

দাউদার মাহমুদ জানান, তিনি নির্বাচনী গণসংযোগ করে যাচ্ছেন।

এদিকে মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন চাইবেন উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি প্রকৌশলী আনিসুর রহমান। ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মিজান প্রমুখ।

নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত। দীর্ঘদিন এ আসনটি রয়েছে আওয়ামী লীগের কবজায়। এখানে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস। আগামী নির্বাচনে তিনি ছাড়াও নৌকার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন চাইবেন বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী, গুরুদাসপুর পৌরসভার মেয়র শাহনেওয়াজ আলী মোল্লা, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও নাটোর জজকোর্টের পিপি সিরাজুল ইসলাম, নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক রতন সাহা। আব্দুল কুদ্দুস এমপির মেয়ে এবং যুব ও মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী কুহেলি কুদ্দুস মুক্তি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আহাম্মদ আলী। এই আসনটিতে নৌকার প্রার্থীরা আলাদাভাবেই নৌকার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

অন্যদিকে এই আসনে বিএনপি থেকে সাবেক সংসদ সদস্য মোজাম্মেল হোসেন, গুরুদাসপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ, আয়লাল হক তালুকদার, মশিউর রহমান বাবলু ও অবসরপ্রাপ্ত সচিব আব্দুর রশিদ সরকার মনোনয়ন চাইবেন। তবে এই আসন থেকেও নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বিএনপি সাংগঠনিক সম্পাদক ও নাটোর জেলা বিএনপির সভাপতি রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর নাম শোনা যাচ্ছে। রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনুরোধে দল মনোনয়ন দিলে তিনি নাটোর-২ ও নাটোর-৪ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান।

গতিশীল নেতৃত্বেই আমরা জয়ী হব

সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমরা জিতব



মন্তব্য