kalerkantho


রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের অপরাধ

বিচার ও প্রমাণ সংগ্রহ কাঠামো সৃষ্টির উদ্যোগ

মানবাধিকার পরিষদে প্রতিবেদন উঠছে আজ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বিচার ও প্রমাণ সংগ্রহ কাঠামো সৃষ্টির উদ্যোগ

ফাইল ছবি

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত গুরুতর সব অপরাধের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণে কাঠামো সৃষ্টি এবং বিচারের উদ্যোগ নিতে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে জোর তৎপরতা চলছে। আজ মঙ্গলবার জেনেভায় মানবাধিকার পরিষদে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী দল তাদের প্রতিবেদন উপস্থাপন করবে। দলটি ইতিমধ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের তদন্ত ও বিচারিক কাঠামো সৃষ্টির সুপারিশ করেছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, জাতিসংঘ সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদন ও সুপারিশ নিয়ে আগামীকাল মানবাধিকার পরিষদে আলোচনা হবে। ইউরোপের ২৮টি দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫৭টি দেশের জোট ওআইসিসহ কয়েকটি দেশ সত্যানুসন্ধানী দলের সুপারিশগুলোকে স্বাগত জানিয়ে প্রস্তাব তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মানবাধিকার পরিষদে প্রস্তাব গৃহীত হলে তা সাধারণ পরিষদে পাঠানো হবে।

জানা গেছে, ইইউ যে প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করেছে তাতে রোহিঙ্গাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধসহ অন্যান্য অপরাধের বিচারের তাগিদ রয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো দেশীয় বা আন্তর্জাতিক আদালতে কিংবা ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য ২০১১ সাল থেকে মিয়ানমারে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধগুলোর তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য স্বাধীন তদন্ত কাঠামো সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে ইইউ।

অন্যদিকে ওআইসির প্রস্তাবে মিয়ানমার সরকারকে সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়মুক্তির অবসান ঘটাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের কথা ওআইসির প্রস্তাবে সরাসরি উল্লেখ নেই। তবে জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দলের সুপারিশগুলো আমলে নিয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ কাঠামো সৃষ্টির জন্য সাধারণ পরিষদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে ওআইসির খসড়া প্রস্তাবে।

সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকদের ধারণা, কৌশলগত কারণে ওআইসির আরব দেশগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার বিচারের কথা সরাসরি বলেনি। ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বে অবরোধ ও হামলায় যুদ্ধাপরাধের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

ওআইসির খসড়া প্রস্তাবে ১২টি দফার আটটিতেই মিয়ানমারকে তার ভূখণ্ডে থাকা সব ব্যক্তির মানবাধিকার  সুরক্ষা, রোহিঙ্গাদের প্রতি বৈষম্যের অবসান, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য পরিবেশ সৃষ্টি, আনান কমিশনের সুপারিশগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন, রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকারসহ জীবন-জীবিকার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্য চারটি দফায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে সম্পৃক্ত থাকা, সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ, এ সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূতের সম্পৃক্ত থাকার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান রয়েছে।

অন্যদিকে ইইউর খসড়া প্রস্তাবে ২৩টি দফা রয়েছে। সেখানে জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনকে আমলে নিয়ে মিয়ানমারের রাখাইন, কাচিন ও শান রাজ্যে সম্ভাব্য গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধসহ অন্যান্য অপরাধ, নির্যাতন-নিপীড়নের তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে।

ইইউ তার খসড়া প্রস্তাবে মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বাধীন ও পূর্ণ তদন্ত পরিচালনায় জোর দিয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমারে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধগুলোর স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারে গুরুত্বারোপ করে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বহিষ্কার করে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) বিচারিক এখতিয়ার ইইউ আমলে নিয়েছে।

রোহিঙ্গা নিপীড়নের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণে সম্ভাব্য কাঠামোর কার্যপরিধিও আছে ইইউর খসড়া প্রস্তাবে। ওই কাঠামো সত্যানুসন্ধানী দলের সংগৃহীত তথ্য ব্যবহারের পাশাপাশি প্রমাণ সংগ্রহ অব্যাহত রাখবে। ওই কাঠামো প্রয়োজনে মাঠপর্যায়ে উপস্থিতির মাধ্যমে অন্যান্য সংস্থার কাছ থেকেও তথ্য-প্রমাণ নিতে পারবে। ওই কাঠামো প্রতিবছর জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ও সাধারণ পরিষদকে তাদের কাজের অগ্রগতি জানাবে।

ওই কাঠামোকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের এবং সহযোগিতা দিতে মিয়ানমারসহ সব দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান ইইউর খসড়া প্রস্তাবে স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া তথ্য সংগ্রহকারী কাঠামোকে তথ্য-প্রমাণ সরবরাহের স্বার্থে সত্যানুসন্ধানী দলের কার্যকালের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের চাহিদা পূরণে একটি তহবিল গড়ারও প্রস্তাব দিচ্ছে ইইউ।



মন্তব্য